নির্বাসন একটি কঠিন ও গভীর অর্থবহ শব্দ। রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রে নির্বাসন কেবল ভৌগোলিক দূরত্বের নাম নয়; এটি একজন নেতার চিন্তা, আদর্শ ও স্বপ্নের সঙ্গে জন্মভূমির এক নির্মম বিচ্ছেদ। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, কর্তৃত্ববাদী শাসন কিংবা মতাদর্শিক সংঘাত বহু নেতাকে দীর্ঘদিন নিজ দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। তবে সেই নির্বাসনই অনেক ক্ষেত্রে নেতাকে ভেঙে না দিয়ে আরও পরিণত করেছে—পরিণত করেছে ইতিহাসের বাঁকে দাঁড়ানো রাষ্ট্রনায়কে।

নেলসন ম্যান্ডেলা ছিলেন তেমনই এক নেতা। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী এপারথেইড ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রামের কারণে তিনি ১৯৬২ সালে গ্রেপ্তার হন এবং ১৯৬৪ সালে ঐতিহাসিক রিভোনিয়া মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৪৬ বছর। এই রায় ছিল কেবল কারাবাসের আদেশ নয়; এটি ছিল তাকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে নির্বাসনে নিক্ষেপ করার এক সুপরিকল্পিত প্রয়াস—যেন জনগণের স্মৃতি থেকেই তাকে মুছে ফেলা যায়।

ম্যান্ডেলার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও নির্মম অধ্যায় কেটেছে রোবেন আইল্যান্ড কারাগারে। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত ছোট, স্যাঁতসেঁতে কক্ষে বন্দিত্ব, পাথর ভাঙার কঠোর শ্রম, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং পরিবারের সঙ্গে প্রায় বিচ্ছিন্ন জীবন—এই কারাগার ছিল তার জন্য শারীরিক শাস্তির চেয়েও বেশি মানসিক নির্বাসন। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। কারাগারকেই তিনি রূপ দিয়েছিলেন রাজনৈতিক বিদ্যালয়ে। সহবন্দিদের শিক্ষিত করেছেন, শৃঙ্খলা ও সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন এবং এমনকি কারারক্ষীদের সঙ্গেও মানবিক মর্যাদা বজায় রেখেছেন।

ম্যান্ডেলার বিশ্বাস ছিল—

“আমার স্বাধীনতা শুধু আমার জন্য নয়; আমার শত্রুর স্বাধীনতাও তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।”

দীর্ঘ ২৭ বছরের নির্বাসিত কারাবাস শেষে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তার মুক্তি ছিল শুধু একজন মানুষের মুক্তি নয়; সেটি ছিল একটি জাতির নতুন যাত্রার সূচনা।

এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের নির্বাসিত জীবনের এক তাৎপর্যপূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন—যা ছিল এক ভিন্ন ধরনের নির্বাসন। এটি ছিল কারাগারের লৌহশিকল নয়, কিন্তু ছিল জন্মভূমি, পরিবার ও রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে এক যন্ত্রণাদায়ক বিচ্ছেদ।

এই সময়ে তিনি ব্যক্তিগতভাবে গভীর বেদনার মুখোমুখি হয়েছেন। ছোট ভাইকে হারিয়েছেন, অথচ শেষ বিদায়ে উপস্থিত থাকতে পারেননি। মায়ের গুরুতর অসুস্থতার সময় সন্তান হিসেবে পাশে থাকার সুযোগ পাননি। একই সঙ্গে তার দলের নেতাকর্মীরা হামলা, মামলা, খুন ও গুমের শিকার হয়েছেন। দল ভাঙার জন্য চলেছে নানা ষড়যন্ত্র। শেকড়ছেঁড়া এই যন্ত্রণার মধ্যেও তিনি ধৈর্য হারাননি।

নেলসন ম্যান্ডেলার মতোই, তারেক রহমান নির্বাসনকে নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত বানাননি। বরং সময়কে কাজে লাগিয়েছেন দলকে পুনর্গঠিত করতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যোগাযোগ জোরদার করতে এবং নিজের ও দলের রাজনৈতিক দর্শনকে আরও পরিশীলিত করতে। বিদেশের মাটিতে থেকেও তিনি দেশের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, আন্দোলনের বীজ বপন করেছেন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে গেছেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তার দেশে প্রত্যাবর্তন ছিল আবেগঘন ও প্রতীকী। বিমানবন্দরে মানুষের ঢল, রাজপথে স্লোগান, চোখের জল—এই দৃশ্য অনেককে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ইতিহাসের সেই মুহূর্তগুলো, যখন দীর্ঘ নির্বাসনের পর কোনো নেতা আবার জনগণের কাছে ফিরে আসে।

তবে প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে আসে সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব—প্রত্যাশার ভার। নেলসন ম্যান্ডেলা যেমন জানতেন, প্রতিশোধ নয় বরং সমঝোতাই একটি বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, তেমনই তারেক রহমানের সামনেও আজ সেই ঐতিহাসিক চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশ বদলায়, সমাজ বদলায়, রাজনীতির ভাষাও বদলায়। তাই তার সাফল্য নির্ভর করবে নেতৃত্বের প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ওপর।

আমি তার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। ১৭ বছরে আমরা যে ধরনের বিভাজনমূলক ও কুৎসিত ভাষণের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিলাম, তার ছাপ তার কথায় ছিল না। বরং তিনি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, শান্তি-শৃঙ্খলার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন এবং তরুণদের নেতৃত্বে আনার কথা বলেছেন। মার্টিন লুথার কিংয়ের উদাহরণ টেনে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন—

“আমার দেশের মানুষের জন্য আমার একটি পরিকল্পনা আছে।”

তারেক রহমান, আপনার পরিকল্পনা দেশের কল্যাণ বয়ে আনবে—এ বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তবু কিছু ব্যক্তিগত পরামর্শ বিনয়ের সঙ্গে তুলে ধরতে চাই।

আপনার প্রধান দায়িত্ব হবে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা, যাতে সব নাগরিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার পায়। আপনার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আপনি যে সাধারণ প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে মাটিতে দাঁড়িয়ে বা পাটের চটে বসা মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন—তা আমাদের আশাবাদী করে।

ভিন্নমত ও সমালোচনাকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, শক্তিশালী সংসদ ও স্বাধীন গণমাধ্যম নিশ্চিত করা আপনার অন্যতম করণীয়। বিভিন্ন মত ও দলের নেতাদের একই মঞ্চে এনে মতবিনিময়ের উদ্যোগ আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে।

দুর্নীতি রাষ্ট্রের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। আপনি ব্যক্তিগতভাবে সৎ ও বিনয়ী—এটি একটি বড় শক্তি। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করা। সতের বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়ে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে—এ সত্য আপনি ভালোভাবেই জানেন।

টেকসই উন্নয়ন, শিল্পায়ন, কৃষি আধুনিকায়ন এবং যুবসমাজের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অপরিহার্য। আপনি কোনো একক দলের নেতা নন—আপনি এখন জাতির নেতা। আপনি দারিদ্র্য ও বৈষম্য হ্রাসে সকলের জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ করবেন, এটাই আমাদের বড় প্রত্যাশা।

শিক্ষার মানোন্নয়ন, গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। নৈতিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা জরুরি। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় নোংরা রাজনীতির চর্চা আমাদের ব্যথিত করে—দয়া করে এসব কার্যক্রম বন্ধে শক্ত অবস্থান নিবেন।

ধর্ম, ভাষা ও মতভেদ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে। বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনে আপনি সঠিক নেতৃত্ব দেবেন—এটাই আমাদের আশা।

সংখ্যালঘু নাগরিকরা যেন আর অকারণে প্রাণ না হারান এবং এ দেশের সমান নাগরিক হিসেবে নিরাপদ জীবন যাপন করতে পারেন—এই নিশ্চয়তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে।

বাংলাদেশ একটি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। নদী রক্ষা, বন সংরক্ষণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সিলেটের ভোলাগঞ্জে সাদা পাথর চুরির মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে—এক্ষেত্রে আপনার নেতৃত্বই পারে বিপন্ন বাংলাদেশকে রক্ষা করতে।

তারেক রহমান, আপনি আমাদের মাঝে ফিরে এসেছেন এক কঠিন সময়ে। আপনার প্রত্যাবর্তন সহজ ছিল না। নেলসন ম্যান্ডেলার মতোই, আপনি যদি আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপসহীন থাকেন; যদি প্রতিশোধ নয়, ক্ষমা ও সমঝোতার রাজনীতিতে অটল থাকেন—তবে আপনার নেতৃত্ব ইতিহাসে ইতিবাচকভাবে স্মরণীয় হবে।

ক্ষমতা সাময়িক। কিন্তু আদর্শ, সহনশীলতা ও মানবিকতা মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী হয়। ম্যান্ডেলা সেটাই প্রমাণ করেছিলেন। এখন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যাশা করে—জনাব তারেক রহমানও সেই পথেই হাঁটবেন।

মাহিউল কাদির : কলাম লেখক
mahiulkadir@gmail.com