জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : গৌরবের কীর্তি পেরিয়ে

লাল ইটের রাস্তা, ছোট ছোট দালান, সারি সারি সবুজ গাছ, জলাশয়ে লাল শাপলা; পাখিদের কিচিরমিচির, শিক্ষার্থীদের হইচই আর শীতের মৌসুমে অতিথি পাখির ঝাঁক; বর্ষায় ঝুম বৃষ্টি আর যদি বসন্ত হয় তাহলে নিশ্চিত সবুজের অন্দরে পাওয়া যাবে শত ফুলের রঙিন আলপনা—এই হলো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা দৃশ্যপট। বিশ শতকের শেষ বছরটিতে আমরা যখন পড়তে এসেছিলাম, তখন এভাবেই তাকে চিনেছিলাম।
মনে পড়ে, লাল ইটের রাস্তা বেয়ে ঝাউগাছ পেরুতে পেরুতে প্রথম যেদিন রিকশায় করে ক্যাম্পাসে ঢুকছিলাম সেদিন মনে হচ্ছিল এখানেই আমাকে পড়তে হবে; মনে হচ্ছিল এরকম একটা জায়গাই আমি যেন খুঁজছিলাম; মনে আরণ্যক আশ্রম, শান্তিনিকেতন। তারপর একে একে পেরিয়ে গেছে সাতাশটি বছর। ছাত্র-শিক্ষক—দুই পরিপ্রেক্ষিত থেকেই আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে দেখেছি। দুই যুগ আগে আমাদের চোখেমুখে ছিল প্রশ্নহীন মুগ্ধতা। এখন তার দিকে তাকাই রাগ ও অনুরাগ, মিলন ও বিরহের অনিবার্য যৌথতায়।
ছাত্রাবস্থায় লাইব্রেরি, ক্লাসরুম, শিক্ষক, আবাসন, শিক্ষাপদ্ধতি—সবকিছু নিয়েই কোনো-না-কোনো পর্যবেক্ষণ ছিল আমাদের। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল অতি সামান্য। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এটিই জেনে এসেছিলাম যে, এখানে আছে প্রতিবাদী ও সংগ্রামী, সৃষ্টিশীল ও মুক্তচিন্তার মানুষ। আছেন হায়াৎ মামুদ, মোহাম্মদ রফিক, সেলিম আল দীন; এই বিশ্ববিদ্যালয়েই ছিলেন মুস্তাফা-নূর-উল ইসলাম, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়, হুমায়ুন আজাদের মতো প্রতিভা। শিল্প-সাহিত্যের সংলগ্ন হওয়ায় জাহাঙ্গীরনগরের প্রতি চোরা টান অনুভব করেছিলাম।
আজ স্বীকার করতেই হবে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃতি আর সৌন্দর্য আমাকে অভিভূত করলেও ক্লাসরুমে গিয়ে কিঞ্চিৎ আশাহত হয়েছিলাম। কারও কারও পড়ানোর ধরন, পদ্ধতি আর আলাপের বিষয়বস্তু ছিল পুরোনো ধরনের। তবে আমার দিক থেকে তেমন কোনো অভিযোগ ছিল না। আমি ধরেই নিয়েছিলাম যিনি যা জানেন ও বোঝেন তার বাইরে তিনি আর কী দেবেন?
শিক্ষক ও শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা থাকলেও অশ্রদ্ধা ছিল না। অবশ্য ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতাম না, তা কিন্তু নয়। কোনো কোনো শিক্ষকের ক্লাসের সময় কোন দিক দিয়ে উড়ে চলে যেত, বুঝতেই পারতাম না। আমরা চাইতাম অংশগ্রহণমূলক ক্লাসরুম। কোনো কোনো শিক্ষক সেই সুযোগ দিতেন না, ছিল না প্রশ্ন করার সুযোগ। কিন্তু সে সময়কার তরুণতর শিক্ষকদের কেউ কেউ বরাবরই ক্লাসরুমে তর্ককে স্বাগত জানাতেন।
সেমিনার লাইব্রেরিগুলোয় ছিল পুরোনো বইয়ের গন্ধ। ষাট-সত্তর দশকের বইগুলোয় হাত রাখলে প্রত্নসময়ের স্পর্শ পাওয়া যেত। মনে পড়ে, হুমায়ুন আজাদ তার ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ বইটি বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষর করে সেমিনার লাইব্রেরিতে উপহার দিয়েছিলেন। ওই বই হাতে নিয়ে ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি এখনো মনে হয় সজীব।
সে সময় হলের ব্লকগুলোয় জমে উঠত তুমুল আড্ডা-অকারণ ও অদ্ভুত সব বিষয়বস্তু নির্ভর শোরগোল। বিশেষ করে, বিদ্যুৎ চলে গেলে। রাতে খাবারের পর আড্ডা হয়ে উঠত লাগামহীন। রাজনৈতিক দলাদলি সত্ত্বেও সম্মান ও সহাবস্থানের আবহ কমবেশি কাজ করত। তাই বলে এই দাবি করছি না যে, নিতান্তই স্বর্গীয় ব্যাপার-স্যাপার ছিল। মারামারি, ভাঙাভাঙি ছিল। গালাগালির পাশাপাশি গলাগলিও ছিল।
খুব ভালো লাগার জায়গা ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি। লাল-সাদা দালানের কাঁচঘেরা ঠান্ডা ও নির্জন জায়গাটি আত্মাকে প্রশান্তি জোগাত। যদিও ওখানে নতুন বই খুব কমই পাওয়া যেত। পুরোনো বইয়ের সংখ্যা ছিল বেশি। সমৃদ্ধ ছিল লাইব্রেরির রেফারেন্স সেকশন। পুরোনো বই ও পত্রিকার সমৃদ্ধ সংগ্রহ আমাকে আকুল করে তুলত। একদিন দেখি, পুরোনো বেশকিছু বই কেজি দরে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। দেখে আমার আত্মা উড়ে গেলো। শুনলাম, লাইব্রেরির নিয়ম অনুযায়ী ক্ষয়ে যাওয়া পুস্তকের জন্য এটাই নিয়তি।
কখনো কখনো লাইব্রেরিতে দেখা হতো কোনো কোনো প্রবীণ শিক্ষকের সঙ্গে; যেমন সৈয়দ সফিউল্লাহ। সাদা গাড়িতে করে একটি কুকুর নিয়ে আসতেন। রসায়নের শিক্ষক তিনি। কিন্তু ঘাঁটতেন দর্শন, রাজনীতি ও ইতিহাসের বইপুস্তক। শেলফের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর ও নিবিষ্টভাবে বই খুঁজতেন। ওই সময়ই একদিন আবিষ্কার করলাম তার আগ্রহ বিজ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূর; লালনের গান থেকে শুরু করে ফ্রয়েড কিংবা কোয়ান্টাম চেতনা। তাকে দেখে মনে হয়েছিল, যাক, বিজ্ঞানের শিক্ষকরাও তাহলে অন্য দুনিয়ার খবর রাখে।
সে সময় হলের ব্লকগুলোয় জমে উঠত তুমুল আড্ডা-অকারণ ও অদ্ভুত সব বিষয়বস্তু নির্ভর শোরগোল। বিশেষ করে, বিদ্যুৎ চলে গেলে। রাতে খাবারের পর আড্ডা হয়ে উঠত লাগামহীন। রাজনৈতিক দলাদলি সত্ত্বেও সম্মান ও সহাবস্থানের আবহ কমবেশি কাজ করত। তাই বলে এই দাবি করছি না যে, নিতান্তই স্বর্গীয় ব্যাপার-স্যাপার ছিল। মারামারি, ভাঙাভাঙি ছিল। গালাগালির পাশাপাশি গলাগলিও ছিল।
সন্ধ্যায় জমে উঠত মুক্তমঞ্চ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি আইকনিক স্থান, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রদর্শনস্থল। ক্যাফেটেরিয়ায় স্পিকারে বাজত নিত্যনতুন গান। ক্যাফেটেরিয়া ও মুক্তমঞ্চকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিচর্চা।
মনে পড়ে, এক সন্ধ্যায় আলো-আঁধারির রহস্যজালে নেচে নেচে মাত করে গিয়েছিলেন ধ্রুপদি নৃত্যশিল্পী মাধবী মুদগাল। এখনো চোখে ভাসে তার নাচের মুদ্রা, চোখের কটাক্ষ। মুক্তমঞ্চেই দেখেছিলাম দেশসেরা নাটকগুলো। অডিটোরিয়ামে দেখেছিলাম বিশ্বখ্যাত সিনেমাগুলো ‘গ্লাডিয়েটর’, ‘ট্রয়’, ‘নোম্যান্সল্যান্ড’, ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’, ‘দ্য সেভিয়র’। মাসের শেষে পকেটে পয়সা ছিল না; তবু একবার একটানা দেখেছিলাম চার্লি চ্যাপলিনের অনেকগুলো ছবি। আরেকবার দেখেছিলাম একগুচ্ছ ইরানি চলচ্চিত্র।
জমজমাট ক্লাসরুম, হুল্লোড়, নীরব লাইব্রেরিতে বইয়ের পাতার শব্দ—ছাত্রজীবনের পাতাগুলো একসময় শেষ হয়ে এলো।
শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলাম। দেখতে পেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরমহল; আগে যা দেখিনি কিংবা বুঝিনি তার অনেক কিছুই চোখের সামনে ধরা পড়ল। দেখলাম—সরকার, রাজনীতি, রাজনৈতিক দল কী করে শিক্ষার ভাববস্তুগুলো সমূলে বিনষ্ট করতে চায়। কেউ কি বিশ্বাস করবে, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ক্লাসরুম থেকে শুরু করে বেডরুম পর্যন্ত রাজনীতির অপচ্ছায়া বিরাজ করে।
মানুষ যেমন রাজনৈতিক প্রাণী, বিশ্ববিদ্যালয়ও তেমনই এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও চলেছে ও চলছে এই সাংস্কৃতিক বিধানের আওতায়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কি এরকম হয়ে ওঠার কথা? একজন শিক্ষক কেন একটি রাজনৈতিক দলের মার্কার পেছনে দৌড়ুতে দৌড়ুতে স্লোগান দেবেন? এত বিদ্যা খরচ করে তিনি কেন হয়ে উঠবেন কোনো রাজনৈতিক দলের কাজ ও ভাবাদর্শের অতন্দ্র প্রহরী?
মাস্টারির জীবনে এসে গভীরতরভাবে দেখতে হলো ক্ষমতার পাশাখেলায় কোনো কোনো শিক্ষক ‘রাজনীতি করা’কেই মনে করেন ধ্যান ও জ্ঞান। বিশ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এও বুঝলাম, সরকার আর রাজনৈতিক দলগুলোও শিক্ষকদের এই ভূমিকাই দেখতে চায়; আর তাই দলগুলো রাজনীতিকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করে, প্রত্যাশা করে শিক্ষকদের আনুগত্যময় অংশগ্রহণ। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও এই বাস্তবতারই অধীন।
অথচ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি বিশেষত্ব আছে; আছে আশ্রমতুল্য প্রাকৃতিক প্রতিবেশ। স্থানিকভাবে কেন্দ্র বা রাজধানী শহরের খুব কাছাকাছি এর অবস্থান। এখানকার স্থান ও জনসংখ্যার মধ্যে এখনো গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য আছে, অন্ততপক্ষে জনসংখ্যা এখন পর্যন্ত সহনশীল দশা অতিক্রম করেনি। এটিই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান জ্ঞানকাণ্ডের প্রধান শাখাগুলোর বেশিরভাগই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যাচর্চায় জায়গা পেয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বিভাগগুলো জ্ঞানচর্চার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পেরেছে; নতুন বিভাগগুলোয় ক্লাসরুম-শিক্ষক সংকটসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি থাকলেও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে সমৃদ্ধ করার মতো বিভাগ বা বিষয়ের ঘাটতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। তবু কোথায় যেন খামতি কাজ করে। প্রশ্ন জাগে, গুণগত শিক্ষা কি আমরা দিচ্ছি? সত্তর-আশির দশকে জ্ঞানচর্চার যে তৎপরতা দেখা গেছে, তা কি ঐতিহ্যিকভাবে সম্প্রসারিত হতে পেরেছে? শিক্ষার্থীরা কি রূপান্তরশীল বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে?
এটা ঠিক যে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। কিন্তু অবশিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কী দশা? শিক্ষকরা কি নতুন গবেষণায় সম্পৃক্ত হচ্ছেন? গবেষণা কিংবা চাকরি—দুই ক্ষেত্রে পাশকরা শিক্ষার্থীদের কত ভাগ অংশগ্রহণ করছে? কত ভাগ থাকছে বেকার? তার পরিসংখ্যান আমার জানা নেই।
তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখতে পাই, শিক্ষার্থীরা মনমতো গবেষণা বা চাকরি করতে পারছে না। অনেকেই অপছন্দের কোনো চাকরি বা টিউশনিতে যুক্ত আছে। লাইব্রেরিতে বিসিএসের বই-পুস্তক পড়ার যে অনিঃশেষ প্রতিযোগিতা দেখতে পাই তার ইতিবাচক নজির দেখতে পাই না বিসিএসের ফলাফলে। পাস করে বেরিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের চোখেমুখে লেগে আছে সামগ্রিক হতাশার প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন জাগে, এত এত আসন বাড়িয়ে ছাত্র ভর্তি করে বেকার উৎপাদন করার মানে কী?
বিশ্ববিদ্যালয় মুখ্যত জ্ঞানসৃষ্টির প্রতিষ্ঠান, বেকার উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান নয়। আমার মনে হয়, জ্ঞান ও গবেষণার সঙ্গে সম্ভাব্য কর্মক্ষেত্রের মধ্যে একটি সহযোগিতামূলক সম্পর্ক স্থাপন করা দরকার। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থী ও কর্মক্ষেত্র—তিনটি বর্গই উপকৃত হবে। তবে তার মানে এই নয় যে, সম্ভাব্য কর্মক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ীই জ্ঞান উৎপাদন করতে হবে।
মূলত বলতে চাইছি, সেতুবন্ধনের জন্য অন্তঃযোগাযোগ তৈরি করা দরকার। কারণ শেষপর্যন্ত দক্ষতা একটি বড় গুণ—হোক তা ব্যক্তিগত কাজের দুনিয়ায় কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে। জ্ঞান ও দক্ষতার সম্মিলন ছাড়া যেকোনো বিদ্যা পুঁথিগত বিদ্যার মতোই অচল হয়ে পড়ে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে সম্ভবত এই বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে।
বিশ্বজুড়ে বিদ্যমান জ্ঞানকাণ্ডের প্রধান শাখাগুলোর বেশিরভাগই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যাচর্চায় জায়গা পেয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো বিভাগগুলো জ্ঞানচর্চার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পেরেছে; নতুন বিভাগগুলোয় ক্লাসরুম-শিক্ষক সংকটসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি থাকলেও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগরে একসময় শিল্প-সাহিত্যের জমজমাট আসর ছিল। ছিল কবিতা পাঠের আয়োজন। বেদনার কথা হলো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বহুমাত্রিক উদ্যোগ দেখা গেলেও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিল্প-সাহিত্যের তৎপরতা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। অথচ এক দশক আগেও দেখা যেত শিল্প-সাহিত্যকেন্দ্রিক প্রকাশনা।
বুঝতেই পারিনি কবে, কখন ঝরে গেছে ছোটকাগজের পাতা। তবে আনন্দের ব্যাপার হলো ক্যাফেটেরিয়ায় বইয়ের দোকান হয়েছে। বইয়ের দোকান ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা কল্পনা করা যায় না। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় দিব্যি কাটিয়ে দিয়েছে কয়েক দশক।
আদতে অতি-রাজনীতিকরণ ঢুকে গিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থি ও মাংসে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিসরে বিরাজমান রাজনৈতিক দুঃশাসনের প্রতিরূপ হয়ে উঠেছিল বিশ্ববিদ্যালয়। বিগত প্রশাসনগুলো ধরেই নিয়েছিল উঁচু উঁচু দালান তোলা, বেশি-বেশি ছাত্র ভর্তি আর শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ।
‘উন্নয়ন’-এর ধারণাকে তারা ব্যবহার করেছিল উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে। এমন আবাসন তারা তৈরি করেছে, যা আবাসযোগ্য নয়। প্রকৃতিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। বারবার প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও সাবেক প্রশাসন তা শোনেনি। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছোটখাটো সংস্করণ হিসেবে তারা কর্তৃত্ববাদী আচরণই জারি রেখেছে। আর তাই বিদ্যায়তনিক পরিবেশ সুস্থির কোনো কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি।
তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পর্যটনী আমেজ—শত রকমের ভর্তা-ভাতের বাহাদুরি, স্বল্পমূল্যের শাড়ি-বাজার; কী দুর্ভাগ্য! একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ডিং মোড় নিয়েছি ভর্তা-ভাতের দোকান আর টারজানের শরবতের দিকে। একবার এক তরুণ শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কী জেনে এসেছো? সে জবাব দিয়েছিল, ইউটিউবে বটতলার ভর্তার রিভিউ দেখেছি। আর তাই, বটতলা সে দেখতে চায়।
নিশ্চয়ই বটতলা, স্বল্পমূল্যের ভর্তা-ভাত, গুরুত্বপূর্ণ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পাবলিক’ আসবেই, তাই বলে একাডেমিক ব্র্যান্ডিংয়ের খোঁজ-খবর কোনো সাড়াই ফেলবে না? সত্যিকার অর্থে, এসব একদিনের ফল নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যায়তনিক ও সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণের দিকে প্রশাসকদের মনোযোগ একদমই সরে গেছে, এগুলো আসলে তারই করুণ যোগফল।
গণঅভ্যুত্থান-উত্তর সময়ে নতুন আশার কথা শোনা গিয়েছিল। তখন উন্নয়ন বিষয়ক দুর্নীতির তদন্তের কথা শোনা গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারের কথাও জোরেশোরে উঠেছিল। এখন আর তা শোনা যায় না। রাষ্ট্রজুড়ে যে অস্থিতিশীলতা দেখতে পাচ্ছি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে তা গ্রাস না করুক—আপাতত এটিই প্রধান প্রত্যাশা। অথচ ফ্যাসিবাদ-উত্তর সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পুনর্গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন দার্শনিক কার্ল থিওডর জ্যাসপারস। জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রশিক্ষণ, বিজ্ঞান ও দর্শনের সমন্বয়ে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ ও গোষ্ঠী গঠনের আকাঙ্ক্ষা তার ছিল। আমাদের দেশেও নতুন নতুন প্রস্তাব এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কি এসব প্রস্তাব নিয়ে ভাববে? কে জানে! কেননা, বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ভাবনা এমন এক জায়গায় পতিত হয়েছে, যেখানে জ্ঞান, বুদ্ধি কিংবা গবেষণার নাম উচ্চারণ করাই হাস্যকর। ধরেই নেওয়া হয়, এসব ‘ইউটোপিয়ান’ আলাপমাত্র।
ছাত্র ও শিক্ষক জীবনের সফর এখনো ফুরায়নি। যেতে যেতে দেখতে পাই—বদলে গেছে রাস্তা, বদলে গেছে দালানের চেহারা; রঙ চটে গেছে, বসেছে নতুন রং; আকাশ ছুঁয়ে উঠে গেছে উঁচু-উঁচু দালান। সরু হয়ে আসা জলাশয়ে এখন আর ঢেউয়ের তরঙ্গ নেই, নেই দূর-বিস্তৃত দিগন্ত, কমে এসেছে পাখিদের ঝাঁক। রূপের যে গৌরবে গরবিনী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, তার সেই রূপই আজ ধূসর--নির্মম পতনের মুখোমুখি।
আত্মসমালোচনার পাটাতনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করা দরকার, প্রাচীন গৌরবের কীর্তি বহন করে আত্মপ্রসাদ লাভ করব, নাকি নতুন গৌরবের সৃজনে সৎভাবে তৎপর হবো? নয়তো খোঁয়ারি কাটিয়ে একদিন দেখতে হবে, আচমকাই ধসে গেছে অহমিকার ঘুণে ধরা সৌধ।
সুমন সাজ্জাদ : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
