রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিএনপির নেতারা স্থানীয়ভাবে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার চেয়ে নিজেদের অনুসারী তৈরি করতে বেশি মনোযোগী। ফলে বিএনপিতে ‘দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়’ নীতির চর্চা বাড়ছে। যার সর্বশেষ উদাহরণ কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন। এই নীতিতে চলা নেতাদের কারও কারও লাগাম ইতোমধ্যে টেনে ধরা হয়েছে, আগামীতেও একই ব্যবস্থার কথা ভাবছে দলটি।
 
বিএনপির নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী দেয়নি বিএনপি। দলীয়ভাবে নির্দেশনা ছিল, দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া মনিরুল হক সাক্কুর সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীরা যেন না থাকে।
 
কিন্তু ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, নির্বাচনে মেয়র পদে বিজয়ী আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হকের কাছে মাত্র ৩৪৩ ভোটে পরাজিত হয়েছেন সাক্কু। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়, সেখানে বিগত বছরগুলোতে সাক্কু দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী না করে নিজের অনুসারী তৈরি করেছেন। যে কারণে দলের সিদ্ধান্তকে উপেক্ষা করে স্থানীয় নেতারা সাক্কুর পক্ষে কাজ করেছেন এবং তাকেই ভোট দিয়েছেন।

শুধু সাক্কু ও তৈমুর নন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগে স্থানীয় নেতারা দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার চেয়ে নিজেদের অনুসারী তৈরিতে বেশি মনোযোগী। ফলে বিএনপিতে ক্রমেই ‘দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়’ নীতির আধিপত্য দেখা যাচ্ছে 

একইভাবে চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হয়েছিলেন দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তৈমুর আলম খন্দকার। সেখানে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে তার পক্ষে কাজ করায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ টি এম কামালকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মনিরুল হক সাক্কু / ফাইল ছবি

শুধু সাক্কু ও তৈমুর নন, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগে স্থানীয় নেতারা দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার চেয়ে নিজেদের অনুসারী তৈরিতে বেশি মনোযোগী। ফলে বিএনপিতে ক্রমেই ‘দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়’ নীতির আধিপত্য দেখা যাচ্ছে।
 
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যেহেতু আমরা অংশগ্রহণ করিনি, সেখানে ফলাফল কী হয়েছে তাও দেখতে যাইনি, তার কোনো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও করিনি। সুতরাং এই প্রসঙ্গে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।

তবে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সেলিমা রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এটা কিছু-কিছু জায়গায় হচ্ছে, দেখা দিচ্ছে। স্থানীয় অনেক নেতাকর্মী দলীয় নির্দেশনা মানছেন না। আমরা তাদেরকে সর্তক করেছি, নোটিশও দিয়েছি। তবে, আমাদের দলের নীতি ঠিক আছে। এখানে দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যারা এ ধরনের কাজ করছেন তাদের বিরুদ্ধে আমরা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছি, সামনেও নেব।
 
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক নেতা বলেন, মেয়র পদে বিএনপির দুই নেতা মনিরুল হক সাক্কু ও নিজামউদ্দিন কায়সার দুজন মিলে ভোট পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৬৬। আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন ৫০ হাজার ৩১০ ভোট। এখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তো আর বিএনপির দুই নেতাকে ভোট দেননি। ভোট দিয়েছেন বিএনপির কর্মী-সমর্থকরাই। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, সেখানে বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করার চাইতে সবাই নিজেদের অনুসারী তৈরি করছেন। যে কারণে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা যে যার অনুসারী তার পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছেন।

চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হন তৈমুর আলম খন্দকার / ফাইল ছবি

তিনি আরও বলেন, বিএনপির বেশকিছু নেতা নিজের আধিপত্য ধরে রাখতে নিজ-নিজ সংসদীয় এলাকায় দলকে শক্তিশালী না করে অনুসারী তৈরি করেন। যাতে সেখানে দলের কমিটি দেওয়ার সময় কিংবা নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়ার সময় তার বিকল্প না থাকে।
 
গত কয়েকদিনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপির বেশকিছু নেতার ক্ষেত্রে ‘দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়’ নীতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। যার মধ্যে অন্যতম ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও রাজশাহী মহানগরীর সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও বরিশাল মহানগরের সাবেক সভাপতি মজিবর রহমান সরোয়ার, সদ্য অব্যাহতি পাওয়া বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা জেলা দলের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং রাজশাহী মহানগর কমিটির সাবেক সভাপতি ও সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। এই কারণে চলমান সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় রাজশাহী মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতে রাখা হয়নি মিনু-বুলবুল কাউকে। একইভাবে ২৯ বছর পর বরিশাল মহানগর বিএনপির কমিটি থেকে বাদ পড়েন মজিবর রহমান সরোয়ার। ৩০ বছর পর খুলনা কমিটি থেকে বাদ পড়েন মঞ্জু। এছাড়া সর্বশেষ ২১ মার্চ অনুষ্ঠিত হওয়া সিলেট জেলা বিএনপির কাউন্সিলে সভাপতি প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়ে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়াতে হয় মেয়র আরিফুল হককে। মূলত কেন্দ্রীয় বিএনপির চাপের কারণে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন তিনি।

তারা আরও বলছেন, গণতান্ত্রিকভাবে কাউন্সিল না করে দীর্ঘদিন নেতাদের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি গঠন করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কাউন্সিল করে নেতা নির্বাচিত হওয়ার নিয়ম চালু হলে তখন কেউ নিজের অনুসারী তৈরি না করে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করবে। তাই এখন বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ভাবতে হবে, শক্তিশালী ব্যক্তির কাছে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব থাকবে নাকি সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে দলের দায়িত্ব থাকবে।

গণতান্ত্রিকভাবে কাউন্সিল না করে দীর্ঘদিন নেতাদের পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে কমিটি গঠন করার কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কাউন্সিল করে নেতা নির্বাচিত হওয়ার নিয়ম চালু হলে তখন কেউ নিজের অনুসারী তৈরি না করে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করবে। তাই এখন বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ভাবতে হবে, শক্তিশালী ব্যক্তির কাছে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব থাকবে নাকি সাংগঠনিক দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তির কাছে দলের দায়িত্ব থাকবে

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের বর্তমান সাংগঠনিক কার্যক্রম দেখভাল করছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি যেখানে যাকে প্রয়োজন মনে করছেন, সেখানে তাকেই আনছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ঢাকা পোস্টকে বলেন, দলের চেয়ে ব্যক্তি কখনও বড় হতে পারে না। দলীয় পরিচয়ে সবাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। আমরা সবাই বিএনপিকে শক্তিশালী করতে কাজ করছি। বাংলাদেশের রাজনীতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। যারা আগে দলের চেয়ে বড় নেতা ছিলেন বা যারা দলে থেকেও বড় ছিলেন, সেটা এখন আর নেই। দলের প্রয়োজনে সবাই গুরুত্বপূর্ণ, আমরা কাউকে গুরুত্বহীন মনে করি না।

বিএনপির দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন তাদের সরিয়ে দিয়ে দল কতটা শক্তিশালী হবে— এমন প্রশ্নও দেখা দিয়েছে / ফাইল ছবি 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এক নেতা বলেন, এখানে যাদের নাম বলছেন তারা সবাই সামাজিকভাবে অনেক জনপ্রিয়। প্রত্যেকে নিজ-নিজ সংসদীয় এলাকায় একাধিকবার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন। এর মধ্যে বরিশালের সরোয়ার ভাই ম্যাডাম খালেদা জিয়ার জন্য গুলিও খেয়েছেন। আর খুলনার নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিএনপির দুঃসময়ে সবসময় ছিলেন। তবে এটাও ঠিক, তারা সবাই নিজেদের দলের চেয়ে বড় নেতা ভাবেন বা মনে করেন।
 
তারপরও তাদের সরিয়ে রেখে দল কতটা শক্তিশালী হবে সেটা আন্দোলন কর্মসূচি মাঠে গড়ালে এবং নির্বাচনের সময় বোঝা যাবে, বলেন তিনি।
 
এএইচআর/জেএস