প্রতীকী ছবি

মুসলিমদের ওপর যেসব ইবাদত ফরজ। তা তিন প্রকার—১. শারীরিক ২. আর্থিক ৩. শারীরিক ও আর্থিক। শারীরিক ইবাদত হলো নামাজ, রোজা ইত্যাদি। আর্থিক ইবাদত হলো জাকাত, ফিতরা ইত্যাদি। আর শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত হলো হজ। রোজা হলো অনুপম শারীরিক ইবাদত। অন্য ইবাদত থেকে রোজা ব্যতিক্রম ও অনন্য বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।

রোজা এমন একটি শারীরিক ইবাদত, যায় সঙ্গে অন্য কোনো ইবাদতের তুলনা হয় না। অন্য সব ইবাদতের তুলনায় রোজা যেসব কারণে ব্যতিক্রমী তুলে ধরা হলো-

দীর্ঘ সময়

রোজা এমন একটি ইবাদত, যা দীর্ঘ সময় ধরে পালন করতে হয়। রোজার সময় দীর্ঘ এক মাস। আল্লাহর   বাণী : ‘তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পায় সে যেন অবশ্যই তাতে রোজা পালন করে।’ (সূরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫) এ আয়াতে রোজা পালনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে এক মাস। এত দীর্ঘ সময় ধরে আর কোনো ইবাদত পালন করতে হয় না। ফলে তা একটি ব্যতিক্রমী ইবাদত।

আসমানি কিতাব নাজিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘রমজান মাস তো সেই মাস, যে মাসে নাজিল হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ-যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথনির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী...।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৫)

মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে উয়াসেলা ইবনে আসকা থেকে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ইবরাহিম (আ.)-এর ওপর সহিফা নাজিল হয় ১ রমজান। মুসা (আ.)-এর  ওপর তাওরাত নাজিল হয় ৬ রমজান। ঈসা (আ.)-এর ওপর ইনজিল নাজিল হয় ১৩ মতান্তরে ১৮ রমজান। দাউদ (আ.)-এর ওপর জাবুর নাজিল হয় ১২ রমজান। আর বিশ্বনবী (সা.)-এর ওপর কোরআন নাজিল হয় ২৪ রমজান। (তাফসিরে মাআরেফুল কোরআন, ইবনে কাসির, মুসনাদে আহমাদ) এতে প্রতীয়মান হয়, সব আসমানি কিতাব রমজান মাসে অবতীর্ণ হয়েছে।

লৌকিকতামুক্ত

মুমিন যত ধরনের ইবাদত করে তা অন্যরা দেখতে পায়। মানুষের চোখের আড়ালে সাধারণত কোনো ইবাদত করা যায় না। কিন্তু রোজা এমন একটি ইবাদত, যা চোখে দেখা যায় না। রোজা অদৃশ্যমান একটি সেরা ইবাদত। ফলে এর সঙ্গে অন্য কোনো ইবাদতের তুলনা হয় না।

আগের সব উম্মতের ওপর ফরজ ছিল

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগের উম্মতের ওপর, যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পারো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৩)এ আয়াতে পূর্ববর্তী বলতে আদম (আ.) থেকে শুরু করে ঈসা (আ.) পর্যন্ত সব উম্মতকে বোঝানো হয়েছে। (রুহুল মাআনি)

নামাজ, হজ, জাকাত সব উম্মতের ওপর ফরজ ছিল, তা কোরআন মাজিদের কোথাও বলা হয়নি। কোনো কোনো বর্ণনা মতে, আদম (আ.) ফজর, ইবরাহিম (আ.) জোহর, ইউনুস (আ.) আসর, মুসা (আ.) ইশা এবং ঈসা (আ.) মাগরিবের নামাজ পড়তেন।

 শয়তান বন্দি

কোনো ইবাদতকালে পাপিষ্ঠ শয়তানকে বন্দি করা হয়—এ কথা বলা হয়নি। শুধু রোজার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, এ মাসে বড় বড় ও সেরা শয়তানদের বন্দি করে রাখা হয়। (বুখারি, মুসলিম, নাসায়ি, আহমাদ, বায়হাকি) ফলে রোজা যে একটি ব্যতিক্রমী ইবাদত তা স্পষ্ট।

 স্বয়ং স্রষ্টা কর্তৃক পুণ্য দান

মহানবী (সা.) বলেছেন, আদমসন্তানের প্রতিটি নেক আমলের বিনিময় ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয় এবং ফেরেশতার মাধ্যমে তা প্রদান করা হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তবে রোজা এর ব্যতিক্রম। কেননা রোজা একমাত্র আমার জন্যই রাখা হয়, আর আমিই এর প্রতিদান প্রদান করব।’ (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত, হাদিস : ১৮৬৩)

 বিশেষ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ

জান্নাতে রোজাদারদের বিশেষ দরজা দিয়ে প্রবেশ করানো হবে। এ মর্যাদা অন্য কেউ পাবে না। মহানবী (সা.) বলেন, জান্নাতে আটটি দরজা আছে। তন্মধ্যে একটির নাম রাইয়ান। এই দরজা দিয়ে রোজাদাররা ছাড়া কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। সেখানে অসংখ্য প্রবাহিত নহর, ফলফুলের বাগবাগিচা ও তৃপ্তিদায়ক বস্তু বিদ্যমান থাকবে। (বুখারি ও মুসলিম, মিশকাত, হাদিস : ১৮৬১)

শেষ নবীর উম্মতকে বিশেষ উপহার

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমার উম্মতকে রমজান মাসে পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য দান করা হয়, যা তাদের আগের কোনো উম্মতকে দেওয়া হয়নি। তা হলো—১. রোজাদারের মুখের বিকৃত গন্ধ আল্লাহর কাছে মৃগনাভির সুগন্ধির চেয়েও উত্তম, যতক্ষণ না ইফতার করে, ২. ফেরেশতারা রোজাদারদের জন্য দোয়া করেন, ৩. প্রতিদিন রোজাদারের জন্য জান্নাতকে সুসজ্জিত করা হয়, ৪. দুষ্কৃতকারী শয়তানকে বন্দি করা হয় এবং ৫. শেষরাতে মাগফিরাত দান করা হয়।’ (মুসনাদে আহমাদ, বায়হাকি)

 আল্লাহর দিদার লাভ

মহানবী (সা.) বলেছেন, রোজাদারের জন্য রয়েছে দুটি আনন্দ। একটি (দুনিয়ায়) ইফতার করার সময়, আরেকটি (পরকালে) তার মনিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের সময়। (বুখারি ও মুসলিম) রোজা ছাড়া অন্য কোনো ইবাদত করলে আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করতে পারবে—এ কথা বলা হয়নি। অতএব, রোজা একটি অনুপম ইবাদত।