‘দুর্বল মস্তিষ্ক কিছু করিতে পারে না। আমাদের ইহা পরিবর্তন করিয়া সবল করিতে হইবে। তোমরা সবল হও, গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলিলে তোমরা স্বর্গের সমীপবর্তী হইবে।’ 

–স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণী শুনে বাচ্চারা ফুটবল-ক্রিকেটে আগ্রহী হয় কি না জানা নেই। তবে মেসি-সাকিবদের অসাধারণ পারফর্মেন্স তাদের মুগ্ধ করে। উদ্বুদ্ধ করে খেলার মাঠে যেতে। সাকিবরা তাদের কাছে সুপার হিরো। সাকিব কীভাবে চলে, কীভাবে কথা বলে- লাখ লাখ শিশুকিশোর তা অনুসরণ করে। সাকিব এত্ত বড় ছক্কা কীভাবে হাঁকায়? সাকিবের কব্জিতে জোর কত? সাকিব কী খায়? ক্ষুধামন্দায় ভোগা কিশোরও এটা জানতে চায়। ফলে সাকিব ডানোর বিজ্ঞাপন দিলে হু হু করে বিক্রি বেড়ে যায়। তিনি হরলিক্স খেলে বাচ্চারা তা-ই খায়। 

সাকিবরা শুধুই খেলোয়াড় নন। তারা হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা

সকাল থেকে বিকেল, রাত থেকে ভোর- এভাবেই এদেশের শিশু-কিশোররা সাকিবদের ফলো করে। তাই, সাকিবরা শুধুই খেলোয়াড় নন। তারা শিক্ষকও বটে। তারা হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালা। চাইলে আগামী প্রজন্মকে অসভ্যতা, অভদ্রতা, বেয়াদবি, উগ্রতার স্রোতস্বিনী নদীতে টেনে ফেলতে পারেন। চাইলে নম্র, ভদ্র, বিনয়ী ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানবিক জাতি গঠনেও ভূমিকা রাখতে পারেন। তারা কোন পথে হাঁটবেন? 

আপনি হাজারখানেক উইকেট ভাঙলে, কয়েক লাখ রান নিলে কী আসে যায়? মানুষ কয়েক ঘণ্টার জন্য আনন্দ পায়। দু-চার দিন হয়ত চায়ের দোকানে কথাটথা হয়। তারপর নিছক পরিসংখ্যান ছাড়া এর কানাকড়ি দাম থাকে না। কিন্তু একটা ম্যাচকে কেন্দ্র করে এই যে আনন্দ-অনুভূতির খেলা, বন্ধুত্ব গড়ার ভেলা ভাসে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। তার দাম আপনার তারকাখ্যাতির চেয়ে বেশি। ফলে আপনি যত বড় খেলোয়াড় হন, যত বড় তারকা হন কোনো লাভ নেই, যদি না নম্রতার বালাই থাকে। আপনি যত বড় তারকা, আপনার ভুল-ত্রুটি, উগ্রতা ততটাই অপরাধ। 

স্পট লাইটের নিচে রাষ্ট্র আপনাকে এনে দাঁড় করিয়েছে। নিছক চার-ছক্কা মারানোর জন্য জনগণের টাকা আপনার পেছনে ঢালা হয়নি

আপনাকে মনে রাখতে হবে, এই যে স্পট লাইটের নিচে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন- এটা এমনি এমনি হয়নি। রাষ্ট্র আপনাকে এনে দাঁড় করিয়েছে। নিছক চার-ছক্কা মারানোর জন্য জনগণের ট্যাক্সের টাকা আপনার পেছনে ঢালা হয়নি। আপনাকে দিনের পর দিন ধরে তৈরি করা হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে দক্ষ ক্রীড়াবিদ হিসেবে। যাতে আপনাকে দেখে আগামী প্রজন্ম স্পোর্টসম্যানশিপ ধারণ করে। যোদ্ধা হিসেবে গড়ে ওঠে। 

জীবনের নানা বাঁকে মানুষ বারবার পরাজিত হতে পারে। স্বপ্ন ভাঙতে পারে। বৃষ্টি বিঘ্নিত ম্যাচের মতো প্রবঞ্চনা করতে পারে নিয়তি। জীবনের এসব সময়ে করণীয় কী? কীভাবে সামলাতে হয় নিজেকে? পেছনে না তাকিয়ে কীভাবে পরের ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হতে হয়? তারই পাঠ দেয় খেলার মাঠ। 

শিশুরা খেলার ছলে জীবনযুদ্ধের পাঠ নিক। সহিষ্ণু হোক। যেন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে শেখে প্রতিপক্ষের কাঁধে

আমরা চাই, আমাদের শিশুরা খেলার ছলে নিজের অজান্তে জীবনযুদ্ধের এসব পাঠ নিক। সহিষ্ণু হোক। নিজের জয়ের আনন্দে পরাজিত পক্ষের বেদনা তারা ভুলে না যাক। যেন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে শেখে প্রতিপক্ষের কাঁধে। আমরা এসব চাই, রাষ্ট্র এসব চায়। তাই, চিকিৎসা নিতে যাওয়া দরিদ্র কৃষকটা হাসপাতালে সিট না পেলেও বিকেএসপির আরামদায়ক সিটের জন্য ট্যাক্স দিতে আপত্তি করেন না। তাই একেকজন সাকিব, মুশফিক একদিন স্পটলাইটে এসে দাঁড়ান। আর আমাদের সন্তানেরা, দেশের আগামী প্রজন্ম সেদিকে তাকিয়ে থাকে। অনুকরণ করে, অনুসরণ করে এবং শেখে। 

বুঝতেই পারছেন, নিছক আনন্দ-বিনোদনের জন্য একজন ক্রীড়াবিদকে আমরা গড়ে তুলি না। মামুলি জয়-পরাজয়ের জন্য আমরা খেলা শেখাই না। বড় বড় স্কোর, চকচকে ট্রফিটাই আসল চাওয়া নয়। এসবই বহিরাঙ্গ। ভেতরের উদ্দেশ্য আরও বড়। বড় তারকারা যখন সেটা ভুলে যান তখন তার চেয়ে বেদনার কী হতে পারে? 

আমরা রোলমডেল খুঁজি, রোলমডেল গড়ি। যাতে তাদের দেখে শিশুরা শিখতে পারে সহিষ্ণুতা, মানবিকতা ও প্রেম

এদেশের সব খেলোয়াড় এটা মনে রাখুক, এই আমাদের চাওয়া। আমাদের সন্তানদের জন্য আমরা রোলমডেল খুঁজি, রোলমডেল গড়ি। যাতে তাদের দেখে শিখতে পারে সহিষ্ণুতা, মানবিকতা ও প্রেম। উগ্রতা নয়, নোংরামো নয়- যাতে শিখতে পারে ভালোবাসা ও ধৈর্য্য। শিখতে পারে, মনের মতো না হলেই মেজাজ হারানো চলে না। 

সম্প্রতি সাকিব আল হাসান যে কাণ্ড করেছেন, তা দৃষ্টিকটু ও অন্যায়। তিনি বল করলেন। এলবিডব্লিউয়ের আবেদন করলেন। আম্পায়ার সাড়া দিলেন না। ব্যাস, মেজাজ হারালেন সাকিব। লাথি দিয়ে ভাঙলেন স্টাম্প! 

এক শ্রেণি সাকিবকে সমর্থন করে বলছেন, তিনি নাকি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন! তাদের জন্য বলতে চাই, ক্রীড়াঙ্গনে অন্যায়ের প্রতিবাদ মানে স্ট্যাম্পে লাথি মারা নয়। সংসদে যেমন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে স্পিকারের ডেস্কে লাথি দেওয়া যায় না, শহীদ মিনারে অন্যায় হলে যেমন পা দিয়ে ফুল মাড়ানো যায় না- এও তেমন। 

প্রতিবাদ মানে স্ট্যাম্পে লাথি মারা নয়। সংসদে যেমন প্রতিবাদ করতে স্পিকারের ডেস্কে লাথি দেওয়া যায় না- এও তেমন

সাকিব কি তা বোঝেন না? মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করার মতো যথেষ্ট বয়স কি তার হয় নাই? নাকি তিনি এটা বোঝে না যে, তাকে অনেক শিশু-কিশোর এ টু জেড কপি করে? সাকিব কি দেখেননি, একজন শচীনকে কীভাবে পূজা পর্যন্ত করেছে ইন্ডিয়া? নিশ্চয় তিনি বোঝেন। তাই কৃতকর্মের জন্য তিনি দুঃখিত হয়েছেন। আশা করি, দ্রুতই তিনি মেজাজের লাগাম টেনে ধরতে শিখবেন। 

লেখা শেষ করব। তার আগে বলব, সাকিবের এই যে ক্ষোভ- কেন? তার কারণও খুঁজে বের করতে হবে। এদিকে নজর দিতে হবে। ঘরের হাওয়া গুমোট হলে শুধু পুষ্টিকর খাদ্যে স্বাস্থ্য ঠিক থাকে না। ঘরের পরিবেশ ঠিক না করে শুধু নীতিশিক্ষায় শিশুর আচরণ বদলায় না।

এইচকে/এটি