দুবাই, শারজাহ অথবা আবুধাবি, যেখানেই যাচ্ছি- হিন্দি কিংবা উর্দুই কেবল শুনছি। এমন কী অনেক বাংলাদেশিরাও কথা বলছেন এই দুই ভাষায়। প্রথম দেখায় যে দেশেরই হোন, সম্বোধনটা বেশিরভাগ সময় হিন্দিতেই শুরু হয়। এরপর দেখা গেল দুজনই বাংলাদেশি। খাটি বাঙালির সঙ্গে কথা বলছেন ভিনদেশী ভাষায়! বুঝতে পারার পর ব্যাপারটা হয়ে যাচ্ছে বিব্রতকর। 

অবশ্য ৩২,২৭৮ বর্গমাইলের এই দেশটি ৭১ ভাগ মানুষই প্রবাসী। এর মধ্যে ৮৫ ভাগই আবার এশিয়ান। ভারতীয় ৫১, পাকিস্তানি ১৬  ও বাংলাদেশি ৯ শতাংশ। ১৫ ভাগ জনসংখ্যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিক। এমন দেশে হিন্দি আর উর্দুর দাপটে আরবদের দেশে আরবি ভাষা কোণঠাসা হবে সেটা যেন স্বাভাবিক। 

তবে শুক্রবার শারজাহ স্টেডিয়ামের ডাইনিং রুমে এক যুবকের কথা শুনে চমকে উঠলাম। তিনি সরাসরি বাংলাতে শুরু করলেন।ততক্ষণে অবশ্য তিনি অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডে আমার প্রতিষ্ঠানের নামটা দেখে নিয়েছিলেন। ঢাকা পোস্ট দেখেই হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, আমি বাংলাদেশের। যখন পরবাসী দুইজন বাঙালির দেখা তখন আর হিন্দি-উর্দু কিংবা ইংরেজির দরকার হয় নাকি?

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার তরুণ মোহাম্মদ সারোয়ার। মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে আছেন বছর খানেক হলো। অন্যদের চেয়ে তাকে ভাগ্যবানই বলা যায়, কাজ করছেন শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। কত তারকাকে কাছ থেকে দেখেছেন। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বকাপ কাভার করতে এসেছি জেনে, বলতে শুরু করলেন, ‘আমি এখানে আইপিএলের সময় থেকেই আছি। আইপিএলের খেলা দেখেছি মাঠে বসে। সাকিব ভাইকে এই মাঠেই প্রথম দেখেছিলাম। কি যে ভালো লেগেছে! উনাকে অনেক কাছ থেকে দেখেছি।’

যদিও সাকিব নয়, তার প্রিয় ক্রিকেটার মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। ইনজুরিতে যার বিশ্বকাপ শেষ হয়ে গেছে। ব্যাপারটা বেশ কষ্ট দেয় সারোয়ারকে, ‘সাইফউদ্দিন ভাইয়ের জন্য মনটা খারাপ। মনে করেছিলাম, কাজের ফাঁকে উনার খেলা দেখবো। কিন্তু হলো না। উনি তো দল থেকে ছিটকে গেলেন।’ 

তিনি নিজেও টুকটাক ক্রিকেট খেলতেন। দেশ ছাড়ার পর সেই সুযোগ আর খুব একটা হয় না। এখন তাকিয়ে থাকেন সাকিব আল হাসান আর মাহমদু্ল্লাহ রিয়াদদের দিকে। বলছিলেন, ‘যখন খারাপ খেলে অবশ্যই অনেক কষ্ট হয়। এখানে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচটাই তো জিততে জিততে আমরা হেরে গেলাম। সেদিন কষ্ট হয়েছিল অনেক। তবে ভাই, এটা তো ঠিক জিতলেও বাংলাদেশ, হারলেও বাংলাদেশ। দেশটা আমাদের। আমাদের পাসপোর্ট বাংলাদেশি। এটা তো মনে রাখতেই হবে।’ 

সারোয়ারের কাছেই জানা গেল শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কাজ করেন আরেক বাংলাদেশি। যার নাম মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন। তাকেও পেয়ে গেলাম এক ফাঁকে। ফরিদপুরের এই যুবক আমিরাতে রয়েছেন ২০১১ সাল থেকে। দশ বছর পেরিয়ে গিয়ে এখানকার সবাই তার চেনা। শারজাহ স্টেডিয়ামে কাজ করছেন তিন মাস ধরে। মাঠের পরিছন্নতা কর্মী তিনি। 

এই কাজটা গর্বের সঙ্গে আর মন দিয়ে করেন বলে জানালেন, ‘আমি এমনিতেই ক্রিকেটের পাগল। এখানে কাজ করতে গিয়ে টুকটাক খেলা দেখারও সুযোগ পাই ভালো লাগে। করোনার কারণে ক্রিকেটারদের কাছে যেতে পারি না। তবে একটু দূর থেকে সবাইকে দেখে অনেক ভালো লাগে। আর যখন আপনাদের মতো কোন দেশের মানুষ পাই, তখন অনেক ভালো লাগে। প্রাণ খুলে কথা বলি।’

তবে মনের কোনায় কষ্টও লেগে আছে তার। দল হারলে মনের কী অবস্থা হয় জানাতে গিয়ে গিয়াসউদ্দিন বলছিলেন, ‘টিভিতে এখানে বসেও খেলা দেখি। খোঁজ রাখি বাংলাদেশ দলের। দল যখন ম্যাচ জিতে তখন ভালো লাগে। আর যখন হেরে যায়, তখন মনের মনে খারাপ লাগে।’ 

‘এখানে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ জেতে, ওদের দেশের মানুষেরা অনেক আনন্দ করে। আর আমাদের দল যখন হেরে যায়, তখন কী যে কষ্ট লাগে। মনে হয় আমাদের দল যদি জিততো তবে আমরাও এমন আনন্দ করতাম। চিল্লাতাম, গলা ভেঙে ফেলতাম। কিন্তু শারজাহ দেখুন, দুটো ম্যাচ আমরা কাছে গিয়েও হেরে গেলাম!’

আক্ষেপ ঝরল, শারজাহ স্টেডিয়ামে কাজ করা এই প্রবাসীর। এমন আক্ষেপ যেন এখন সবার। ভিনদেশে বসে একের পর এক হার অন্য সহকর্মীদের কাছেও যে ছোট করে দেয় তাদের। আত্মীয়-পরিজন রেখে শ্রম-ঘামের কষ্টের জীবনে এ যেন আরেক পরাজয়!

এটি/এমএইচ