৬০ বছর ধরে ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন কর্মকার রাম প্রসাদ

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার দক্ষিণ সোহাগদল কর্মকার পট্টিতে ঢুকলেই শোনা যায় হাতুড়ির টুংটাং শব্দ। শব্দটা আসে ৭৩ বছরের বৃদ্ধ রাম প্রসাদ কর্মকারের ঝুপড়ি দোকান থেকে। যেখানে প্রতিদিন আগুন, হাতুড়ি আর ঘামের মিশেলে তৈরি হয় ব্রিটিশ আমলের লোহার তালা। এই তালাই তার জীবনের ভরসা, সংসার চালানোর একমাত্র অবলম্বন।
মাত্র ৮ বছর বয়সে তিনি শেখেন কামারের কাজ। গুরু ছিলেন কর্মকার পট্টিরই প্রখ্যাত কারিগর গান্ধী লাল কর্মকার। তখন থেকে ব্রিটিশ আমলের তালা বানানোর কৌশল ও ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন টানা ৬০ বছর ধরে। রাম প্রসাদের তৈরি তালা আজও বিশেষ পরিচিতি পায় তার মজবুত গঠন আর অনন্য কারিগরির জন্য।
সরেজমিনে দেখা যায়, দক্ষিণ সোহাগদল কর্মকার পট্টির সরু গলিতে ঢুকতেই দেখা মেলে পুরনো ধাঁচের এক কামারের দোকান। টিনের ছাউনি, পাশে কয়লার চুল্লি, সামনে লোহার পাত, হাতুড়ি আর সরঞ্জামের সারি। দোকানের এক পাশে আগুন জ্বলছে, আর ঠিক তার সামনে বসে আছেন বৃদ্ধ রাম প্রসাদ হাতুড়ির আঘাতে লোহার পাত পিটছেন পরম মনোযোগে। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার ছেলে অপু কর্মকার, বাবার হাতের তালা বানানোর কৌশল শেখার চেষ্টা করছেন। দোকানে ভিড় করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ও ক্রেতা। কেউ পুরনো ছুরি ধার দিতে এসেছেন, কেউ আবার নতুন তালা কিনতে।

স্থানীয় বাসিন্দা রঞ্জিত হালদার বলেন, রাম প্রসাদ কাকার বানানো তালা অনেক মজবুত। আমি দশ বছর আগে একটা কিনেছিলাম, এখনো ঠিক আছে। এখনকার চাইনিজ তালা দুই মাসও টিকে না।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল জলিল বলেন, এই কাজটা শুধু জীবিকা না, এটা আমাদের এলাকার ঐতিহ্য। সরকার যদি ওনার মতো কারিগরদের সহযোগিতা করতো, তাহলে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেত না। আমার দাবি থাকবে সরকার ওনার দিকে নজর দেবেন।
ক্রেতা রিপন বেপারী বলেন, নৌকায় তালা দেওয়ার জন্য আমি এখানকার তালা ব্যবহার করি। কাঁদা পানি, রোদ-বৃষ্টি কিছুতেই নষ্ট হয় না। নৌকায় সবসময় কাঁদা পানির কাজ তাই দীর্ঘদিন ধরে ব্যাবহার করা যায় বলে এই তালা কিনতে এসেছি।
রাম প্রসাদ কর্মকার বলেন, একটা তালা বানাতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হয়। দিনে দুইটা তালা বানানো যায়। একটা বিক্রি হয় ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। সেই টাকা দিয়েই চলে সংসার।
এই সামান্য আয় দিয়েই চলছে ৬ সদস্যের পরিবার। রাম প্রসাদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে তাদের ভরণপোষণ, চিকিৎসা, সবকিছুর ভার তারই কাঁধে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা ছেলে অপু কর্মকার (৩৫) এখন বাবার পাশে দাঁড়িয়েছেন। তার সাথে কাজ করেন দোকানে।
অপু কর্মকার বলেন, বেশি পড়াশোনা করতে পারিনি। এখন বাবার কাজই করছি। সরকার যদি একটু সাহায্য করতো, আধুনিক যন্ত্রপাতি আনতে পারতাম, তাহলে আরও ভালো মানের তালা বানানো যেত।

রাম প্রসাদের হাতে তৈরি তালার বিশেষত্ব হলো এগুলো লোহার পাত পিটিয়ে হাতে তৈরি করা হয়। কাঁদা পানিতেও নষ্ট হয় না বলে নৌকার মালিকেরা এগুলো ব্যবহার করেন। একসময় এই তালা ব্যবহার হতো রাজা-বাদশা কিংবা জমিদারদের সিন্দুকে, এখন স্বর্ণকারদের দোকানের সিন্দুকেই ঝুলে থাকে তার বানানো তালা। রাম প্রসাদ কর্মকারের দাবি, এই তালা এসিড দিয়েও গলানো যায় না।
৭৩ বছরের ক্লান্ত হাত আজও হাতুড়ি চালায় সেই একই তেজে। চোখে একটাই আশা পুরোনো পেশাটা যেন বেঁচে থাকে। সরকার যদি একটু সাহায্য করে, তবে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে না। রাম প্রসাদ কর্মকার তিনি শুধু তালা বানান না, তিনি তৈরি করেন ইতিহাসের চাবি, যা এখনও খুলে দেয় বাংলাদেশের গ্রামীণ কারিগরির এক প্রাচীন দরজা।
শাফিউল মিল্লাত/আরকে