গুলিবিদ্ধ নাজমুলকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার জেরেই কি খুন হন সোহেল?

রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় গভীর রাতে বাড়িতে ঢুকে গুলি করে সোহেল রানাকে (৩৫) হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকে এখনো শনাক্ত বা আটক করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে নিহতের স্বজনদের দাবি, পূর্বশত্রুতার জেরে কাঁকন বাহিনীর সদস্যরাই সোহেলকে গুলি করে হত্যা করেছে।
অন্যদিকে কাঁকন বাহিনীর দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত নয়। বরং বাঘার বিল্লাল ও মনতাজ বাহিনীর সদস্যরা পূর্বশত্রুতা কিংবা কোনো মামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
এর আগে শনিবার (৩ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ১টার দিকে বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের পলাশি ফতেপুর করালি নওশারার চরে নিজ বাড়িতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন সোহেল রানা। এ সময় তার স্ত্রী সাধিনা বেগমের ডান হাতের আঙুলে গুলি লাগে এবং তিনিও আহত হন। সোহেল রানা পলাশি ফতেপুর করালি নওশারার চরের কালু মণ্ডলের ছেলে। আহত সাধিনা বেগমকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের মর্গের সামনে নিহত সোহেলের দুই স্বজন নাজমুল ও হাবিবুল্লাহর সঙ্গে কথা হয়। তারা মরদেহের সঙ্গে রামেকের মর্গে এসেছিলেন। বিকেল ৩টা পর্যন্ত মরদেহের ময়নাতদন্ত চলে। এ সময় তারা মর্গের সামনেই অবস্থান করেন।
এ সময় নিহত সোহেলের ভগ্নিপতি হাবিবুল্লাহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পদ্মার চরে রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্তবর্তী পদ্মার চরের নীচ খানপুরের হবিরচরের দক্ষিণে চৌদ্দ হাজার মাঠে খড় কাটাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে খানপুরের মিনহাজ মণ্ডলের ছেলে আমান মণ্ডল (৩৬) এবং একই গ্রামের শুকুর মণ্ডলের ছেলে নাজমুল হোসেন (৩৩) নিহত হন। পরদিন ২৮ অক্টোবর হবিরচর থেকে কুষ্টিয়ার লিটন হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
তিনি আরও দাবি করেন, ২৭ অক্টোবর সোহেল তার স্ত্রী সাধিনা খাতুনকে নিয়ে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি ছিলেন। সেদিন চরে গোলাগুলির ঘটনা শুনে জানতে পারেন, আমান ও নাজমুল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তখন সোহেল গুলিবিদ্ধ নাজমুলকে অন্যদের সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজশাহীতে নিয়ে আসেন। সেই সময়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে সোহেলকেও দেখা যায় বলে আমাদের দাবি। এ কারণে কাঁকন বাহিনী সোহেলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে বাহিনীর সদস্যরা তাকে মুঠোফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। দুই মাস আগে গভীর রাতে সোহেলের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। তবে সেদিন শ্বশুরবাড়িতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান সোহেল।
নিহত সোহেলের দুই স্বজন নাজমুল ও হাবিবুল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবরের ঘটনার দিনের বেশ কিছু স্থিরচিত্র পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ঘটনার দিন হবিরচরে গুলিবিদ্ধ নাজমুল ও আমানকে উদ্ধারের সময় সোহেল সেখানে ছিলেন না। তবে তিনি অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন বলে দাবি করেন নিহত নাজমুল ও আমানের এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। এই হাবিবুর রহমান ২০২৩ সালের ২১ ডিসেম্বর কাঁকন বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হন। এ ঘটনায় তিনি কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানায় একটি মামলা করেন। তবে এত বছরেও কেউ আটক বা গ্রেপ্তার হয়নি বলে জানান তিনি।
সোহেল হত্যাকাণ্ডে কেন কাঁকন বাহিনীর নাম আসছে-এ বিষয়ে জানতে রোববার (৪ জানুয়ারি) রাতে অনেক চেষ্টার পর বাহিনীর এক সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি দাবি করেন, বিল্লাল ও মনতাজ বাহিনী বাঘার স্থানীয়। ভবিষ্যতে হামলার আশঙ্কায় নিহত সোহেলের স্বজনরা তাদের নাম প্রকাশ করছেন না। আর চরে কোনো ঘটনা ঘটলেই কাঁকন বাহিনীকে দোষারোপ করলে আর কিছু করতে হয় না।
এদিকে সোহেল রানাকে গুলি করার ঘটনাটি গভীর রাতে ঘটায় কেউ কাউকে চিনতে পারেনি। এছাড়া দুর্বৃত্তরা এলাকায় ঢুকে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে এলাকাবাসী আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে সোহেলের বাড়িতে ঢুকে তার নাম ধরে ডেকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হলে গুলিটি তার কোমরের ওপর পেটে লাগে। এতে ঘটনাস্থলেই সোহেলের মৃত্যু হয়।
স্থানীয় ও পুলিশের ধারণা, আগের একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাঁকন বাহিনীর লোকজন এসে আতর্কিতভাবে গুলি চালিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। এর আগে রোববার (৪ জানুয়ারি) রামেক হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে বিকেলে সোহেলের মরদেহ তার নিজ এলাকা করালি নওশারার চরে নিয়ে আসা হয়। পরে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাত সাড়ে আটটার দিকে একই এলাকার কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এর আগে গত ২৭ অক্টোবর পদ্মার চরে গোলাগুলিতে বাঘার বাসিন্দা নাজমুল ও আমান এবং কুষ্টিয়ার লিটনের মৃত্যুর পর পদ্মার চরের ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নাম ব্যাপক আলোচনায় আসে। এ ঘটনায় প্রশাসনের ‘অপারেশন ফাস্ট লাইট’ অভিযানে কয়েক দফায় ২০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং অস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, রাজশাহী, নাটোর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার পদ্মার চরে কাঁকন বাহিনীসহ ১১টি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়দের ওপর নির্যাতন চালিয়ে আসছে। রোকনুজ্জামান কাঁকন, যিনি ইঞ্জিনিয়ার কাঁকন নামে পরিচিত, তার বাহিনীর নৃশংসতায় চরাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আতঙ্কে রয়েছে। অন্যান্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে-মণ্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী, সুখচাঁদ বাহিনী ও নাহারুল বাহিনী।
নিহত সোহেলের শ্যালক নাজমুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সোহেলের তিন সন্তান রয়েছে-এর মধ্যে নয় বছরের এক ছেলে এবং সাত ও দুই বছরের দুই মেয়ে। সোহেল রানা মাঠপাহারির (বাহুকদার) কাজ করতেন এবং সাত থেকে আট বছর ধরে এ পেশায় ছিলেন। পূর্বশত্রুতার জেরে তার বাড়িতে ঢুকে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় তার স্ত্রী সাধিনার ডান হাতের আঙুল গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাকে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টিআইচও ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, গুলিবিদ্ধ দুজন এসেছিলেন। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন। আর গুলিবিদ্ধ এক নারী চিকিৎসা নিয়েছেন।
নাজমুল ইসলাম আরও বলেন, সোহেল তাদের টার্গেটে ছিল। বিভিন্ন সময় কাঁকন বাহিনী তার ঘরবাড়িতে হামলা চালায়। একবার সে প্রাণে বেঁচে যায়। এরপর তাকে বারবার মাঠপাহারির কাজ ছেড়ে দিতে বলা হয়। তাকে বলা হয়েছিল, দিনের বেলায় হামলা হলে দেখা যাবে বা পালানো যাবে, কিন্তু রাতের হামলায় বাঁচা যাবে না। করালি নওশারার চরে বাড়ি করতেও তাকে নিষেধ করা হয়েছিল। সে কথা শোনেনি। এখন তার তিন সন্তান এতিম হয়ে গেল। তার স্ত্রী ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াবে? আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি দাবি করছি।
নিহত সোহেলের ভাই জানান, রাতে সোহেল ও তার স্ত্রী ঘরের ভেতর ঘুমিয়ে ছিলেন। রাত ১টার দিকে সন্ত্রাসীরা এসে টিনে আঘাত করে বিকট শব্দ করে। এতে অনেকের ঘুম ভেঙে যায় এবং সবাই ছোটাছুটি শুরু করে। সন্ত্রাসীরা ঘোষণা দেয়, কেউ এলে তাকে গুলি করা হবে। এরপর তারা সোহেলের ঘরে ঢুকে পড়ে। সোহেলের স্ত্রী স্বামীকে বাঁচাতে কাঁথা ও কম্বল দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করলেও সন্ত্রাসীরা টিন কেটে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। এতে সোহেলের পেটে গুলি লাগে এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে নাম ও অডিও (কল রেকর্ড) প্রকাশ না করার শর্তে কাঁকন বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেওয়া ৫০ ঊর্ধ্ব এক ব্যক্তি মুঠোফোনে ঢাকা পোস্টকে বলেন, মনতাজ ও বিল্লাল মাদক ব্যবসায়ী। এর আগে চরের খড় কাটাকে কেন্দ্র করে রাইটা এলাকার মানুষের সঙ্গে যে মারামারি হয়েছিল, সেই ঘটনার সময় বা তার আগেই বিল্লাল-মনতাজের সঙ্গে রোববারের নিহত ব্যক্তির পরিবারের আরেকটি হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত মামলার বিরোধ ছিল। আমি যা শুনেছি, এই ঘটনাটি তারাই ঘটিয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে হবিরচরের ঘটনা কিংবা বালু ব্যবসায়ী বা কাঁকন বাহিনীর কেউ জড়িত নয়।
তিনি আরও বলেন, বিল্লাল ও মনতাজের সঙ্গে নিহত ব্যক্তির পূর্বের মামলা বা হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে কাঁকন ভাই বা বালু ব্যবসায়ীদের ওপর দায় চাপাতে চায়। মিডিয়া সহজেই বিষয়টি গ্রহণ করে। এরা ব্ল্যাকার ও মাদক চোরাকারবারি। মাঝখানে বালিঘাট থাকায় তারা অবাধে মাদক পাচার করতে পারে না। সড়কপথে গেলে পুলিশে ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে। নদীপথেও সহজে যেতে পারে না। এই কারণেই বিরোধের সূত্রপাত। কাঁকন ভাই এসব অপকর্ম করেন না, তিনি একজন ভদ্র ব্যবসায়ী।
তবে কাঁকন বাহিনীর এই সদস্যের বক্তব্যের বিষয়ে বিল্লাল ও মনতাজের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। একাধিক সূত্রে চেষ্টা করেও তাদের পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে বাঘা থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেরাজুল হক বলেন, এই ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। আজ (সোমবার) মামলা হবে। এর আগে রামেক হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। পরে স্বজনরা মরদেহ দাফন করেছেন।
শাহিনুল আশিক/এআরবি