গণভোট ব্যক্তি নির্বাচনের জন্য নয়, আগামীর বাংলাদেশ গঠনের ভোট

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোট সংক্রান্ত জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিটি অক্ষর শহীদদের রক্তে লেখা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সংগ্রাম ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মর্যাদা রক্ষা করতেই এই সনদ রচিত হয়েছে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) দুপুরে রংপুরে শহীদ আবু সাঈদ স্টেডিয়ামে গণভোটের প্রচার ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণে বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আলী রীয়াজ বলেন, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোট কোনো ব্যক্তি নির্বাচনের জন্য নয়, বরং আগামীর বাংলাদেশ গঠনের ভোট। যারা সংগ্রাম করেছেন, জীবন দিয়েছেন এবং গুম-খুনের শিকার হয়েছেন, তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর পবিত্র দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। সাম্য, ইনসাফ ও ন্যায্যতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, অতীতে দুইবার গণভোট হয়েছে। একবার জেনারেল জিয়ার সময় ও আরেকবার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়। সেই সময় তাদের নীতি বাস্তবায়নে জনগণের আস্থা আছে কিনা সে বিষয়ে গণভোট হয়েছিল। এবার সেই প্রশ্ন নেই। জুলাই জাতীয় সনদ ড. ইউনূসের নয়, কোনো ব্যক্তির নয়, জুলাই জাতীয় সনদ তৈরিতে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে ও সকল রাজনৈতিক দল মিলে আলাপ-আলোচনা করে বিভিন্ন বিষয়ে একমত বা ভিন্নমত পোষণ করেছেন। আমরা ৩০টি রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলেছি। তাদের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে। এর বাহিরে সাধারণ মানুষের মতামত গুরুত্বপূর্ণ। তাই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
গণভোটের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে আলী রীয়াজ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরেও এদেশের সাধারণ নাগরিকদের মতামত প্রদানের অধিকার নিশ্চিত করতেই এই গণভোটের আয়োজন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট প্রদানে সকলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি ।
আলী রীয়াজ আরও বলেন, নতুন করে দেশটাকে গড়ে তুলতে হলে গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে হবে। আগামী দিনে তরুণদের হাতে কেমন বাংলাদেশ তুলে দেওয়া হবে, তার সিদ্ধান্ত হবে এই ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটে। যদি ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হয় তবে তরুণরা একটি নতুন ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পাবে।
তিনি বলেন, গণভোটে কোনো ব্যক্তিকে ভোট দেওয়া হচ্ছে না। দীর্ঘ ষোলো বছর ধরে জনগণের টাকা লুটপাট হয়েছে। এই লুটপাট ও দুর্নীতি বন্ধে ‘হ্যাঁ’ ভোট হবে।
এছাড়াও বাংলাদেশে যাতে আবার কোনো ফ্যাসিবাদ তৈরি না হয়, সে জন্য আমাদের সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। গণভোট সেই সজাগ থাকার অন্যতম হাতিয়ার।
সম্মেলনে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ’ হলো দেশে ইনসাফ কায়েমের ঐতিহাসিক দলিল। বিগত ৫৪ বছরের বৈষম্যের ইতিহাস মুছে ফেলা, স্বাধীনতার প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন এবং ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রীয় সংস্কারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
গণভোটের প্রচার কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই গণভোটকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে একটি চক্র শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগ করে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এই প্রোপাগান্ডা রুখে দিয়ে জনগণের কাছে সত্য তুলে ধরাই আমাদের প্রচারণার মূল লক্ষ্য।
শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ স্মরণ করে তিনি বলেন, একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে আবু সাঈদের এই আত্মাহুতি জাতি চিরকাল কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ রাখবে।
উপস্থিত ইমামগণের উদ্দেশে মনির হায়দার বলেন, গণভোটের যৌক্তিকতা তুলে ধরে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ের মাধ্যমে সকল অপশাসন ও বৈষম্য দূর হবে এবং একটি নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হবে।
কারমাইকেল কলেজ জামে মসজিদের খতিব মোহাম্মদ আলী সরকারের সভাপতিত্বে সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামাল উদ্দিন, রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার মো. শহিদুল ইসলাম, রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি আমিনুল ইসলাম এবং মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মজিদ আলী।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান। এছাড়াও বক্তব্য দেন কেরামতিয়া জামে মসজিদের খতিব মাওলানা বায়েজিদ হোসাইন, রংপুর মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি আজগর আলীসহ অন্যরা।
বিভাগীয় প্রশাসন ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত এ সম্মেলনে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলার ১ হাজার ২০০ জন ইমাম-খতিব ছাড়াও সরকারি কর্মকর্তাসহ প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
পরে একই স্থানে বিকেলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে অনুষ্ঠিত বিভাগীয় মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, সংবিধানের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অতীতে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছে। এই অবস্থার অবসান ঘটিয়ে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র কাঠামো গঠনের এখনই উপযুক্ত সময়।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা হচ্ছে না; বরং এর মাধ্যমে দুর্নীতি ও লুটপাট বন্ধের স্থায়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। ফলে পরবর্তীতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা দায়বদ্ধ থাকবে।
ফরহাদুজ্জামান ফারুক/আরএআর