ভুল চিকিৎসার অভিযোগ: অপারেশনের পর পঙ্গুত্বের ঝুঁকিতে কলেজছাত্রী তাকওয়া

যে হাতে থাকার কথা ছিল বই-খাতা-কলম, সেই হাতে এখন প্রেসক্রিপশন, রিপোর্ট আর ওষুধ। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুকে নিয়ে পড়াশোনা করা এক শিক্ষার্থীর জীবন আজ ভুল চিকিৎসার অভিযোগে থমকে গেছে। অসহ্য যন্ত্রণা আর সীমাহীন কষ্টে দিন কাটছে নোয়াখালী সরকারি মহিলা কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাকওয়া আক্তারের।
তাকওয়া আক্তার নোয়াখালীর সদর উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের শিবপুর এলাকার গোপীনাথপুর গ্রামের প্রবাসী মহিব উল্যাহর মেয়ে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে রিকশাযোগে কলেজে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়ে পায়ে আঘাত পান তাকওয়া। পরে জেলা শহর মাইজদীর বেসরকারি হাসপাতাল মেট্রো হসপিটালে ডা. প্রবীর কুমার ভৌমিকের হাতে অস্ত্রোপচার করানো হয়। চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, অপারেশনের পর সে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা দেয়।
অপারেশনের পর থেকেই তাকওয়ার পায়ে তীব্র ব্যথা, ফোলা এবং স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে না পারার সমস্যা দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবস্থার আরও অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসকরা জানান, আগের অস্ত্রোপচারে গুরুতর ভুল হয়েছে, যার ফলে তার পায়ের স্নায়ু (নার্ভ) ও হাড় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে তাকওয়ার মা শিল্পি আক্তার নোয়াখালীর সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত বছরের ৯ নভেম্বর তাকওয়াকে নোয়াখালীর মেট্রো হাসপাতালে পায়ের অপারেশনের জন্য ভর্তি করা হয়। অপারেশনটি করেন চিকিৎসক প্রবীর কুমার ভৌমিক।
অভিযোগে বলা হয়, অপারেশনের সময় রক্ত চলাচল বন্ধ রাখতে রোগীর পায়ের উরুতে টুর্নিকেট ব্যবহার করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী অপারেশনের পরপরই এটি খুলে দেওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ছয় ঘণ্টা পর তা খোলা হয়। এ সময় রোগী প্রচণ্ড ব্যথায় কাতরালেও চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি।
শিল্পি আক্তার বলেন, রাত সাড়ে ৮টার দিকে টুর্নিকেট দেওয়া হয়, কিন্তু রাত আড়াইটার দিকে খুলে দেওয়া হয়। আমার মেয়ে তখন অসহ্য ব্যথায় ছটফট করছিল, কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি।
পরিবারের দাবি, সঠিক চিকিৎসার আশায় ইতোমধ্যে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। কিন্তু এতে কোনো উন্নতি হয়নি। উল্টো ভুল চিকিৎসার কারণে তাকওয়ার জীবন অনিশ্চয়তার দিকে চলে গেছে। বর্তমানে চিকিৎসার খরচ বহন করাও তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
তাকওয়ার মা আরও বলেন, আমার মেয়ের স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবে, নিজের পায়ে দাঁড়াবে। আজ সে ঠিকমতো হাঁটতেও পারে না। পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না।
বর্তমানে শারীরিক কষ্টের পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছে তাকওয়া। পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সবকিছুই থমকে গেছে। তার একটাই প্রশ্ন—ভুল চিকিৎসায় তার স্বপ্ন ভাঙার দায় কে নেবে?
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, তারা কেবল অপারেশন থিয়েটার ভাড়া দিয়েছেন। অপারেশনের পারিশ্রমিক চিকিৎসক নিজেই নিয়েছেন। তবে মেয়েটির অসুস্থতার বিষয়টি তারা জানেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসক প্রবীর কুমার ভৌমিকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মরিয়ম সিমি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার আমাদের কাছে অভিযোগ দিয়েছে। আমরা অভিযোগটি গ্রহণ করেছি। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসিব আল আমিন/আরকে