লালমনিরহাটে বদলাচ্ছে রাজনৈতিক চিত্র, জাপার ঘাঁটিতে বিএনপি-জামায়াতের দাপট

একসময় জাতীয় পার্টির নিরঙ্কুশ প্রভাব থাকলেও এবারের নির্বাচনে লালমনিরহাটে সেই চিত্র আর নেই। জেলার তিনটি সংসদীয় আসনেই এখন প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। জাপার আধিপত্য ভেঙে নতুন শক্তির উত্থান ঘটাতে দুই দলই জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। তবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল কয়েকটি আসনে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে, যা নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লালমনিরহাট-১ : উন্নয়ন বনাম সংগঠনের হিসাব
পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান। উন্নয়নকেন্দ্রিক বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি ভোটারদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন।
তবে তার মনোনয়ন ঘিরে বিএনপির ভেতরে চাপা অসন্তোষ রয়েছে। দলের একাংশের এই অবস্থান ভোট ভাগাভাগির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। যদিও দলীয় নেতারা বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলছেন, মাঠে সবাই ধানের শীষের পক্ষেই কাজ করছেন।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে চায় জামায়াতে ইসলামী। দলটির প্রার্থী আনোয়ারুল ইসলাম রাজু মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় পরিচিত মুখ। অন্যদিকে, রংপুর-১ আসনের সাবেক এমপি ও প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাকে এবার জাপা থেকে লালমনিরহাট-১ আসনে মনোনয়ন দেওয়ায় এই আসনে লড়াইকে ত্রিমুখী করে তুলেছে।
লালমনিরহাট-২: পারিবারিক রাজনীতিতে জটিলতা
কালীগঞ্জ ও আদিতমারী উপজেলা নিয়ে গঠিত লালমনিরহাট-২ আসন। এই আসনের ৬ বারের জাতীয় পাটির সংসদ সদস্য ও বিএনপি থেকে ১ বারের সংসদ সদস্য ছিলেন মরহুম মজিবর রহমান। তবে ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় আওয়ামিলীগের দখলে ছিলো এই আসনটি। এবার নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জেলা কমিটির সহ-সভাপতি রোকন উদ্দিন বাবুল। তবে তার মনোনয়ন নিয়ে দলের ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে, বিশেষ করে কালীগঞ্জ উপজেলা পর্যায়ে। বাবুলের চাচাতো ভাই কালিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক জাহাঙ্গীর আলম বিদ্রোহী প্রার্থী না হলেও তার সমর্থকদের বড় অংশের অবস্থান বিএনপির জন্য চিন্তার কারণ। এই আসনে জামায়াতে ইসলামী থেকে প্রার্থী হয়েছেন জেলা সেক্রেটারি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ফিরোজ হায়দার লাভলু। জামাত প্রার্থী দীর্ঘদিন থেকে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে আছে। লাভলু লালমনিরহাট-২ আসনের যেখানেই মানুষ মারা যাবে তার জানাযায় তিনি গিয়ে পৌঁছাবে। তিনি বন্যার সময় তিস্তা তীরবর্তী মানুষের মাঝে শুকনা খাবার ও শীতবস্ত্র এবং গরীব মেধাবীদের জন্য পড়াশোনা খরচসহ বিভিন্ন জনসেবা মূলক কাজে দীর্ঘদিন থেকে নিয়োজিত। স্থানীয়দের ধারণা, এখানে মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই।
তবে বিএনপির ভোটে ভাঙন ধরলে জাপার সাবেক এমপির ছেলে ও জনতার দলের চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ান জেনারেল শামীম কামাল সমীকরণে ঢুকে পড়তে পারেন।
লালমনিরহাট-৩ : দুলুর জনপ্রিয়তা বনাম জামায়াতের নীরব ভোট
লালমনিরহাট সদর উপজেলা নিয়ে লালমনিরহাট-৩ আসন গঠিত এ আসনে বিএনপির প্রার্থী বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। এই আসনে বিএনপির ভেতরে প্রকাশ্য কোনো বিভক্তি না থাকায় দলটি তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
তিস্তা বাঁচাও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ব্যাপক জনসমর্থন অর্জন করায় দুলু ভোটারদের কাছে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। উন্নয়নমূলক কাজের অভিজ্ঞতাও তার পক্ষে যাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীকে হালকাভাবে নিলে ভুল হবে। দলটির প্রার্থী জেলা আমির অ্যাডভোকেট আবু তাহের এবং এই আসনে জামায়াতের সংগঠিত ‘নীরব ভোট’ রয়েছে।
তিনটি আসনেই জাতীয় পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি ও গণসংহতি আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠে রয়েছেন। তারা ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। তবে এ জেলায় এনসিপির কোনো প্রার্থী নেই।
সব মিলে লালমনিরহাটে এবারের নির্বাচন জাপা বনাম বিএনপি নয়, বরং বিএনপি-জামায়াতের মধ্যকার শক্তির লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও নীরব ভোট—এই দুই বিষয়ই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
আরকে