ঠাকুরগাঁও শহরজুড়ে অচল সিসি ক্যামেরা, বাড়ছে চুরি-ছিনতাই

ঠাকুরগাঁওয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা ও যানজট। শহরের ব্যস্ত সড়ক ও বাজার এলাকায় যানজটের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংঘটিত হচ্ছে মোটরসাইকেল চুরি, অটোরিকশা ছিনতাই, দোকানে চুরি ও পথচারীদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা। অথচ এসব অপরাধ দমনে যে সিসি ক্যামেরা ছিল পুলিশের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার, সেটিই এখন অচল।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরাগুলো আজ ঠাকুরগাঁও শহরে কার্যত অকার্যকর। প্রশাসনের চরম অবহেলা ও দায়হীনতার কারণে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও প্রবেশপথে বসানো প্রায় সব সিসি ক্যামেরাই নষ্ট পড়ে আছে। ফলে প্রকাশ্য দিবালোকে চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হলেও অপরাধীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছে। আর ভুক্তভোগীরা পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা পুলিশের উদ্যোগে কয়েক বছর আগে শহরের প্রবেশপথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে শতাধিক সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল অপরাধীদের গতিবিধি নজরদারিতে রাখা এবং ঘটনার পর দ্রুত সনাক্ত করা। কিন্তু স্থাপনের পর থেকেই এসব ক্যামেরার রক্ষণাবেক্ষণ কার্যত উপেক্ষিত। নিয়মিত তদারকি না থাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন, যান্ত্রিক ত্রুটি ও নষ্ট হার্ডডিস্কের কারণে ক্যামেরাগুলো একে একে অকেজো হয়ে পড়েছে।
জেলা পুলিশের তথ্য মতে, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপিত শতাধিক সিসি ক্যামেরার বড় একটি অংশ বর্তমানে অচল অবস্থায় রয়েছে। তবে কতগুলো সচল রয়েছে এবং কতগুলো পুরোপুরি নষ্ট। এ বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ ও হালনাগাদ তথ্য নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের এই অস্পষ্টতাই প্রশ্ন তুলছে প্রকল্পটির তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, সিসি ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যাওয়ার সুযোগে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা চুরি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি ও পথচারীদের ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে কয়েকগুণ। অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ দিলেও সিসি ফুটেজ না থাকায় অপরাধী সনাক্ত করা যাচ্ছে না। এতে তদন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং ভুক্তভোগীদের হয়রানি বাড়ছে।
আবু বক্কর নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, আগে ক্যামেরা থাকায় অন্তত ভয় ছিল। এখন ক্যামেরা নষ্ট জানার পর থেকে চোরেরা আরও সাহসী হয়েছে। রাতে দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে আতঙ্ক কাজ করে।
মেহেদী নামে এক যুবক বলেন, যানজটের ভিড়ে মোবাইল ছিনতাই এখন নিত্যদিনের ঘটনা। সিসি ক্যামেরা থাকলে অপরাধীরা ধরা পড়বে এই বিশ্বাসটাই ছিল। কিন্তু ক্যামেরা যদি কাজ না করে, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
মৌমিতা নামে এক কলেজছাত্রী বলেন, সন্ধ্যার পর একা বের হতে ভয় লাগে। চারপাশে ক্যামেরা থাকলেও কোনো লাভ নেই, কারণ সব নষ্ট। নিরাপত্তার বিষয়টা নিয়ে কেউ সিরিয়াস না।
ইব্রাহিম ও রুবেল রানা নামে দুইজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, সিসি ক্যামেরা অচল হওয়ার সুযোগে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও দোকানপাটে চুরির ঘটনা বাড়লেও সিসি ফুটেজ না থাকায় অনেক মামলায় তদন্ত এগোচ্ছে না। ফলে থানায় অভিযোগ দিয়েও ভুক্তভোগীদের বারবার হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও ট্রাফিক বিভাগের সার্জেন্ট মো. রাহুল আহম্মেদ বলেন, সিসি ক্যামেরা থাকলে যানজট নিয়ন্ত্রণ, দুর্ঘটনার কারণ নির্ণয় ও আইন লঙ্ঘনকারীদের সনাক্ত করা সহজ হয়। ক্যামেরাগুলো অচল হয়ে যাওয়ায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আমরা কার্যকর সহায়তা পাচ্ছি না।
এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. খোদাদাদ হোসেন বলেন, শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপিত যেসব সিসি ক্যামেরা নষ্ট বা অচল হয়ে পড়েছে, সেগুলোর তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এসব ক্যামেরা সংস্কার ও পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রেদওয়ান মিলন/আরকে