২০ বছরে ৯ ঘূর্ণিঝড়: ২৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষত নিয়ে ধুঁকছে উপকূল

গত দুই দশকে দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল বারবার বিধ্বস্ত হয়েছে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে। ‘সিডর’ থেকে ‘রেমাল’— এই সময়ের মধ্যে অন্তত নয়টি বড় ঘূর্ণিঝড়ে খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, এসব ঘূর্ণিঝড়ে শুধু আর্থিক ক্ষতির পরিমাণই দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। এর বাইরে রয়েছে প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, জীবিকা হারানো এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও মানসিক ক্ষতি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ঝুঁকি আরও তীব্র হচ্ছে। ঝুঁকি তীব্র হলেও এক্ষেত্রে সরকারের অভিযোজন পরিকল্পনা আসলে কি প্রস্তুত? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য শুধু ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন প্রকল্পগুলোকে আরও শক্তিশালী করার সময় এসেছে।
তাদের মতে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ডেল্টার অংশ হওয়ায় প্রাকৃতিকভাবেই বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ। এদিকে, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে। ফলে মেরুঅঞ্চলের বরফগলন ত্বরান্বিত হচ্ছে। বরফ গলা পানি সমুদ্রে এসে মিশছে, ফলে সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ছে। বাংলাদেশ নিচু দেশ হওয়ায় এই বাড়তি পানি সহজেই আমাদের উপকূলীয় এলাকায় ঢুকে পড়ছে। এর ফলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। একইসঙ্গে বেড়ে গেছে লবণাক্ততার হার।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা যেমন— খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। সেখানে লবণাক্ততার বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বন উজাড়, সুপেয় পানির সংকট এবং কৃষি উৎপাদন হ্রাস মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তাকে গভীরভাবে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। পাশাপাশি বন্যা ও লবণাক্ত পানির কারণে ডায়রিয়া, চর্মরোগ, জলজনিত রোগ, পুষ্টিহীনতাসহ স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
উপকূলীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকট
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ম্যাপলক্রাফট’ বিশ্বের ১৭০টি দেশের উপর জরিপ চালিয়ে যে ১৬টি দেশকে সর্বাপেক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ‘ওয়ার্ল্ড রিস্ক ইনডেস্ক-২০২৩’ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের নবম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশ তার ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড হারাবে, যা ৩০ শতাংশ কৃষিজমি ধ্বংস করবে।
এদিকে, জার্মানওয়াচ-এর ‘জলবায়ু ঝুঁকি সূচক-২০২৫’ অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৩০-১০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয়সহ সমগ্র উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৮৩৪ বর্গকিলোমিটার এলাকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হবে এবং ১০ মিলিয়ন (এক কোটি) মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে।

২০ বছরে ৯ ঘূর্ণিঝড়, ক্ষতি ২৩ হাজার কোটি টাকা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশের উপকূলে একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের বেশির ভাগই আঘাত করেছে দক্ষিণ-পশ্চিম ও পশ্চিম উপকূলে। যেখানে জনবসতি, কৃষি, মৎস্য ও বনসম্পদের ওপর প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি।
২০০৭ সালে আঘাত হানা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ওই এক ঝড়েই আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা, যা গত ২০ বছরের মধ্যে একক ঘূর্ণিঝড়ে সর্বোচ্চ ক্ষতির ঘটনা। এর দুই বছর পর ২০০৯ সালে ঘূর্ণিঝড় আইলা খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার সংকট তৈরি করে। এই ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা।
২০১৯ সাল ছিল উপকূলের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ওই বছর পরপর আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় ফণী ও বুলবুল। ফণীতে খুলনা ও বরিশাল উপকূলে ক্ষতি হয় ৫৩৬ কোটি টাকা। আর বুলবুলে খুলনা, পটুয়াখালী ও বরিশালে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৬৩ কোটি টাকা।
২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড় আম্পান উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে বড় ধাক্কা দেয়। খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও সাতক্ষীরাসহ মোট ১৭টি জেলায় আম্পানের প্রভাবে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে ঘূর্ণিঝড় ইয়াস পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকূলে আঘাত হানে। এতে ক্ষতি হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। ২০২২ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং খুলনা, বরিশাল ও পটুয়াখালীতে প্রভাব ফেলে। এই ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৪১৮ কোটি টাকা।
২০২৩ সালে ঘূর্ণিঝড় মিধিলি এবং ২০২৪ সালে সর্বশেষ ঘূর্ণিঝড় রেমাল উপকূলীয় এলাকাকে আবারও বিপর্যস্ত করে। মিধিলিতে ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ২০০ কোটি টাকা। আর রেমালে খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল ও পটুয়াখালীসহ পশ্চিম উপকূলে ক্ষতি হয় প্রায় ৬ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা ও অভিযোজন ভাবনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক ক্ষতির হিসাবের বাইরে এসব ঘূর্ণিঝড়ের সামাজিক ও মানবিক প্রভাব আরও গভীর। প্রাণহানি, ঘরবাড়ি ধ্বংস, কৃষিজমিতে লবণাক্ততা, মৎস্য খাতের ক্ষতি এবং মানুষের দীর্ঘমেয়াদি জীবিকা সংকট উপকূলকে ক্রমেই আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা ও ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে। তাই কেবল উদ্ধার ও ত্রাণ নয়, উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণ, টেকসই পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনাই এখন সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিশেষজ্ঞ মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, ‘গত দুই দশকে সিডর, আইলা, বুলবুল, আম্পান, ইয়াস, সিত্রাংসহ একের পর এক ঘূর্ণিঝড়ে আমরা বিপুল প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ক্ষতি ও জীবিকা ধ্বংসের অভিজ্ঞতা দেখেছি। যদিও আশ্রয়কেন্দ্র ও আগাম সতর্কবার্তার কারণে প্রাণহানি আগের তুলনায় কমেছে। তবে উপকূলীয় এলাকার ঘরবাড়ি, কৃষি, মাছচাষ ও সুপেয় পানির উৎস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বাস্তবতা আমাদের দেখিয়েছে যে শুধু দুর্যোগের সময় নয়, দুর্যোগ-পূর্ব প্রস্তুতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
‘বিদ্যমান সংকট ও জাতীয় নিরাপত্তার ওপর প্রভাব বাংলাদেশের বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতি এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যেই উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা এতটাই বৃদ্ধি পাবে যে প্রায় ১৪৮টি উপজেলা সরাসরি এর ক্ষতিকর প্রভাবের শিকার হবে। ফলে দেশের সামগ্রিক কৃষিজমির অন্তত ৩০ শতাংশ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়বে, যা সরাসরি জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় কেবল কৃষি খাতের ক্ষতি নয়, বরং বিপুল সংখ্যক মানুষের শহরমুখী অভিবাসনের চাপ সৃষ্টি করবে।’
গত ২০ বছরে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে সিডর থেকে রেমাল পর্যন্ত অন্তত ৯টি বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। ২০০৭ সালের সিডর একাই প্রায় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে। এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির বাইরেও উপকূলীয় জেলাগুলোর জনবসতি, কৃষি, মৎস্য ও বনসম্পদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে
নাদিয়া নিভিন আরও বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই অভিবাসন সংকট দেশের বিগত কয়েক দশকের সকল উন্নয়নমূলক অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই প্রেক্ষাপটে শুধু উদ্ধার ও ত্রাণকেন্দ্রিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। উপকূলীয় বাঁধ টেকসই ও বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে শক্তিশালী করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন এবং কৃষি ও জীবিকায় অভিযোজনমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে উপকূলকে নিরাপদ করা যাবে না। এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবসম্মত অভিযোজন কৌশল।’
আশ্রয়কেন্দ্রেই অনিরাপদ নারী ও শিশু
ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সাধারণত নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ধরা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দুর্যোগ-পরবর্তী বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, এসব আশ্রয়কেন্দ্রে নারী ও শিশুদের জন্য পরিবেশ এখনও নিরাপদ নয়। এই প্রেক্ষাপটে আশ্রয়কেন্দ্রের অব্যবস্থাপনা, আইনি শূন্যতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলা)-এর রিসার্চ, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড ক্যাম্পেইনের কো-অর্ডিনেটর রেহনুমা নূরাইন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে দেশের অধিকাংশ আশ্রয়কেন্দ্রেই নারী ও শিশুবান্ধব পরিবেশের স্পষ্ট অভাব রয়েছে। দুর্যোগের সময় ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ায় অনেক পরিবারকে এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে হয়। অথচ সেখানে শিশুদের জন্য কোনো শিক্ষাব্যবস্থা বা মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা নেই, যা তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে ব্যাহত করছে।’
নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে রেহনুমা নূরাইন বলেন, ‘আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারীদের জন্য নির্ধারিত ওয়াশরুমগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। পর্যাপ্ত আলো, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে এসব স্থানে নারীরা বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও ভায়োলেশনের ঝুঁকিতে থাকেন। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে এ ধরনের ঘটনার উল্লেখ থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান নয়।’
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড হারাতে পারে, যা প্রায় ৩০ শতাংশ কৃষিজমি ধ্বংস করবে। ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়লে ১০ মিলিয়ন মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সংকট জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা এবং সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে
আইনি কাঠামোর দুর্বলতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনে পুনর্বাসনের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও দুর্যোগ চলাকালীন আশ্রয়কেন্দ্রের ন্যূনতম মানদণ্ড, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা কেমন হবে— সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। এই অস্পষ্টতার সুযোগেই দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।’
আরও পড়ুন
আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকার দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন বেলার এই প্রতিনিধি। বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যু রাজনৈতিক ইশতেহারে গভীর ও বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রকে নারী ও শিশুবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে থাকা জরুরি।’
জলবায়ু বিপর্যয় ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা
জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য শুধু ভবিষ্যতই নয়, বর্তমানে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি করছে। যার প্রভাব অর্থনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতাকে একসঙ্গে চাপে ফেলছে। বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তা ও দায়িত্বহীনতার কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি বাংলাদেশের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও করণীয় তুলে ধরেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রতি বছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও খরার কারণে জিডিপির প্রায় ১ শতাংশ হারাচ্ছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে।’ তার ভাষায়, ‘ফসলহানি, পানির সংকট এবং ব্যাপক জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি একপর্যায়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলবে। দেশের এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড ডুবে গেলে বাকি দুই-তৃতীয়াংশ অঞ্চলে যে অতিরিক্ত জনচাপ তৈরি হবে, তাতে অস্থিরতা আর ব্যতিক্রম নয়; বরং স্বাভাবিক বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে।’
দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারী ও শিশুবান্ধব পরিবেশের চরম অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেখানে পর্যাপ্ত আলো ও পৃথক ওয়াশরুমের অভাবে নারীরা সহিংসতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন। বেলার তথ্যমতে, দুর্যোগের সময় শিশুদের জন্য কোনো শিক্ষা বা মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা না থাকায় তাদের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। আইনে অস্পষ্টতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ অবহেলিত রয়ে গেছে, যা সংস্কার করা জরুরি
বৈশ্বিক দায়িত্ব প্রসঙ্গে উপদেষ্টা তীব্র সমালোচনা করেন তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর কৌশলগত বিরোধিতা, কিয়োটো চুক্তির ব্যর্থতা এবং প্যারিস চুক্তির দুর্বল বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী জি-২০ দেশগুলো, অথচ জলবায়ু ঝুঁকিতে সপ্তম অবস্থানে থাকা বাংলাদেশকেই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে।’
বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, সেখানে ১১টি জলবায়ু ‘চাপ অঞ্চল’ চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অঞ্চলে টেকসই অভিযোজন নিশ্চিত করতে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রয়োজন হবে প্রায় ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘সংকট মোকাবিলায় শুধু অর্থই যথেষ্ট নয়, উন্নয়নের দর্শন ও কাঠামো মৌলিকভাবে পরিবর্তন না করলে এই লড়াইয়ে জেতা সম্ভব নয়।’
টিআই/
