ময়মনসিংহে ৯টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী, চ্যালেঞ্জে ধানের শীষের প্রার্থীরা

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ৯টিতে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এতে দলীয় ভোট দুই ভাগ হয়ে যাওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে দলটির ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা। এতে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠে ফায়দা লুটতে টাকা ছড়াচ্ছে জামায়াতে ইসলামির প্রার্থীরা। এমন অভিযোগ বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদসহ সাধারণ ভোটারদের।
গত কয়েকদিনে ময়মনসিংহ জেলার ১১টি আসনের সংশ্লিষ্ট প্রার্থী, ভোটার ও কর্মী-সমর্থকদের সরেজমিন ঘুরে সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য।
এর মধ্যে দেশের সীমান্তবর্তী ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। তার সঙ্গে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে ঘোড়া প্রতীকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন উত্তর জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সদস্য ও ব্যবসায়ী সালমান ওমর রুবেল। তার সঙ্গে গোপন জোট বেঁধে ধানের শীষের পরাজয় নিশ্চিত করতে মাঠে কাজ করছে সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতা আফজাল এইচ খানের অনুসারীরা। এসব কারণে ইতোমধ্যে দলের অনেক নেতা বহিষ্কার হয়েছেন। এরপরও দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে সকল প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে জয়ের ব্যাপারে বিএনপির প্রার্থী আশাবাদী হলেও সাধারণ ভোটাররা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
একই অবস্থা ময়মনসিংহ-২ (ফুলপুর-তারাকান্দা) আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জেলা উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোতাহার হোসেন তালুকদার। তার সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ২০২৪ সালের ঢামি নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে গাদ্দারি করে বহিষ্কৃত হওয়া সাবেক এমপি শাহ শহীদ সারোয়ার। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একটি হত্যা মামলায় আসামি হয়ে কারাগারে বন্দি থেকে মনোনয়ন জমা দিয়ে প্রার্থী হন। গত ১ ফেব্রুয়ারি এই প্রার্থী জামিনে কারামুক্ত হয়ে ভোটের মাঠে ধানের শীষকে বেকায়দায় ফেলতে নানা পরিকল্পনায় মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এতে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আলোচনায় উঠে এসেছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী মুফীত মুহাম্মদুল্লাহ। তবে এখন পর্যন্ত আসনটিতে ভোটের সমীকরণে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির প্রার্থী, এমন দাবি স্থানীয় ভোটারদের।
ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনে ভোটের মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং উপজেলা বিএনপির বহিষ্কৃত আহ্বায়ক আহম্মেদ তায়েবুর রহমান হিরন। বিএনপি দলীয় প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এম. ইকবাল হোসাইনের সঙ্গে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস দিচ্ছে ভোটাররা। তবে দিনে দিনে বিএনপির নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে সক্রিয় হওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটের সমীকরণে চির ধরতে শুরু করেছে বলেও দাবি তাদের। এ সুযোগে ভোটের মাঠে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আলোচনায় উঠে এসেছেন বই প্রতীকের ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের হাফেজ মাওলানা আবু তাহের খান। ফলে শেষতক ত্রিমুখী লড়াইয়েও ধানের শীষকে এগিয়ে দেখছেন সাধারণ ভোটাররা।
ভোটের মাঠে চারমুখী লড়াই চলছে ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে। এ আসনে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী দুই দলেই রয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী। এর মধ্যে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ধানের শীষের প্রার্থী আখতারুল আলম ফারুকের সঙ্গে ভোটের সমীকরণে ফুটবল প্রতীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী প্রয়াত সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার শামছ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী আখতার সুলতানা। সম্পর্কে তারা চাচি-ভাতিজা। অপরদিকে আসনটিতে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের লড়াইয়ে শক্ত বাগড়া দিয়েছেন দল থেকে বহিস্কৃত বিদ্রোহী প্রার্থী অধ্যাপক জসীম উদ্দিন। ফলে আসনটিতে শেষতক চারমুখী ভোটের লড়াই হবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনে ত্রিমুখী ভোট যুদ্ধের আভাস দিয়েছেন স্থানীয় ভোটাররা। তাদের মতে- এ আসনে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ধানের শীষের প্রার্থী ডা. মাহাবুবুর রহমান লিটনের সঙ্গে ভোটের মাঠে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন এ আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি আব্দুল খালেক সরকারের ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহাম্মদ আনোয়ার সাদত। তাদের সঙ্গে ত্রিমুখী ভোট যুদ্ধে অবতীর্ন হয়েছেন ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জামায়াতের প্রার্থী ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান সোহেল। ফলে নিরব ভোটে এ আসনটিতে দাঁড়িপাল্লা চমক দেখাতে নানা পরিকল্পনায় কাজ করছে বলেও জানা গেছে।
ময়মনসিংহ-৮ (ঈশ্বরগঞ্জ) আসনে ভোটের মাঠের বড় ফ্যাক্টর হিসাবে তৃণমূলের জনপ্রিয়তায় শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং ধানের শীষের প্রার্থী প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু। মানবিক কর্মকাণ্ডসহ সৎ ব্যক্তিত্বের গুণাবলীতে বিএনপিসহ সব মহলেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে রয়েছেন তিনি। তার সঙ্গে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন এ আসনের সাবেক এমপি শাহ নূরুল কবীর শাহীন। প্রথমদিকে তিনি ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী হওয়ার আশায় দল ছাড়লেও ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ায় ভোটের মাঠে তিনি অনেকটাই বেকায়দায় রয়েছেন বলেও জানান স্থানীয় ভোটাররা। ফলে আসনটিতে ধানের শীষের জয় অনেকটাই নিশ্চিত বলে আশাবাদি বিএনপির প্রার্থী প্রকৌশলী লুৎফুল্লাহেল মাজেদ বাবু ও সমর্থকরা।
ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনের ভোট যুদ্ধে নেমেছে চাচী-ভাতিজা। এর মধ্যে ধানের শীষের প্রার্থী সাবেক এমপি প্রয়াত আনোয়ারুল হক খানের ছেলে ইয়াসের খান চৌধুরীর সঙ্গে ভোটে লড়ছেন সাবেক এমপি প্রয়াত খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান চৌধুরী। এতে স্থানীয় বিএনপির একটি অংশ বিদ্রোহী প্রার্থীর দিকে ঝুকে যাওয়ায় শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। কারণ আসনটিতে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থন পেয়েছেন বাংলাদেশ ডেভেলমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল হক চাঁন। এর ফলে আসনটিতে ভোটের লড়াই হবে ত্রিমুখী। এ সমীকরণে জয়ের ব্যাপারে অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে ধানের শীষ।
ইতিমধ্যে দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষে ভোটের মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে ময়মনসিংহ-১০ (গফরগাঁও) আসন। এ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন আখতারুজ্জামান বাচ্চু। তবে তাকে টেক্কা দিতে আসনটিতে জোট বেঁধেছেন মনোনয়ন বঞ্চিত সহোদর চাচা-ভাতিজা বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত এবি সিদ্দিকুর রহমান এবং মুশফিকুর রহমান। ভোটের মাঠে দু’হাতে টাকা ছড়িয়ে ফায়দা লুটতে বাহুশক্তির প্রভাববিস্তারেরও অভিযোগ উঠেছে এ আসনের বিদ্রোহী প্রার্থী এবি সিদ্দিকুর রহমানের বিরুদ্ধে। তবে শেষতক পাগলা থানা এলাকা এবং গফরগাঁও উপজেলার ভোটের সমীকরণে আসনটিতে ধানের জয়ের বিষয়ে আশাবাদী বিএনপি দলীয় প্রার্থী আখতারুজ্জামান বাচ্চু।
জানতে চাইলে এবি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি বাহুশক্তি প্রদর্শন করছি না, তাছাড়া টাকা ছড়ানোর কোন প্রশ্নই আসে না। আমি একজন ব্যবসায়ী, মানুষ যাকে পছন্দ তাকে ভোট দেবে। আমিতো আমার জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী থাকবই।
শিল্পাঞ্চল হিসাবে খ্যাত ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনে বিদ্রোহী ও ধানের শীষের প্রার্থীতায় ভোটের মাঠে টালমাটাল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন ভোটাররা। এর মধ্যে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও ধানের শীষের প্রার্থী ফখরুদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চুর সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা মোহাম্মদ মুর্শেদ আলম। ফলে আসনটিতে সেনায় সেনায় টক্করে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে বলেও মত দেন স্থানীয়রা। অভিযোগ উঠেছে- ভোটারদের পক্ষে টানতে টাকা ছড়াচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এমন অভিযোগে ইতিমধ্যে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এক সমর্থককে অর্থদণ্ড করেছে স্থানীয় প্রশাসন।
কিন্তু একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকার কারণে ফখরুদ্দিন আহম্মেদ বাচ্চু এবং মোহাম্মদ মুর্শেদ আলমের বক্তব্য জানা যায়নি।
তবে এসব বিষয়ে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত) ও ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ অভিযোগ করে বলেন, বেহেস্তের টিকিট বিক্রি করে যারা সফল হতে পারেনি, তারা এখন ভোটের মাঠে ফায়দা লুটতে টাকা ছড়াচ্ছে। নির্বাচনি বিধি লঙ্গন করে তারা কর্পোরেট প্রচারণায় ভাড়া করা লোকদের নিয়ে বাড়ি থেকে এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করে বিকাশে টাকা পাঠাচ্ছে। ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনকে এসব বিষয় মৌখিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ধানের শীষ জনগণের আস্থার প্রতীক। ইনশাল্লাহ- বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা মাঠে সক্রিয় রয়েছে, টাকা ছড়িয়ে বা প্রপাগান্ডা করে ধানের শীষের বিজয় ঠেকানো যাবে না।
এ অভিযোগ বিষয়ে যোগাযোগ করেও একটি জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে ময়মনসিংহ জেলা জামায়াতের আমির মো. আব্দুল করিমের বক্তব্য জানা যায়নি। তবে তার দলের একাধিক নেতাকর্মী বলেন, পরাজয়ের আতঙ্কে ভুগছে বিএনপি। এ কারণে তারা জামায়াতের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছে।
এছাড়া নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় আচরবিধি এবং ভোটের মাঠে সব প্রার্থীদের সমান সুযোগে নিশ্চিত করতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সাইফুর রহমান বলেন, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও অবাধ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। সে লক্ষ্যে প্রশাসন মাঠে কাজ করছে, এতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।
আমান উল্লাহ আকন্দ/আরকে