মানবিকতার শক্তিই ঢাকা পোস্টের সত্যিকারের অর্জন

২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি—বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে ঢাকা পোস্ট। ‘সত্যের সাথে সন্ধি’—এই অঙ্গীকারে আত্মপ্রকাশের ছয় বছর পর আজ সেই যাত্রা দাঁড়িয়েছে দৃঢ়তায়, ভালোবাসায় আর মানুষের অকৃত্রিম আস্থায়। ঢাকা পোস্ট এখন কেবল একটি সংবাদমাধ্যম নয়, এটি এক অনুভবের নাম, এক বিশ্বাসের গল্প, মানুষের হৃদয়ের কাছের ঠিকানা।
মানুষের কষ্টে পাশে দাঁড়ানোর সংবাদ যখন শুধু তথ্য নয়, হয়ে ওঠে সহানুভূতির গল্প—সেখানেই ঢাকা পোস্ট আলাদা। অসহায় মানুষের জীবনের হাহাকারের কথাগুলো ঢাকা পোস্টের পাতায় স্থান পায়, তখনই সাড়া পড়ে দেশ-বিদেশের অগণিত পাঠকের মনে। কেউ পাঠায় টাকা, কেউ সহায়তা নিয়ে ছুটে যায় ঘটনাস্থলে। একটি প্রতিবেদন বদলে দেয় একটি জীবন—এই মানবিকতার শক্তিই ঢাকা পোস্টের সত্যিকারের অর্জন।
ঢাকা পোস্টের সবচেয়ে বড় শক্তি—মানুষের পাশে থাকা। ঢাকা পোস্টের সংবাদগুলো মানবিকতার সেতুবন্ধনে পরিণত করে। সত্য ও পেশাদারিত্বে অটল। প্রতিদিনের অসংখ্য সংবাদের ভিড়ে ঢাকা পোস্ট আলাদা কারণ—সত্য ও পেশাদারিত্বের জন্য। নির্ভুল তথ্য, ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্লেষণ ও নৈতিক সাংবাদিকতার মান ধরে রাখাই এ প্রতিষ্ঠানের মূল দর্শন। ঢাকা পোস্ট শুধু পাঠকের নয়, তরুণ সাংবাদিকদেরও প্রেরণার জায়গা। এখানে একদল উদ্যমী দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মধ্যে কীভাবে সত্যের পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের পাশে থাকা যায় তা নিয়ে কাজ করে। অর্জনের ছয় বছর, সামনে নতুন দিগন্ত—ছয় বছরের এই যাত্রা ছিল চ্যালেঞ্জ ও সাফল্যের মিশেল।
দীর্ঘ সময় পথচলায় রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলো থেকে কাজ করা সহকর্মীদের লিখনীতে উঠে আসা গল্পগুলো সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হলো—
রাজশাহী নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের কলাবাগানের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন এলাকার ৫৫ বছর বয়সী মাইনুরজ্জামান সেন্টু। তাকে নিয়ে ২০২৩ সালের ১৫ মে ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত হয়—‘অক্সিজেনের পাইপ নাকে নিয়ে রিকশা চালান তিনি’ শিরোনামে। এরপর দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমেও আসে সেন্টুর সংবাদ। ফলে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসেন সেন্টু। দেশ ও বিদেশ থেকে তার চিকিৎসার সহায়তা প্রদানের জন্য অনেকে হাত বাড়িয়ে দেন। রাজশাহী জেলা প্রশাসনের তৎকালীন প্রশাসকের পক্ষ থেকে সব ধরনের চিকিৎসা বিনামূল্যে নিশ্চিত করা হয়। চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বাড়ির ব্যবস্থা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৪ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এ ছাড়া, আলোচিত সংবাদগুলোর মধ্যে রয়েছে পাসপোর্ট ও বিআরটিএ অফিস নিয়ে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিআরটিএ এবং একই বছরের মার্চে পাসপোর্ট অফিস নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। অনুসন্ধানী এসব প্রতিবেদনে উঠে আসে অনিয়মের চিত্র। প্রতিবেদনে বিআরটিএ ও পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দালাল সিন্ডিকেটের যোগসাজশের চিত্র উঠে আসে।
নাটোর
ঢাকা পোস্টে সংবাদ প্রকাশের পর বদলে গেছে নাটোর বাগাতিপাড়া উপজেলার সাইলকোনা গ্রামের তরুণ মোস্তফার জীবন। গত ২০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ঢাকা পোস্টে ‘মোস্তফার তিনটি কিডনি, ভুল চিকিৎসায় জীবন তছনছ’ শিরোনামে একটি মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংবাদটি প্রকাশের পর তা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের নজর কাড়ে।
ঢাকা পোস্টের ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকার একটি স্বনামধন্য ট্রাভেল এজেন্সি মোস্তফার এই মানবেতর পরিস্থিতির কথা জানতে পারে এবং তার যাবতীয় চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেয়। বর্তমানে সেই ট্রাভেল এজেন্সির সম্পূর্ণ অর্থায়ন ও সহযোগিতায় উন্নত চিকিৎসার জন্য মোস্তফা ভারতের বিখ্যাত অ্যাপোলো হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ঢাকা পোস্টের ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল মোস্তফার করুণ চিত্র। সাধারণ মানুষের দুটি কিডনি থাকলেও মোস্তফার শরীরে ছিল ‘তিনটি কিডনি’। ভুল চিকিৎসার শিকার হয়ে তিনি দীর্ঘকাল ধরে নরকযন্ত্রণা ভোগ করছিলেন। কয়েক দফা অস্ত্রোপচার করেও কোনো উন্নতি না হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
তবে মোস্তফার দরিদ্র পরিবারের জন্য বিদেশে চিকিৎসার বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। মোস্তফার এই জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনের মাধ্যমে সবার সহযোগিতা কামনা করেছিল তার পরিবার। সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি সর্বমহলে আলোচিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত একটি ট্রাভেল এজেন্সির মহানুভবতায় মোস্তফার বিদেশে চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়।
জয়পুরহাট
জয়পুরহাটের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস আর বিআরটিএ—সাধারণ মানুষের কাছে এই দুটি দপ্তর যেন ছিল এক গোলকধাঁধা। দালালের ইশারা ছাড়া যেখানে ফাইল নড়ত না, আর ন্যায্য সেবার বদলে গুনতে হতো অতিরিক্ত টাকা। বছরের পর বছর চলে আসা এই দুর্নীতির জাল নিয়ে ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত হয়েছিল সংবাদ। গত ২০২৪ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ‘দালালদের দখলে জয়পুরহাট বিআরটিএ’ এবং ১০ মার্চ ‘দালালে ভরা জয়পুরহাট পাসপোর্ট অফিস, জড়িত কর্মচারী-আনসাররাও’ শিরোনামে ঢাকা পোস্টে দুটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসে পর্দার আড়ালের সেই অনিয়মের চিত্র। প্রতিবেদনে বিআরটিএ ও পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি, অতিরিক্ত টাকা আদায় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে দালাল সিন্ডিকেটের যোগসাজশের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল।
জনভোগান্তির সেই খবর প্রশাসনের নজরে আসতেই শুরু হয় নড়াচড়া। অবশেষে একই বছরের ১৩ মার্চ দুপুরে র্যাবের অভিযানে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি ও অবৈধ অর্থ লেনদেনের অভিযোগে পাঁচজন দালালকে হাতেনাতে আটক করে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
সিরাজগঞ্জ
অনলাইন নিউজ পোর্টাল ঢাকা পোস্টে সংবাদ প্রকাশের পর সিরাজগঞ্জের অসুস্থ গণেশ রাজবংশীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে আর্থিক সহায়তায় ব্যক্তিগত অর্থায়নে গণেশের পরিবারকে একটি সেলাই মেশিনও তুলে দেন তিনি।
গণেশের ছেলে হৃদয় কুমার রাজবংশী ঢাকা পোস্টকে বলেন, আপনাদের মিডিয়াতে (ঢাকা পোস্ট) সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর বিএনপি নেতা বাচ্চু আমাদের আর্থিকভাবে সহায়তা করেছিলেন। এবার একটি সেলাই মেশিন দিয়ে অন্তত আমার পরিবার আয় করতে পারবে।
সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের রানিগ্রামের বাসিন্দা শ্রী গণেশ রাজবংশী দীর্ঘদিন ধরে দুটি কিডনি অকেজো, হৃদরোগ ও থ্যালাসেমিয়াসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তার ছেলে হৃদয় কুমার রাজবংশী বাবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে সমাজের সহায়তা কামনা করেছিলেন। ঢাকা পোস্টে সংবাদ প্রকাশের পর রাজনৈতিক নেতা, সমাজসেবক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরই ধারাবাহিকতায় অসুস্থ গণেশ রাজবংশীর পাশে দাঁড়ান বিএনপি নেতা সাইদুর রহমান বাচ্চু।
বগুড়া
গেল ১৭ নভেম্বর ‘মানুষ বলে প্রতিবন্ধী, আমি দেখি আমার মেয়ে একজন যোদ্ধা’ শিরোনামে নাইছের সংগ্রামের গল্প ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত হলে বিষয়টি সমাজের বিত্তবানদের নজরে আসে। পরবর্তীতে নাইছ উপহার হিসেবে একটি কম্পিউটার ও আর্থিক সহায়তা পায়।
এ ছাড়া, গেল ৬ অক্টোবর ‘দুর্ঘটনায় পঙ্গু পোকড়া, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে বিপর্যস্ত পরিবার’ শিরোনামে ঢাকা পোস্টে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার নজরে আসে। পরবর্তীতে তাকে একটি হুইলচেয়ার প্রদান করা হয় এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা তার হাতে আর্থিক সহায়তা তুলে দেন।
(তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে জয়পুরহাট, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও বগুড়া প্রতিনিধি)
এএমকে