সংবাদের শক্তিতে বদলে যাওয়া বাস্তবতা

ছয় বছরে পা রাখল ঢাকা পোস্ট। এই সময়টা আমার কাছে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বয়স নয়, এটা মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক হিসেবে আমার বেড়ে ওঠার গল্প। মানুষের দুঃখ-দুর্দশার সাক্ষী হওয়া এবং সংবাদের মাধ্যমে পরিবর্তনের সূচনা দেখার অভিজ্ঞতা।
ঢাকা পোস্ট নিজেকে শুধু একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেনি, ধীরে ধীরে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি বারবার দেখেছি, একটি সঠিক সংবাদ কীভাবে অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ জানায়, প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করে এবং অসহায় মানুষের জীবনে আশার আলো জ্বালায়।
গত কয়েক বছরে সিলেটের সামাজিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নানা ইস্যুতে ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর প্রভাব চোখে পড়ার মতো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্যখাত, ভূমি জটিলতা, আইনশৃঙ্খলা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সংবাদ মানুষের জন্য পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়েছে।
সিলেট অঞ্চলের ২০২২ সালের বন্যার সময় মানুষের সংগ্রাম, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দুর্দশা এবং সমাজের সহায়তার অভাব ঢাকা পোস্টে তুলে ধরা হয়েছিল। প্রতিবেদনগুলো শুধু তথ্য দেয়নি, মানুষের বাস্তব পরিস্থিতি পাঠকের সামনে স্পষ্ট করেছে।
ঢাকা পোস্টে আমার যোগদানের পর প্রথম মাসেই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য সালুটিকর নৌঘাট জেটি প্রকল্প নিয়ে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সালুটিকর নৌঘাটে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেটি নির্মাণ না করেই ৫০ লাখ টাকার বিল উত্তোলন করেছিল। প্রকল্পে ৮০ ফুট লম্বা স্টিলের জেটি নির্মাণের কথা থাকলেও মাত্র ৫০ ফুটের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়, অ্যাপ্রোচ সড়ক এবং নদীর তীর সংরক্ষণের ব্লক কার্পেটিং ও গার্ড ওয়াল নির্মাণ হয়নি। তবুও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ সম্পন্নের ভুয়া প্রতিবেদন জমা দিয়ে পুরো বিল উত্তোলন করে। বিষয়টি প্রকাশের পর বিআইডব্লিউটিএর কারিগরি টিম তদন্তে যায়। সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে দুর্নীতির এই ঘটনা দেশে আলোচিত হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কার্যক্রমের নজর কেড়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান উল্লেখিত অসমাপ্ত কাজগুলো করতে বাধ্য হয়।
সিলেটের স্বাস্থ্য খাতেও ঢাকা পোস্টের রিপোর্টিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, রোগীদের দুর্ভোগ বা চিকিৎসা সংকট নিয়ে প্রকাশিত সংবাদগুলোর পর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের ৫ মার্চ বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নারীদের ইসিজি রুমে ওয়ার্ডবয়ের ইনজেকশন পুশ ও সিসি ক্যামেরা-সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। বিষয়টি দেশব্যাপী আলোচিত হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাক্তার সামন্ত লাল পরের দিন হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সে সময় তিনি বলেন, আমি কোনো মিডিয়াতে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে নেতিবাচক খবর দেখতে চাই না। স্বাস্থ্যকেন্দ্র মানুষের সেবার জন্য। তাই সবাইকে নিশ্চিত করতে হবে, রোগীরা সঠিক সেবা পান এবং অসম্মানিত না হন। রোগীদের যথাযথ সেবা দিতে তিনি আদেশ প্রদান করেন। এরপরই বদলে যায় সেই হাসপাতালের সেবাদানের পুরো কার্যক্রম।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা পোস্ট সারা দেশের পাসপোর্ট অফিস নিয়ে সিরিজ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। একযোগে দেশের সবগুলো পাসপোর্ট অফিসে আমুল পরিবর্তন আসে। সিলেটেও পাসপোর্ট অফিস নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। প্রকাশিত রিপোর্টে উঠে আসে সিলেট বিভাগীয় পাসপোর্ট ও ভিসা অফিসে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা আশপাশের কম্পিউটার দোকান ও ট্রাভেল এজেন্সি টাকার বিনিময়ে বিশেষ ‘মার্কা’ বসিয়ে আবেদনপত্র গ্রহণ করতেন। যারা অতিরিক্ত টাকা দিতে পারত না, তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হতো। এই ঘটনায় পরবর্তীতে দুদক অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্ত দুই আনসার সদস্য দুলাল ফরাজি ও মো. হাসান আলীকে (পলাশ) সরিয়ে দেওয়া হয়। সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে।
একইভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, শিক্ষক সংকট এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যা তুলে ধরার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এসেছে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে সিলেট মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট নৌ-প্রকৌশলী হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্যবহার, নিজের স্ত্রীর নামে বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার এবং পছন্দের লোককে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় ও লাইট হাউস প্রকল্পে অনিয়ম ধরা পড়ে। এ নিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা পোস্টে মেরিন একাডেমিতে যা ইচ্ছা তাই করছেন নৌ-প্রকৌশলী হুমায়ুন, এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারিতে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিমের অভিযান পরিচালনা হয় সেখানে। পরবর্তীতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন হয়। তদন্তকাজে পরবর্তীতে সেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরেজমিনে সিলেট মেরিন একাডেমি পরিদর্শন করে নানা তথ্যউপাত্ত সংগ্রহ করেন।
সবচেয়ে তৃপ্তির জায়গা মানবিক গল্পগুলো। অসহায় পরিবার, চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে না পারা রোগী কিংবা দুর্ঘটনায় সর্বস্ব হারানো মানুষের খবর প্রকাশের পর বহু ক্ষেত্রে সমাজের বিত্তবানরা পাশে দাঁড়িয়েছেন। সংবাদ শুধু তথ্য দেয় না মানুষকে মানুষের সঙ্গে যুক্তও করে।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময়ে ঢাকা পোস্ট সারাদেশের মতো সিলেটের জনসাধারণের ধৈর্য ও প্রতিবাদের সঠিক কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছে। শিক্ষার্থী থেকে সাধারণ মানুষ যারা সরকারি উদাসীনতা, প্রশাসনিক অব্যবস্থা এবং ন্যায্য অধিকারের জন্য রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের আওয়াজ ঢাকা পোস্টের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে পৌঁছেছে।
পর্যটনকেন্দ্র ও প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ঢাকা পোস্ট সবসময় সোচ্চার থেকেছে। সিলেটের আলোচিত সাদা পাথর পর্যটন স্পট লুটের খবর নিঃসংকোচে প্রকাশ করে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রশাসনিক নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঢাকা পোস্টের ভূমিকা স্পষ্ট। নির্বাচন, দলীয় কোন্দল এবং জনদুর্ভোগ নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরার ফলে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সচেতনতা বেড়েছে। অনেক সময় উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রশমিত করতেও সংবাদ কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
একজন মাঠপর্যায়ের সাংবাদিক হিসেবে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সাধারণ মানুষের আস্থা। গ্রাম থেকে শহর অনেকেই সরাসরি যোগাযোগ করে তাদের সমস্যার কথা জানান। তারা বিশ্বাস করেন, ঢাকা পোস্টে প্রকাশ হলে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
৫ বছর শেষে ঢাকা পোস্ট প্রমাণ করেছে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা শুধু খবর প্রকাশ নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। সিলেটসহ সারাদেশে সত্য, সাহসী এবং মানবিক সাংবাদিকতার মাধ্যমে ঢাকা পোস্ট যেন আগামীতেও মানুষের পাশে থাকে, এই প্রত্যাশা রইল।
এএমকে