রঙিন সুতোয় যেখানে বোনা হয় ঐতিহ্য, শিল্প ও জীবিকার গল্প

নারী মানেই শাড়ি। যার ভাঁজে লুকিয়ে থাকে রূপ, সৌন্দর্য আর আবেগের অমলিন স্মৃতি। গ্রামবাংলার উঠোনে মায়েদের শাড়ি শুকানোর দৃশ্য আজও অনেকের শৈশবকে ফিরিয়ে আনে। মনে দোলা দিয়ে যায় মায়ের আঁচল ধরে বায়না কিংবা চোখের জল মুছে নেওয়ার মায়াবী মুহূর্ত।
এই ভূখণ্ডে সূক্ষ্ম বস্ত্র তৈরির ইতিহাস বহু প্রাচীন। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, এক সময় এমন সূক্ষ্ম মসলিন বোনা হতো, যা ভোরের শিশিরে প্রায় অদৃশ্য হয়ে যেত। লোককথা ও পালাগানে সেই সূক্ষ্মতার ছাপ স্পষ্ট। সোনাইবিবির পালার অজ্ঞাতনামা কবির ভাষায়-
‘পানিতে থইলে গো শাড়ি
শাড়ি পানিতেই মিলায়
শুকেনায় থইলে শাড়ি ভাইরে
পিঁপড়ায় টাইন্যা লইয়া যায়রে।’
বাংলাদেশে শাড়ির ইতিহাস তাই কেবল পোশাকের নয়। এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতার অংশ। সেই ইতিহাসের উজ্জ্বল কাব্য জামদানি শাড়ি। যা অতীত ও বর্তমানের অনবদ্য সংযোগ।
এক সময় মুঘল আমলে জামদানি ছিল রাজপরিবার ও অভিজাতদের পোশাক। সেই ঐতিহ্য ধরে রেখে আজও দেশ-বিদেশে সমান জনপ্রিয় এই শাড়ি। ২০১৩ সালে ইউনেস্কো জামদানিকে বাংলাদেশের অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যা দেশের জন্য গর্বের।
রূপগঞ্জের নোয়াপাড়া গ্রামের অভিজ্ঞ কারিগর মো. বাবুল তাঁতি জানান, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে জামদানি বুননের প্রচলন শুরু হয়। পরে প্রায় দেড়শ বছর আগে রূপগঞ্জের নোয়াপাড়া গ্রামে এ শিল্পের বিস্তার ঘটে। যদিও সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা কঠিন।
বরগুনার চান্দখালী গ্রামে পৈতৃক শিকড় হলেও বাবুল তাঁতির জন্ম ও বেড়ে ওঠা নোয়াপাড়ায়। মাত্র ১০ বছর বয়সে গুরু আনোয়ার হোসেনের কাছে জামদানি শাড়িতে নকশার কাজ শিখেন। ১৯৯৬ সাল থেকে টানা ৩০ বছর ধরে তিনি নকশার কাজ করছেন।
তিনি সর্বোচ্চ ৮০ হাজার টাকার শাড়ি তৈরি করেছেন। বর্তমানে ভাগ্নী আঁখি আক্তার সীমাকে সঙ্গে নিয়ে ৬৭ হাজার টাকা মজুরিতে একটি শাড়িতে নকশা করছেন। যার বাজারমূল্য প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বলে দাবি তার।
তার ভাষায়, এই গ্রামের বোনা শাড়ি আমেরিকা, ইংল্যান্ড, দুবাই ও ভারতে বেশি রপ্তানি হয়।

ঐতিহ্য যাচাইয়ের নকশা
জামদানির মান ও কারুকাজ পরখে একসময় বিশেষ কিছু পাড় ও নকশা গুরুত্ব পেত। এর মধ্যে ছিল- করলা পাড়, ইঞ্চি পাড়, বেল পাতা পাড়, উই ঢোগা পাড়, গোলাপ পাড়, তেরা গোলাপ পাড়, বাগের পাড়, স্বর্ণলতা পাড়। শাড়ির পাড়ের নাম অনুসারেই এসব নামকরণ।
মসলিনের উত্তরাধিকার
কার্পাস তুলার সুতা দিয়ে হাতে বোনা জামদানি প্রাচীন মসলিনেরই উত্তরসূরি। সূক্ষ্ম বয়ন, নান্দনিক নকশা ও কারিগরি নিপুণতায় জামদানি আজও বাঙালি নারীর অন্যতম প্রিয় পরিধেয়। দামে তুলনামূলক বেশি হলেও রুচিশীলতা ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে জামদানির আবেদন অম্লান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মসলিন ও জামদানির মৌলিক বুননে তেমন পার্থক্য নেই। তবে জামদানির বিশেষত্ব হলো এর পাড় ও জমিনে অপেক্ষাকৃত মোটা ও রঙিন সুতায় বোনা জ্যামিতিক মোটিফ ও কারুকাজ।
নামের উৎস নিয়ে বিতর্ক
‘জামদানি’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত। একটি মত অনুসারে, শব্দটি ফার্সি ‘জামা’ (কাপড়) ও ‘দানি’ (বুটি) থেকে এসেছে অর্থাৎ ‘বুটিদার কাপড়’। আরেকটি মতে, ফার্সিতে ‘জাম’ উৎকৃষ্ট মদের নাম এবং ‘দানি’ অর্থ পেয়ালা—যা শিল্পমণ্ডিত সৌন্দর্যের প্রতীক। উৎকর্ষতার রূপক অর্থে একই নাম ব্যবহৃত হয়েছে বলেও ধারণা রয়েছে।
তাঁতির হাতে ইতিহাসের বয়ন
শীতলক্ষ্যা নদীর তীরঘেঁষা রূপগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ের কয়েকটি গ্রামে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বোনা হচ্ছে জামদানি। ইতিহাস, শিল্প ও আধুনিকতার মিশ্রণে এই শিল্পকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন নারায়ণগঞ্জের তাঁতিরা।
জামদানি পল্লির এক অভিজ্ঞ তাঁতি আলী হোসেন বলেন, জামদানির সৌন্দর্য নির্ভর করে সুতার মান, কাজের সূক্ষ্মতা আর সময়ের ওপর। একটি শাড়ি তৈরি করতে দুইজন কারিগর প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা শ্রম দিলে ডিজাইনভেদে সাত দিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
দামও তাই বৈচিত্র্যময়। সাধারণ মানের জামদানি ৩ হাজার টাকা থেকে শুরু হলেও উন্নতমান, সূক্ষ্ম কাজ ও সিল্ক ব্যবহারে একটি শাড়ির দাম ২ লাখ টাকা কিংবা তারও বেশি হতে পারে।
সুতার ধরন
সুতার ব্যবহারে জামদানি সাধারণত তিন ধরনের— ফুল কটন জামদানি – সম্পূর্ণ তুলার সুতা দিয়ে তৈরি; হাফ-সিল্ক জামদানি – আড়াআড়ি সুতা রেশমের, লম্বালম্বি সুতা তুলার; ফুল-সিল্ক জামদানি – দুই প্রান্তেই রেশমের সুতা নকশার নান্দনিকতা।
জামদানির প্রধান বৈশিষ্ট্য এর জ্যামিতিক নকশা। ফুল, লতাপাতা, কলকা, বুটি সবই ফুটে ওঠে সূক্ষ্ম বুননে। প্রচলিত ডিজাইনের মধ্যে রয়েছে পান্না হাজার, তেরছা, পানসি, ময়ূরপঙ্খী, বটপাতা, করলা, জাল, বুটিদার, জলপাড়, ডুরিয়া, কলকাপাড় প্রভৃতি। তেরছা জামদানি- তেরছাভাবে সারিবদ্ধ বুটি বা ফুলের নকশা, জালার নকশা- পুরো জমিনজুড়ে জাল বুননের মতো মোটিফ, ফুলওয়ার – সারিবদ্ধ ফুলকাটা ডিজাইন, ডুরিয়া- ডোরাকাটা নকশা, কলকাপাড়- পাড়জুড়ে কলকার কারুকাজ, জমিনের নকশা মূলত তিন শ্রেণিতে বিভক্ত- বুটা, জাল ও তেছরি। জনপ্রিয় মোটিফের মধ্যে আছে শাপলা ফুল, সিঙ্গারা, বেলপাতা, ফড়িং ফুল, শঙ্খমতি।
বিশ্ব স্বীকৃতি
জামদানি শাড়ি ২০১৬ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রথম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি পায়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক বিভাগ (ডিপিডিটি) জামদানিকে জিআই নিবন্ধন প্রদান করে এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)-কে সার্টিফিকেট হস্তান্তর করা হয়।
এই স্বীকৃতি আন্তর্জাতিক বাজারে জামদানির পরিচিতি সুরক্ষা, নকল পণ্যের বিভ্রান্তি রোধ এবং তাঁতিদের পণ্যের মর্যাদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিসিক জামদানি শিল্পনগরী
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামে ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) প্রায় ২০ একর জমির ওপর প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলে জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র। লক্ষ্য ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তাঁতিদের অবকাঠামোগত সুবিধাসহ একত্র করা এবং ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টেকসই করা।
বর্তমানে শিল্পনগরীতে মোট ৪১৬টি প্লট রয়েছে, ৪০৭টি জামদানির জন্য বরাদ্দ, ২টি পাম্প ও ৭টি পল্লী বিদ্যুতের জন্য সংরক্ষিত। প্লটের ধরনে ‘এ’ টাইপ ৩৫৪টি ও ‘এস’ টাইপ ৬২টি।
এই কেন্দ্রকে ঘিরে জামদানি এখন শুধু শাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়; টু-পিস, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শার্টের কাপড়, নেকটাই, পর্দা ও ওয়ালম্যাটেও ব্যবহৃত হচ্ছে। পণ্য বিপণনে বিসিক নিয়মিত জামদানি মেলা আয়োজন এবং সুরাজকুন্ডের মতো আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের সহায়তা দিয়ে আসছে।
বিসিক জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, জামদানি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। এই শিল্পনগরীর মাধ্যমে আমরা তাঁতিদের জন্য অবকাঠামোগত সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও নকশা উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে আসছি। আধুনিক বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে পণ্যের বৈচিত্র্য, মানোন্নয়ন ও বিপণন সম্প্রসারণে কাজ চলছে। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নারায়ণগঞ্জের জামদানিকে আরও শক্ত অবস্থানে নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।
শিল্পায়ন ও যান্ত্রিক উৎপাদনের ভিড়ে হাতে বোনা জামদানি আজও টিকে আছে তাঁতিদের নিষ্ঠা, ধৈর্য ও ভালোবাসায়। প্রতিটি শাড়ির ভাঁজে মিশে থাকে হাজার বছরের ঐতিহ্য, শ্রম আর সৃজনশীলতার গল্প। বাংলার রঙিন ঐতিহ্যের এই শাড়ি তাই কেবল নারী শরীর জড়িয়েই থাকে না- একটি ইতিহাস, একটি সংস্কৃতি ও পরিচয়।
আরকে