নিরপরাধ হয়েও ৭ বছর কারাভোগ, দোষীদের শাস্তি চান সন্তোষ

২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রতিদিনের মতো কাজে যোগ দেন পিলখানার ২৪ ব্যাটালিয়নের বিডিআরের হাবিলদার সন্তোষ কুমার মোহন্ত। সকালে গিয়ে সেখানে গানের মঞ্চ তৈরির দেখভাল করছিলেন তিনি। হঠাৎ করে কানে আসে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ। নিমিষেই অগোছালো হয়ে যায় সবকিছু। পরে সন্ধ্যায় সহকর্মীদের সহায়তায় দেওয়াল টপকে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন তিনি।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদককে তিনি এসব কথা বলেন। সন্তোষ কুমার মোহন্ত নীলফামারীর কিশোরগঞ্জের সদর ইউনিয়নের কামারপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সন্তোষ কুমার মোহন্ত ১৯৮৪ সালের পহেলা এপ্রিলে বিডিয়ারে সৈনিক পদে যোগদান করেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে ২০০৫ সালে হাবিলদার হিসেবে তাকে পিলখানায় বদলি করা হয়।
সন্তোষ কুমার মোহন্ত বলেন, ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সবকিছু স্বাভাবিক ছিলো। সকালে আমিসহ সব অফিসাররা উঠে যে যার কাজে যোগদান করি। তবে আমরা কখনো ভাবিনি এ রকম কোনো ঘটনা ঘটবে। সেদিন রাতে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। আমি কয়েকজন সৈনিককে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চ তৈরির দেখভাল করছিলাম। কাজ চলাকালীন সকাল ৯টার দিকে চারদিক থেকে মুহুর্মুহু গুলির শব্দ শুনতে পাই। বাহিরে বেরিয়ে দেখি ফায়ারিংয়ের আওয়াজ শোনার পর সবাই এদিক সেদিকে ছুটাছুটি করছেন। তখন আমরা এসব কিছু দেখে নিজের জীবন বাঁচাতে লুকিয়ে পড়ি মঞ্চের নিচে। তবে আমরা তখন কিছুক্ষণ নিরাপদে থাকলেও চিন্তা হচ্ছিল পরিবার নিয়ে। দীর্ঘ সময় গোলাগুলি চলার পরে বিকেলের দিকে কোনোভাবে পিলখানার ভেতরের বাসাতে ফিরে যাই। পরে সন্ধ্যার দিকে সহকর্মীদের সহায়তায় স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দেওয়াল টপকে সেখান থেকে বের হই। পরে ২৭ তারিখের দিকে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যাই।
তিনি আরও বলেন, আমরা চলে আসার পরে পেপার-পত্রিকায় খবর দেখলাম অনেককে হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে ঘোষণা আসে সবাইকে পিলখানার ৩ নম্বর গেটে যোগদান করার। পরে আমরা সেখানে গেলে আমাদের আবাহনী মাঠে নিয়ে যায় এবং আমাদেরকে পিলখানায় প্রবেশ করান। পরে আমাদেরকে ভেতরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সিআইডিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ করে। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়।
সন্তোষ কুমার মোহন্ত বলেন, আমাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার পরে আমি পরিবারের কোনো খোঁজ নিতে পারিনি। খুব অসহায়ভাবে জীবনযাপন করেছে পরিবারের সবাই। সেখানে থাকা অবস্থায় ২০১১ সালের ২৭ জুলাই মাসে আমিসহ কয়েকজনকে বিডিআর সদস্যকে কোর্টে নিয়ে আসে। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পরে দীর্ঘক্ষণ শুনানি শেষে আমাকে ৭ বছরের জেল দেয়। তবে আমি কোনো ধরনের অপরাধ করিনি। কোনো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। সেদিনের ঘটনার বিষয়ে কিছু জানতাম না। নিরপরাধ হয়ে আমি দীর্ঘ ৭ বছর কারাগারে কাটিয়েছি। আমার পরিবারের লোকজন খেয়ে না খেয়ে দিন পার করেছে। আমি জেলে থাকা অবস্থায় আমার স্ত্রী মানুষের দোকানে কাজ করে সন্তানকে লালন পালন করেছে। আমি কোনো অপরাধ না করেও এভাবে কারাগারে ছিলাম সেটা খুবই দুঃখের। পরে আমি ২০১৮ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পরে সামাজিকভাবে বিভিন্ন জায়গায় হেয় হয়েছিলাম। আমার সন্তানরা ভালো জায়গায় লেখাপড়া করতে পারেনি। বর্তমানে আমি পরিবার নিয়ে করুণ অবস্থায় আছি। সরকার বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে যারা দোষী তাদের বিচার করবেন। সেইসঙ্গে আমার মতো যারা অপরাধ না করে চাকরি হারিয়ে জেলে ছিলেন তাদের সাহায্য করার দাবি জানাই।
সন্তোষ কুমারের স্ত্রী কনিকা রানী মোহন্ত বলেন, পিলখানার ঘটনার দিনে আমরা সেখানে ভেতরের বাসায় ছিলাম। সকালে আমার ছেলেকে স্কুলে পাঠানোর জন্য রেডি করছিলাম। হঠাৎ করে গুলির শব্দ শুনতে পাই। পরে তাকে আর স্কুলে যেতে দেইনি। এদিকে আমার স্বামী সকেলে ডিউটিতে গেছে তাকে নিয়ে চিন্তায় ছিলাম। রুমের ভেতরে টয়লেটে ছেলেকে নিয়ে দীর্ঘসময় ছিলাম। পরে বিকেলের দিকে আমার স্বামী আসে। আমরা বাসা থেকে বের হয়ে দেওয়াল টপকে পিলখানা থেকে বেরিয়ে আসি। সেখানে আমাদের রুমের জিনিসপত্র সবকিছু রেখে আসি। পরে আমার স্বামী চাকরিতে যোগদান করতে গেলে তাকে জেলে পাঠানো হয়। সে দীর্ঘ ৭ বছর কোনো অপরাধ না করে জেলে ছিল। সে জেলে থাকার সময়ে আমরা খুব কষ্টের মধ্যে ছিলাম। আমি অন্যের দোকানে কাজ করে সংসার চালিয়েছি। বর্তমান খুব কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করছি৷ আমরা সরকারের সহায়তা চাই।
শাহজাহান ইসলাম লেলিন/আরএআর