নাব্যতা সঙ্কটে পটুয়াখালীর লঞ্চঘাট, লঞ্চ চলাচলে চরম ভোগান্তি

দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের অন্যতম কেন্দ্র পটুয়াখালী লঞ্চঘাট বর্তমানে তীব্র নাব্যতা সংকটে পড়েছে। লোহালিয়া নদী-তে পলি জমে বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠায় ব্যাহত হচ্ছে লঞ্চ চলাচল। এতে করে লঞ্চচালক, শ্রমিক, যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর বিভিন্ন অংশে বালুচর সৃষ্টি হওয়ায় লঞ্চঘাটে আটকে যাচ্ছে লঞ্চ। অনেক সময় জোয়ারের পানির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে যাত্রী ও লঞ্চ সংশ্লিষ্টদের দুর্ভোগ যেমন বাড়ছে, তেমনি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন নৌযান শ্রমিক, মালিক ও ব্যবসায়ীরাও।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টার দিকে লঞ্চঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ঘাটের পল্টনের সামনের দিকে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জুড়ে জেগে উঠেছে বালুকাময় চর। ভাটার সময় সেটি পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। এ কারণে পল্টনের একেবারে শেষ প্রান্তে, পূর্ব কোণের তুলনামূলক গভীর পানির অংশে নোঙ্গর করে রাখা হয়েছে যাত্রীবাহী লঞ্চ প্রিন্স কামাল-১।
এদিকে লঞ্চ চলাচলের প্রধান চ্যানেলের পরবর্তী অংশেও একই চিত্র দেখা গেছে। কোথাও কোথাও নদীর পাড় থেকে ৬০-৭০ ফুট দূরত্ব পর্যন্ত পানি নেই—শুধু বালুকাময় চর। কয়েকটি ছোট নৌযানকে চরের ওপর আটকে থাকতে দেখা যায়। পাশেই একটি ছোট ড্রেজার মেশিনের মাধ্যমে কেবল লঞ্চ চলাচলের নির্দিষ্ট অংশে ড্রেজিং করা হলেও পুরো নদীতে টেকসই নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে তা যথেষ্ট নয় বলে দাবি স্থানীয়দের।
প্রিন্স কামাল-১ লঞ্চের চালক মো. নাসির উদ্দিন খাঁন বলেন, ‘আমি প্রায় ৩০-৩৫ বছর ধরে লঞ্চ চালাই। তারমধ্যে এই রুটেই ১৫ বছর। নদীর বর্তমান যে অবস্থা, এতে লঞ্চ চালানো খুব কষ্টের। জোয়ার-ভাটা দেখে ঢোকা লাগে এবং বাইর হওয়া লাগে। যদি ভাটায় ছাইড়া যাই, তাইলে বিভিন্ন চরে আইটকা যাই। সেখানে ৪-৫ ঘণ্টা আইটকা থাকি। এরপর ছুইটা যাইতে হয়। যাত্রীদের অনেক হয়রানি হয়, আমাদেরও হয়রানি হতে হয়। বিভিন্ন মানুষের কটু কথা শোনা লাগে। যদি মাটি খনন না করে, তাহলে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে পটুয়াখালী রুটের।
তিনি আরও বলেন, 'আগে তো লঞ্চ দাঁড় করাইতাম ওইপাশের টার্মিনালে কিন্তু এখন যাইতে পারতেছি না চরের কারণে। তারপর এই লাস্ট মাথায় দাঁড়া করাইছি, তাও তো বেজে পড়ে মাঝেমধ্যে। কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের দাবি, দ্রুত মাটি খনন করা হোক; যাতে ভালোভাবে আমাদের লঞ্চগুলো চলতে পারে।
লঞ্চঘাটে উপস্থিত পটুয়াখালী জেলা যুবদলের সাবেক সহ-সভাপতি সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান রুমি বলেন, সৌন্দর্যমণ্ডিত পটুয়াখালী শহরের চারিদিকে নদী এই নদীর সৌন্দর্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সকলের। কিন্তু আমরা এই নদীর নাব্যতা হারাচ্ছি নদী দখলের কারণে। এই যে নদী বন্দর কর্তৃপক্ষ, তারা কিভাবে ড্রেজিং করাচ্ছে, আমরা বুঝতেছি না। মাটি কেটে নিচ্ছে-উঠাচ্ছে, আবার সেই মাঠেই নদীতে পড়ছে। এটাকে তো নদী খনন বলে না। আমরা এই আসনের এমপি আলহাজ্ব আলতাফ হোসেন চৌধুরীর মাধ্যমে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়সহ প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, আপনারা যে খাল খনন ও নদী খনন এর প্রকল্প হাতে নিয়েছেন, সেটিতে পটুয়াখালীর দিকে নজর দিন। এখানকার নদীর অবস্থা খুবই খারাপ, লঞ্চ ঢুকতে পারছে না। পটুয়াখালী সৌন্দর্য ও অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে।
দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকেই এ রুটে যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নাব্যতা সংকটের কারণে বর্তমানে যে পরিমাণ যাত্রী ও পণ্য পরিবহন হচ্ছে, তারও একটি বড় অংশ হ্রাস পেয়েছে।
লঞ্চঘাটের শ্রমিক জসিম হাওলাদার বলেন, ‘আমি ছোডবেলা থেইকাই এখানে কাম করি। নদীকে কেন্দ্র কইরাই আমাগো জীবিকা। অন্তত ৪০ বছর ধইরা এই ঘাটে কাম করতাছি কিন্তু নদীর এই অবস্থার কারণে বর্তমানে ঘাটটা পঙ্গু হইয়া যাইতাছে। এই ঘাটে আগে ৮০-৯০ জন শ্রমিক কাম করতাম। এহন লঞ্চ ভালোভাবে আইতে পারে না। তাই যাত্রীও আয় না আর মালামালও তেমন আয় না। ব্যবসায়ীরা মালামাল আনে গাড়ির পথে। আমাদের খুব সমস্যা হইতাছে। এহানে ওই একটা ড্রেজার মেশিন আছে, তা বচ্ছর ঠিহা ওহানে আউররা কইরা রাইখা খায় ঘুমায়। দেখি তেল আয় ভরে কিন্তু একদিন চললে ২০ দিন হেরা ঘুমায়। এইডার দিকে সবাইর নজর দেওয়া উচিত।’
লঞ্চঘাটের পল্টনে ৪০ বছর ধরে ব্যবসা করা মো. হারুণ-অর-রশিদ বলেন, ‘আগে এই নদীটা অনেক বড় ছিল। কিন্তু চড় পড়ার কারণে এখন ছোট হইয়া গেছে। তেমন যাত্রী আমাগো তেমন বেচা-কিনা কইম্মা গেছে।’
পটুয়াখালী জেলা ছাত্রদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘পটুয়াখালী লঞ্চঘাটটি নাব্যতা হারাচ্ছে তা নয়, অলরেডি নাব্যতা হারিয়ে ফেলছে। এই যে এখানে যেমনটি দেখতে পাচ্ছেন, সেটা শুধু চড় না চাইলে মানুষ এখানে বাসা-বাড়ি করতে পারবে। যদি সন্ধ্যায় আসেন, দেখতে পাবেন ৬টায় লঞ্চ ছাড়লে প্রায় ১ ঘণ্টা লাগে শুধু ঘাটের এই মোড়টা অতিক্রম করতে। কারণ, লঞ্চ ঘোড়ার সময় চড়ে বেজে যায়। এমন চলতে থাকলে হয়তো এমন হবে-আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে গল্পের মত মনে হবে যে এখানে একটি লঞ্চঘাট ছিল এবং ৪-৫ টা দোতলা লঞ্চও ঈদের সময় ঘাট দিত। কর্তৃপক্ষের নিকট আমাদের আবেদন, যাতে লঞ্চ ঘাটটিকে নাব্যতার দিক থেকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর বরিশাল বিভাগীয় নির্বাহী প্রকৌশলী (ড্রেজিং অফিসার) মো. মামুন-উর-রশীদ বলেন, ‘যে পরিমাণ পলি পটুয়াখালী নদী বন্দরে প্রবেশ করে, আসলে তা নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে অর্থাৎ স্রোত কম হওয়ার কারণে চলে যেতে পারে না বরং থেকে যায়। যত স্রোতস্বিনী নদী থাকে, তত দ্রুত পলিটা বের হয়ে চলে যায়। এখানকার মূল সমস্যাটি আমরা ধরতে পেরেছি। এই অর্থবছর আপাতত ড্রেজিং করছি, বাকি অর্থ বছরে বোঝা যাবে, আমরা কতটা সফল নাকি ব্যর্থ। আমরা বর্তমানে নৌযান চলাচলের চ্যানেলটি ঠিক রাখার চেষ্টা করছি। ড্রেজিং এর মাধ্যমে ২৫০ ফুট প্রস্থ ধরে নাব্যতা সৃষ্টি করছি। নৌযান যাতে স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে, সেভাবে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
সোহাইব মাকসুদ নুরনবী/এসএইচএ