বিলুপ্তির পথে কাঠের হাতলের ছাতা

গ্রামজুড়ে চলতো কাঠ কেটে নঁকশা তৈরির কাজ। সেই কাঠ দিয়ে তৈরি হতো ছাতার বাঁট বা হাতল। এখন আর সেই জৌলুস নেই। নেই তেমন কারখানাও। যা আছে সেটি বাপ-দাদার ঐতিহ্যের পেশা টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের জন্য।
কাঠের বাট দিয়ে তৈরি ছাতার ব্যবহার এখন কমেছে। আধুনিক প্লাস্টিক আর মেটাল ছাতার দাপটে বিলুপ্তির পথে কাঠের বাঁট তৈরির কারখানা। আক্ষেপ করে ঢাকা পোস্টকে জানিয়েছেন খুলনার রূপসা উপজেলার নেহালপুর গ্রামের মিস্ত্রিপাড়ার কাঠের বাঁট তৈরি শিল্পে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এই বাট তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন রূপসার অশোক দাস। গেল ২৫ বছর তিনি এই পেশার সঙ্গে জড়িত। অশোক ঢাকা পোস্টকে বলেন, বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে এখনো জড়িত আছি। আমার বাপ-দাদা এই কর্ম করেছেন, আমিও করছি। তবে আগের মতো কাজ নেই। কাজ করে প্রতিদিন ৪০০-৫০০ টাকা আয় হয়। এই দিয়ে কোনো রকম সংসার চালাতে হয়। এরকম ২৫০-৩০০ শ্রমিক ছাতার বাট তৈরির কাজ করে। তবে আগে এর সংখ্যা আরও বেশি ছিল। কারখানা আছে ৩-৪টি। আরও ছিল, কাঠের বাঁট আর এখন আগের মতো চলে না। তাই বন্ধ করে দিয়েছে। এই কাজ আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে।

বাঁট তৈরির কাজে নিয়োজিত মিস্ত্রি মো. ইব্রাহীম শেখ বলেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কাঠের বাঁটের চাহিদা কম থাকায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। যে কারণে শ্রমিকও কমেছে। বিকল্প পেশা হিসেবে ভ্যানচালক হয়েছেন।
রূপসার নেহালপুর গ্রামের মিস্ত্রিপাড়া এলাকার ব্যবসায়ী বাপ্পি কুমার দাস বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে মানুষ কাঠের বাঁট দিয়ে তৈরি ছাতার ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। অথচ কাঠের বাট দীর্ঘস্থায়ী। নানা কারণে বর্তমানে এই গ্রামের ছাতার বাঁট বানানোর কারখানা একে একে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন। সীমিত লাভ, প্রতি পিচ বাঁট তৈরিতে ১৬ টাকা ব্যয় হয় আর ২০ টাকায় বিক্রি করা হয়। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ ডজন বাঁট তৈরি করা হয়। এসব বাঁট তৈরির পর ঢাকা, চট্টগ্রাম, রংপুর ও সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।

তিনি বলেন, কারখানা চালাতে বিভিন্ন এনজিও এর কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা আমাদের পর্যন্ত পৌঁছায় না। এতে ৫-৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। সারা বছর চলে, তবে ২-৩ মাস একটু কম চলে। সরকারিভাবে স্বল্প সুদে যদি ঋণের ব্যবস্থা করা হয় তাহলে এই কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। কারখানার সঙ্গে অনেক শ্রমজীবী মানুষ জড়িত।
তিনি আরও বলেন, অতিবৃষ্টি ও বজ্রপাতে কাঠের বাট দিয়ে তৈরি ছাতা নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত। কাঠের বাঁট দুই-তিন বছর অনায়াসে ব্যবহার করা যায়। এই গ্রামে তিনজন ব্যবসায়ী বর্তমানে কাঠের বাঁট তৈরি করছি। আর বাকী সব বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
আরেক কারখানার মালিক পিন্টু দাস বলেন, বাপ-দাদার পর আমিও এই ব্যবসা করি। ছোট থেকেই এই কাজ করি, এখন শেষ বয়সেও এটি ছাড়া বিকল্প কিছু করার নেই। বিদেশি বিভিন্ন ছাতার কারণে আমাদের ব্যবসা মার খেয়ে গেছে। তবুও বাদ দেওয়া যাচ্ছে না, করতে তো হবে। আর বাঁট তৈরির কাঁচামালসহ সব জিনিসের দামও বেশি। যা উৎপাদন করি তা বিক্রি করে তেমন লাভ থাকে না। অনেক সময় উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কম রেটে বিক্রি করতে হয়। এ ছাড়া, চায়না ছাতা ছেয়ে গেছে। সে জন্য আস্তে আস্তে এই শিল্প বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
মোহাম্মদ মিলন/এএমকে