বাবার কাছ থেকে তুলে নিয়ে কিশোরীকে হত্যা, মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ৭

নরসিংদীর মাধবদীতে কিশোরীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ও পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় মূলহোতা নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাসহ মোট ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
শনিবার রাতে গাজীপুর থেকে নূরা এবং কিশোরগঞ্জ থেকে তার সহযোগী আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সালিশি বৈঠকের বিচারক ও মহিষাসুরা ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহাম্মদ আলী দেওয়ানকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে সদর উপজেলা বিএনপি। এর আগে শুক্রবার দিবাগত রাতে মাধবদীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এ নিয়ে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট ৭ জন গ্রেপ্তার হলেন।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন— মামলার প্রধান আসামি ও ধর্ষক নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরা (পেশায় রিকশাচালক), সহযোগী আলী, মহিষাসুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা আহাম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), তার ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান (৩২), হোসেন বাজার এলাকার গাফ্ফার (৩৪), নূরার চাচাতো ভাই এবাদুল্লাহ (৪০) এবং মো. আইয়ুব (৩০)।
কিশোরীকে ধর্ষণ ও পরে তা ধামাচাপা দিতে পরিকল্পিতভাবে হত্যার এই ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জেলাজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক এবং বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ও নরসিংদী সদর আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন।
ঘটনার বিবরণ
পুলিশ ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিহতের বাবা আশরাফ হোসেন শেরপুরের বাসিন্দা এবং মাধবদীর একটি টেক্সটাইল মিলে কর্মরত। তিনি সপরিবারে মাধবদীর বিলপাড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বখাটে নূরার নেতৃত্বে ৫-৬ জনের একটি দল মেয়েটিকে তুলে নিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। ঘটনার পর পরিবারটি বিচার চেয়ে স্থানীয় সাবেক মেম্বার আহাম্মদ আলী দেওয়ানের দ্বারস্থ হয়। সেখানে অভিযুক্তরা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ঘটনাটি রফাদফার চেষ্টা করে। পরিবার তাতে রাজি না হওয়ায় বিচারক আহাম্মদ আলী তাদের গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
গত বুধবার রাতে বাবা আশরাফ হোসেন তার মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে বড়ইতলা এলাকায় নূরার নেতৃত্বে সশস্ত্র দল তাদের গতি রোধ করে এবং বাবাকে ছুরির মুখে জিম্মি করে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন বৃহস্পতিবার দুপুরে স্থানীয় একটি সরিষাক্ষেত থেকে গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় মেয়েটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় নিহতের মা ফাহিমা বেগম বাদী হয়ে ৯ জনকে আসামি করে মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারকৃত বিএনপি নেতাসহ ৫ জনকে গত শুক্রবার আদালতে সোপর্দ করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে। আদালত আগামী রোববার শুনানির দিন ধার্য করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
নিহতের বাবা আশরাফ হোসেন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, নূরার নেতৃত্বে আমাকে জিম্মি করে আমার কলিজার টুকরাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। যারা আমার সন্তানকে হত্যা করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, অপরাধীদের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। অপরাধী যে দলেরই হোক, তাদের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে অভিযুক্ত আহাম্মদ আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামাল হোসেন জানান, মামলায় এ পর্যন্ত ৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে বাকিদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে ঢাকা রেঞ্জ ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ১০ ফেব্রুয়ারি মেয়েটিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন পরিবারটি পুলিশের কাছে আসেনি। তবে হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অভিযান চালিয়ে মূল আসামিসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা দ্রুততম সময়ে এই মামলার চার্জশিট দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
আমিনুর রহমান সাদী/এমএন