কার্বন কারখানার ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে গ্রাম, ক্ষতির মুখে কৃষি ও পরিবেশ

আকাশে ধোঁয়ার স্তর। দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোথাও আগুন লেগেছে। কিন্তু আগুন নয়, বরং পাটখড়ি পোড়ানো বিষাক্ত ধোঁয়া চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু আকাশেই নয়, ধোঁয়ার সঙ্গে বিষাক্ত ছাই ছড়িয়ে পড়ছে বসতঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলি জমিতে। গাছের ডাল-পাতায় জমছে কালো আবরণ। বিষাক্ত এই ধোঁয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি। অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন। খুলনার রূপসা উপজেলার তিলক গ্রামে গড়ে ওঠা মিমকো কার্বন কারখানা থেকে ছড়ানো ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানায় পাটখড়ি পোড়ানোর সময় প্রচুর ধোঁয়া হয়। দুর্গন্ধ আর ধোঁয়া বসতঘর, ফসলি জমি এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ে। ছাই ও ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, হাঁপানিসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া ফলমূল ও কৃষি ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এই কার্বন তৈরির কারখানা বন্ধের দাবিতে ভুক্তভোগী গ্রামবাসীদের ব্যানারে মানববন্ধন করা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন।
সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানা এলাকার বিভিন্নস্থানে পাটখড়ি পোড়ানোর জন্য স্তূপ করে রাখা হয়েছে। কারখানার অভ্যন্তরে ৪২টি চুল্লি রয়েছে এবং নতুন করে আরও ১৮টি চুল্লি তৈরি করা হচ্ছে। শ্রমিকরা পাটখড়ি আটি চুল্লিতে দিচ্ছে। সেই পাটখড়ি পুড়ে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হচ্ছে গোটা এলাকা।

এছাড়া ছাই থেকে উৎপাদিত কার্বন প্যাকেটজাত করার সময়ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ধোঁয়ার কারণে ওই এলাকার গাছের পাতায় কালির স্তর পড়েছে। কার্বন কারখানার আশপাশ এলাকা ছাড়াও উৎপাদিত কালো ধোঁয়া পার্শ্ববর্তী তিন-চারটি গ্রামে প্রবাহিত হয়। এর ফলে বাসিন্দারা নানা সমস্যায় ভোগেন।
উপজেলার নৈহাটী দক্ষিণপাড়া, তিলক ও দেবীপুর এলাকার বাসিন্দা মুজিবর, মুনসুর আলী, শামসুল হক, আল মামুন ও শাহারুখ শেখ বলেন, কার্বন ফ্যাক্টরি হওয়াতে বিভিন্ন রকমের সমস্যা হচ্ছে। গাছপালা, ফল, মাছের ক্ষতি হচ্ছে। ধোঁয়ার কারণে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। কলা, নারিকেল, সুপারি হচ্ছে না। ঘেরে মাছ হচ্ছে না, কালিতে তলিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায়ও সমস্যা হচ্ছে। স্কুল-মাদরাসায় ধোঁয়া গিয়ে শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়ছে। এমনকি মানুষের শারীরিক ক্ষতিও হচ্ছে। কাশি, হাঁপানি, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে।
তারা বলেন, গোটা এলাকা ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে যায়। প্রকৃতির তো ক্ষতি হচ্ছেই। সাথে ফসলের উৎপাদন কমছে। বাংলাদেশের পরিবেশ নষ্ট করে এটা চায়নাতে যায়। এটা কেমন ব্যাপার? ওরা এই কার্বন দিয়ে পণ্য তৈরি করে সেটি আমাদের দেশেই পাঠাচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদেরই আওয়াজ তোলা উচিত। এসব নিয়ে আমরা বহু আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি, তবুও কোনো কাজ হয় না। বর্তমানে নতুন সরকার এসেছে, এই সরকারের কাছে যেন কোনো ফয়সালা পাই, এটাই আমাদের দাবি। ফ্যাক্টরিটি অন্যস্থানে স্থানান্তর অথবা বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানান তারা।
মিমকো কারখানার শেয়ার হোল্ডার মাসুম বিল্লাহ শিকারি বলেন, কার্বন কারখানাটি ২০১৩ সালে চীন থেকে ৪ সদস্যের একটি টিম ২-৩ বছর আমাদের শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়। ৪২ বিঘা জমির উপর এই কারখানাটি অবস্থিত। বর্তমানে ৪২টি চুল্লি রয়েছে। আর ১৮টি চুল্লি আধুনিকভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে। দ্রুতই সেগুলো চালু করা হবে। এই ফ্যাক্টরির আদলে সারাদেশে অর্ধশতাধিক ফ্যাক্টরি হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে কারখানাটিতে ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক রয়েছে। তারাই পাটখড়ি পুড়িয়ে কার্বন তৈরির কাজ করছে। তাদের উৎপাদন অনুযায়ী মজুরি প্রদান করা হয়। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাটখড়ি কিনে আনা হয়। আগে পাটখড়ি মণ প্রতি ২০০ টাকা কিনতাম। যা বর্তমানে ৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
মাসুম বিল্লাহ শিকারি বলেন, প্রথমে পাটখড়ি চুল্লিতে দিয়ে পোড়ানো হয়। পোড়ানো পাটখড়ি গুড়া করে কালি তৈরি করা হয়। পরবর্তীতে সেটি বস্তায় প্যাকেট করা হয়। যা রপ্তানির জন্য চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে জাহাজে করে চায়নায় রপ্তানি করা হয়। প্রতি টন কার্বন ৮৫০ ডলারে বিক্রি করা হয়। এতে যেমন শ্রমিকরাও লাভবান হয়, তেমন আমরাও। উৎপাদন অনুযায়ী শ্রমিকরা মাসে ১৫-১৬ হাজার টাকা মজুরি পাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হচ্ছে।
চুল্লি থেকে ধোঁয়া সরাসরি ছড়িয়ে পড়ছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, চিমনি আছে। তবে সংযোগ যখনই চিমনিতে দিচ্ছি, তখন ফায়ারে সমস্যা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এটা ফাঁকা জায়গা বিধায় পরিবেশের তেমন কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। আশপাশের ধান, ফসল, গাছের কোনো ক্ষতি হচ্ছে না।
ধোঁয়ায় শারীরিক কোনো ক্ষতি হচ্ছে না দাবি করে তিনি বলেন, প্রায় ১৫ বছর কাজ করছে অনেক শ্রমিক। তাদেরতো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। তাদের সামান্যতম কোনো শারীরিক ক্ষতি বা নেগেটিভ দিক তো পায়নি। সবাই সুস্থ আছে।
রূপসা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তরুণ কুমার বালা বলেন, কার্বন ফ্যাক্টরির কারণে অতিরিক্ত ধোঁয়া এবং সেইসাথে ফ্লাইআঁশ থাকে। সে কারণে পলিনেশনে ঝামেলা হয়। যেটা উৎপাদনে হ্যাম্পার করছে। সেই সাথে কৃষকরা অভিযোগ দিয়েছে, তাদের শরীরের বিভিন্ন সমস্যা হচ্ছে। আমরা দেখেছি, প্রচুর পরিমাণে কালো ধোঁয়া সেই সঙ্গে ফ্লাই আঁশ থাকার কারণে বিভিন্ন উপকারী পোকামাকড়গুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা আমাদের সামগ্রিক উৎপাদনকে ব্যাহত করছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. হারুন অর রশীদ বলেন, মিমকো কার্বন ফ্যাক্টরি নামক প্রতিষ্ঠানটিকে ২০১৩-১৪ সালে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। তবে তাদের পরিবেশগত ব্যবস্থা যথাযথভাবে না থাকার কারণে তাদের ছাড়পত্র নবায়ন করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি এখন অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে দূষণ হচ্ছে মর্মে আমরা জানতে পেরেছি, তাই সরেজমিন পরিদর্শন করব। বিষয়টি সত্য হলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
খুলনা জেলা প্রশাসক আ স ম জামশেদ খোন্দকার বলেন, কার্বন ফ্যাক্টরিটি কালি তৈরি করে এবং রপ্তানিও করে। কালি ফ্যাক্টরির নির্যাস অর্থাৎ ধোঁয়ার জন্য উপযুক্ত পরিমাণে আধুনিক যন্ত্রপাতি বা ফিল্টার সেট না করা হয়, তাহলে বায়ু দূষণ করছে। যা গাছের পাতা, আমের মুকুল নষ্ট করছে, কৃষকদের ফসল নষ্ট হচ্ছে। কৃষি জমির মাঝখানে ইন্ড্রাস্ট্রি করলে যা হয়, তাই হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর অবশ্যই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেবেন। আমি নিজেও সার্বিক বিষয়টি খতিয়ে দেখব। তিনি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ওই এলাকার জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি ঠিক রেখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, লাইসেন্স করে নেওয়ার পরামর্শ দেন। অন্যথায় বিধান অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মোহাম্মদ মিলন/আরকে