বেতনের টাকায় সমাজসেবা, গাছ লাগিয়ে সবুজ স্বপ্ন বুনছেন নুরুল ইসলাম

একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেন না, তিনি গড়ে তোলেন মানুষ। আর সেই মানুষ গড়ার দায়িত্ব বুকে ধারণ করেই ফরিদপুরের এক শিক্ষক নীরবে লিখে চলেছেন মানবতার গল্প। তিনি মো. নুরুল ইসলাম (৪৬), ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের রসায়নের শিক্ষক। শিক্ষকতা তার পেশা হলেও সমাজসেবা যেন তার নেশা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—তিনি তার বেতনের একটি অংশ ব্যয় করেন গাছ লাগানো, দরিদ্রদের ইফতার বিতরণ, দুস্থ শিশুদের ঈদের পোশাক দেওয়া এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো নানা সামাজিক কাজে। কোনো প্রচার নয়, কোনো বাহুল্য নয় নিভৃতে, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করে চলেছেন মানবিক দায়িত্ব।
শেকড়ের গল্প
ফরিদপুর পৌরসভার কমলাপুর মহল্লার বাসিন্দা নুরুল ইসলাম। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান ফকির ছিলেন স্বাস্থ্য সহকারী, মা নুর বেগম গৃহিণী। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। স্ত্রী শামীমা নাসরিন গৃহিণী। দুই সন্তান—গোধূলী ইসলাম (নবম শ্রেণি, ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়) ও নুরুল আহসান সকাল (সপ্তম শ্রেণি, ফরিদপুর জিলা স্কুল)।
ছোটবেলা থেকেই মানবিকতার শিক্ষা পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে। মা বলতেন, “শুধু লেখাপড়া শিখলেই হবে না, মানুষ হতে হবে।” সেই শিক্ষা আজও তার পথচলার প্রেরণা।
সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুল থেকে বার্ষিক পরীক্ষার পর কমলা ও বিরিয়ানি দেওয়া হয়। ক্ষুধার্ত থাকা সত্ত্বেও পুরো খাবারটাই এক পথশিশুকে দিয়ে দেন তিনি। নিজে না খেয়ে বাড়ি ফেরেন। বিষয়টি শুনে মা আবেগে আপ্লুত হয়ে ছেলেকে স্নেহভরে ভাত মেখে খাইয়ে দেন এবং বলেন, “এভাবেই মানুষের পাশে দাঁড়াবে।”
শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন
২০০০ সালে রসায়নে স্নাতক এবং ২০০১ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন নুরুল ইসলাম। ২০০৬ সালে যোগ দেন ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। শিক্ষকতা বেছে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, শিক্ষক হলেই বড় মানুষ গড়ে তোলা যায়—এই বিশ্বাস থেকেই শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছি।

সমাজসেবায় অনন্য দৃষ্টান্ত
২০১৯ সাল থেকে তিনি পরিকল্পিতভাবে সামাজিক কাজ শুরু করেন। প্রতি মাসে অন্তত একটি ভালো কাজ করার অঙ্গীকার নেন। ইতোমধ্যে সরকারি রাস্তার ধারে ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন। কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, শিমুল, খেজুর, তাল, নারিকেল, শিউলি, পলাশসহ নানা প্রজাতির গাছে সবুজ হয়ে উঠেছে এলাকার পরিবেশ।
তার মানবিকতা শুধু গাছ লাগানোতেই সীমাবদ্ধ নয়। একদিন সকালে ৫০০ জন রিকশাচালককে ডেকে এনে ডিম, পাউরুটি ও কলা দিয়ে নাশতার আয়োজন করেছেন। কখনো তাদের জন্য বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও করেছেন। গরিব-দুঃখীদের নীরবে বাজার করে দেওয়া, ভিক্ষুকদের সহায়তা করা সবই করেন নিজের বেতনের টাকায়।
দেশ-বিদেশ থেকে কেউ কেউ অর্থ দিয়ে সহায়তা করতে চাইলেও তিনি গ্রহণ করেননি। দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, অন্যের টাকায় নয়, নিজের টাকায়ই সমাজসেবা করতে চাই। এতে আমি আত্মতৃপ্তি পাই।
মানুষের চোখে নুরুল ইসলাম
কমলাপুর মহল্লার বাসিন্দা মাহবুব পিয়াল বলেন, নুরুল ভাই শুধু একজন শিক্ষক নন, আমাদের সমাজের একজন অভিভাবক। তিনি নিভৃতে অনেক মানুষের পাশে দাঁড়ান। তার লাগানো গাছগুলো এখন আমাদের এলাকাকে সবুজ ছায়া দিচ্ছে।
শিক্ষার্থীরাও তাকে শুধু শিক্ষক নয়, পথপ্রদর্শক হিসেবে দেখেন। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী রাইমা আক্তার বলে, স্যার বলেন, ভালো মানুষ হতে পারলেই প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করা যায়। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অবন্তি আক্তার জানায়, পড়াশোনার পাশাপাশি স্যার আমাদের সমাজের ভালো কাজের গল্প শোনান। এতে আমাদের মধ্যেও অনুপ্রেরণা জাগে।
প্রধান শিক্ষক অমল কুমার সাহা বলেন, নুরুল ইসলাম আমাদের প্রতিষ্ঠানের গর্ব। তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু পড়ান না, মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেন। তার মানবিক কাজ অনুকরণীয়।
স্বপ্ন ও প্রত্যাশা
নুরুল ইসলাম বলেন, আমার কাজগুলো নিয়ে প্রচার হোক, সেটা চাই না। আমি চাই মানুষ আমাকে মনে রাখুক একজন ভালো শিক্ষক ও ভালো মানুষ হিসেবে। মৃত্যুর পর যদি মানুষ বলে—এই মানুষটা অন্যের জন্য বেঁচেছিলেন এটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
সচেতন নাগরিকদের মতে, আত্মকেন্দ্রিক এই সময়ে নুরুল ইসলাম এক ব্যতিক্রম উদাহরণ। তার মতো মানুষই সমাজকে আশাবাদী করে তোলে। সবুজের ছায়ায়, মানবিকতার আলোয়—নুরুল ইসলাম যেন এক নীরব প্রেরণার নাম।
জহির হোসেন/এসএইচএ