তাঁতের টানে ফিরছে ইতিহাস, রূপগঞ্জে বোনা হচ্ছে মসলিন

ভোরের কুয়াশা ভেজা নদীর পাড়, স্যাঁতসেঁতে বাতাস আর নিঃশব্দে দুলতে থাকা তাঁতের শব্দ—এই পরিবেশেই এক সময় জন্ম নিত পৃথিবীর সবচেয়ে সূক্ষ্ম কাপড় ‘মসলিন’। ইতিহাসে যার খ্যাতি ছিল এতটাই যে, বলা হতো একটি মসলিন শাড়ি আংটির ভেতর দিয়েও পার হয়ে যেতে পারে। বহু শতাব্দী ধরে বাংলার গর্ব হয়ে থাকা সেই মসলিন আজ প্রায় হারিয়ে গেছে। তবুও গ্রামবাংলার এক কোণে এখনও চলছে তার টিকে থাকার লড়াই।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়া বিসিক জামদানি পল্লীতে বসে সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন তাঁতি আল আমিন মিয়া। দাবি করা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী মসলিন শাড়ি তৈরি করছেন একমাত্র তিনিই।
ইতিহাসের পাতায় মসলিন
মসলিনের ইতিহাস প্রায় দুই হাজার বছরের পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক ও রোমান লেখাতেও বাংলার সূক্ষ্ম কাপড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। মোগল আমলে মসলিন শিল্প তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। সে সময় ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চল—বিশেষ করে সোনারগাঁও, রূপগঞ্জ, বিক্রমপুর ও নারায়ণগঞ্জ এলাকায় মসলিন উৎপাদন হতো।
মসলিন তৈরিতে ব্যবহৃত হতো বিশেষ ধরনের তুলা—‘ফুটি কার্পাস’। এই তুলা থেকে তৈরি সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে তাঁতিদের দক্ষ হাতে তৈরি হতো মসলিন কাপড়। এতটাই পাতলা ছিল এই কাপড় যে একে বলা হতো “বাতাসের কাপড়”।
মোগল সম্রাটদের দরবার থেকে শুরু করে ইউরোপের রাজপরিবার পর্যন্ত মসলিনের ব্যাপক চাহিদা ছিল। বাংলার মসলিন রপ্তানি হতো ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে।
বিলুপ্তির পথে
আঠারো শতকের শেষার্ধে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, শিল্প বিপ্লব ও মেশিনে তৈরি কাপড়ের প্রসারের কারণে ধীরে ধীরে মসলিন শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, নানা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণেই বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প প্রায় হারিয়ে যায়।
পরবর্তীতে মসলিন পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ২০১৮ সালে সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিলেও তা বাস্তবে তেমন অগ্রগতি পায়নি।
রূপগঞ্জে নতুন করে শুরু
তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন রূপগঞ্জের তাঁতি আল আমিন। তার বাড়ি নোয়াপাড়া বিসিক জামদানি পল্লীতে।
তিনি জানান, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ দৃক গ্যালারির প্রধান নির্বাহী সাইফুল ইসলামের অনুপ্রেরণায় ও সহায়তায় অনেক তাঁতিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে কোনো তাঁতি সফল হতে পারেননি। ওই সময় ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে সাইফুল ইসলাম আল আমিনের কাছে চিকন সুতা নিয়ে আসেন এবং মসলিন শাড়ি বোনার কথা বলেন।
এরপর ফুটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি হওয়া সুতা দিয়ে চেষ্টা শুরু করেন আল আমিন। কিন্তু সূক্ষ্ম সুতা ও আর্দ্রতার কারণে সুতা ছিঁড়ে যাওয়ায় শাড়ি বুনতে বারবার বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাকে। এত ঝামেলার কারণে অনেকেই তাকে মসলিন তৈরির কাজ বন্ধ করার পরামর্শ দেন। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি।
আল আমিন বলেন, “অনেকবার ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু মনে হয়েছে এই ঐতিহ্য যদি আমরা না বাঁচাই, তাহলে একদিন পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।”
অবশেষে কয়েকবার চেষ্টা চালিয়ে ৩০০ কাউন্টের সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে একটি মসলিন শাড়ি তৈরি করতে সফল হন তিনি।

নয় মাসে একটি শাড়ি
আল আমিন জানান, একটি মসলিন শাড়ি তৈরি করতে প্রায় ৯ মাস সময় লাগে। সূক্ষ্ম সুতার কারণে কাজের গতি খুব ধীর।
তার তৈরি প্রতিটি শাড়ির দৈর্ঘ্য ৬ গজ, প্রস্থ ৪৭ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় আড়াইশ গ্রাম। এখন পর্যন্ত তিনি ৩০০ থেকে ৪০০ কাউন্টের সুতা দিয়ে ১২টি মসলিন শাড়ি তৈরি করেছেন বলে দাবি করেন।
শাড়ির ডিজাইন ও সুতার কাউন্টের ওপর নির্ভর করে দাম কম-বেশি হয়ে থাকে। তবে আনুমানিক প্রত্যেকটি শাড়ি তৈরিতে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হয়। বাজারে প্রতিটি শাড়ি ৪ থেকে ৭ লাখ টাকায় বিক্রি হয়।
জাদুঘরের প্রদর্শনীতে স্থান
আল আমিনের তৈরি মসলিন শাড়ি ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহবাগের জাদুঘরে একটি প্রদর্শনীতে স্থান পায়। সেখানে তার তৈরি শাড়ি পুরস্কারও অর্জন করে।
ওই প্রদর্শনীতে আসা দর্শনার্থীদের মাধ্যমে তিনি বহু শাড়ির অর্ডার পান। তবে একটি শাড়ি তৈরি করতে দীর্ঘ সময় লাগায় সব অর্ডার নেওয়া সম্ভব হয় না।
দেশে-বিদেশে চাহিদা
আল আমিন জানান, তার তৈরি মসলিন শাড়ির চাহিদা শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিদেশেও রয়েছে। ফ্রান্স, ইংল্যান্ড (যুক্তরাজ্য), ভারত ও সিঙ্গাপুর থেকেও তিনি অনেক অর্ডার পেয়েছেন। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে তিনি ইতোমধ্যে মসলিন শাড়ি বিক্রি করেছেন এবং আরও বিক্রির আলোচনা চলছে। আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে প্রায় ১২ লাখ টাকা মূল্যের দুটি মসলিন শাড়ির ডেলিভারি দেওয়ার কথা রয়েছে। প্রতিটি শাড়ির দাম ৪ থেকে ৭ লাখ টাকার মধ্যে। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় ১৬ লাখ টাকার মসলিন শাড়ি বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।
নতুন কারিগর তৈরির চেষ্টা
মসলিন শাড়ি সম্প্রসারণের জন্য আল আমিন এখন একজন কারিগর ও একজন সহযোগীকে মসলিন তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তারা আল আমিনের কাছ থেকে এই শিল্পের কৌশল শিখছেন এবং কাজে সহযোগিতা করছেন। তবে এখনও খুব বেশি মানুষ এই কাজ শেখার আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
বাড়িতেই ছোট্ট মসলিন কেন্দ্র
আল আমিনের বাড়িতে ‘বেঙ্গল মসলিন কেন্দ্র’ নামে একটি ছোট কক্ষ রয়েছে। সেখানে মসলিন কাপড়ের ইতিহাসসহ মসলিন কাপড়ের তৈরি রুমাল ও কাপড়ের প্রদর্শনী করা হয়েছে।
স্থানীয় দর্শনার্থীরা সেখানে গিয়ে মসলিন সম্পর্কে জানার সুযোগ পান। স্থানীয় বাসিন্দা শাহিদা খাতুন বলেন, “আমরা বই-পুস্তকে মসলিন শাড়ির কথা জেনেছি। কিন্তু বাস্তবে প্রথমবার দেখেছি আল আমিন তাঁতির কাছে। তিনি আমাদের গর্ব। আমাদের দাবি থাকবে, সরকার যেন তাকে সহযোগিতা করে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটায়।”
প্রশাসনের আশ্বাস
নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবির বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মসলিন শিল্পীর সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশে এই ঐতিহ্যবাহী মসলিন শিল্প আবার বিকশিত হতে পারে।
তিনি বলেন, “আল আমিন এবং তার সঙ্গে আরও কয়েকজন এই মসলিন তৈরিতে কাজ করছেন। অবশ্যই আমরা তাকে সরকারি সহযোগিতা করবো। এই শিল্পটাকে প্রসার করার জন্য কাজ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, মসলিন সম্প্রসারণের জন্য সরকারি কোনো প্রকল্প থাকলে সেটি নিয়ে আবার কাজ করা হবে এবং তাদের টেকনিক্যাল সাপোর্ট ও জেলা প্রশাসনের আর্থিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই শিল্পের সম্প্রসারণে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মেহেদী হাসান সৈকত/এসএইচএ