ঢাকার কাছেই ইতিহাস আর প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর ঠিকানা

শহরের কোলাহল ছেড়ে যেখানে দেখা মেলে সবুজ বন, শতবর্ষী মসজিদ আর জমিদার বাড়ির রাজকীয় স্থাপত্য- প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের এমন মেলবন্ধনেই গড়ে উঠেছে টাঙ্গাইল। সবুজে ঘেরা বিস্তীর্ণ মাঠ, নদী আর বনাঞ্চল যেমন মুগ্ধ করে, তেমনি জমিদারবাড়ি ও প্রত্ননিদর্শন জাগিয়ে তোলে অতীতের স্মৃতি।
পরিবার নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটাতে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ছোট্ট অ্যাডভেঞ্চার- দুই ক্ষেত্রেই টাঙ্গাইল হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। ঢাকা থেকে দূরত্ব কম হওয়ায় দিনের ভ্রমণ হোক কিংবা এক রাতের পরিকল্পনা, কম খরচ ও সহজ যাতায়াতের কারণে এই জেলা এখন অনেকের প্রথম পছন্দ।
ঈদের ছুটিতে তাই কোলাহল পেছনে ফেলে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা সময় কাটাতে চাইলে টাঙ্গাইল হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণ ঠিকানা।
গ্রামের মনোরম পরিবেশ, গভীর বন, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যের জন্য খ্যাতি রয়েছে টাঙ্গাইল জেলার। এই ঈদের ছুটিতে টাঙ্গাইলের দৃষ্টিনন্দন জায়গাগুলোতে ঘুরতে আসতে পারেন–

মহেড়া জমিদার বাড়ি
মহেড়া জমিদার বাড়ি টাঙ্গাইলে অবস্থিত বিভিন্ন জমিদারবাড়ির মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়। ১৮৯০ সালেরও আগে নির্মিত এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি স্পেনের করডোভা নগরের আদলে গড়ে তোলা হয়।
কালীচরণ সাহা ও আনন্দ সাহা নামে দুই ভাই ১ হাজার ১৭৪ শতাংশ জমির ওপর বাড়িটি নির্মাণ করেন। এর প্রবেশ মুখেই চোখে পড়ে বিশাখা পুকুর। টলমলে জল আর শীতল বাতাস গায়ে মেখে ভেতরে এগোলেই দেখা মেলে চৌধুরী লজের। গোলাপী রঙের ভবনটির পিলারগুলো রোমান স্থাপত্য শৈলীতে নির্মাণ করা। তবে মহেড়া জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষনীয় ভবনটি হলো আনন্দ লজ। নীল-সাদার এক অপূর্ব মিশ্রণে নির্মিত ভবনটির সামনে ৮টি কলাম রয়েছে। তিন তলার ঝুলন্ত বারান্দাটি ভবনটিতে আরও রাজকীয় ভাব এনে দিয়েছে। আরও রয়েছে মহারাজা লজ ও কালীচরণ লজ। এই জমিদার বাড়ির সঙ্গেই রয়েছে ছোট পার্ক, চিড়িয়াখানা, বোট রাইড ও পিকনিক স্পট।
এছাড়া জমিদার বাড়ির অভ্যন্তরে রয়েছে সুবিশাল বাগান, বিভিন্ন আর্টিফিশিয়াল স্থাপনা। পাখ-পাখালি, সবুজ বাগান, পুকুর ও দৃষ্টিনন্দন ভবন মিলিয়ে পুরো এলাকাটি যেন স্বপ্নপুরীর আবহ তৈরি করে।
এই জমিদার বাড়িতে প্রবেশ মূল্য ৮০ টাকা। ভেতরে ৩০০ টাকার বিনিময়ে চাইলেই সুইমিং পুলে সাতার কাটা যায়।
টাঙ্গাইল শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার পূর্বে এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ৪ কিলোমিটার পূর্বে মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া গ্রামের অবস্থান। ঢাকা থেকে বাসে নাটিয়াপাড়া নেমে অটোরিকশায় সরাসরি পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে আসতে হবে। মহেড়া জমিদার বাড়িটি বর্তমানে পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

২০১ গম্বুজ মসজিদ
২০১ গম্বুজ মসজিদ হলো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি গম্বুজ এবং দ্বিতীয় উচ্চতম মিনার বিশিষ্ট মসজিদ। এই মসজিদের নকশা করা হয়েছে ২০১টি গম্বুজ ও ৯টি মিনার দিয়ে সজ্জিত একটি পূর্ণাঙ্গ মসজিদ কমপ্লেক্স হিসেবে। টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার নগদা শিমলা ইউনিয়নের দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে হচ্ছে এই মসজিদ। দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদের ছাদে ৮১ ফুট উচ্চতার একটি গম্বুজ রয়েছে। এই বড় গম্বুজের চারপাশে ছোট ছোট গম্বুজ আছে ২০০টি। এদের প্রত্যেকের উচ্চতা ১৭ ফুট। মূল মসজিদের চার কোনায় রয়েছে চারটি মিনার। এদের প্রত্যেকের উচ্চতা ১০১ ফুট। পাশাপশি আরও চারটি মিনার আছে ৮১ ফুট উচ্চতার। সবচেয়ে উঁচু মিনারটি মসজিদের পাশেই অবস্থিত। এর উচ্চতা ৪৫১ ফুট। ১৪৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৪৪ ফুট প্রস্থের দ্বিতল এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারবেন।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর সদর থেকে মসজিদটি প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরত্ব। মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে সরাসরি গোপালপুর বা ঝাওয়াইলের বাসে (যেমন : ঢাকা এক্সপ্রেস) সরাসরি যেতে পারবেন। টাঙ্গাইল সদর থেকে, নতুন বাস টার্মিনাল থেকে লোকাল বাসে বা অটোরিকশা ভাড়া করে গোপালপুর উপজেলা সদরে যেতে হবে। আবার সেখান থেকে অটোরিকশা ভাড়া করে দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামে অবস্থিত মসজিদে সহজেই যাওয়া যায়।

মধুপুর জাতীয় উদ্যান
মধুপুর জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের অন্যতম একটি জীববৈচিত্র্যপূর্ণ উন্মুক্ত উদ্যান। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় অবস্থিত এই বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা দেওয়া হয় ১৯৬২ সালে। নিসর্গ প্রেমীদের কাছে মধুপুরের জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্থান। মধুপুরে ২০ হাজার একরেরও বেশি এলাকা জুড়ে রয়েছে মধুপুর জাতীয় উদ্যান। শহরের কোলাহল থেকে দূরে প্রশান্তির খোঁজ পেতে মধুপুর জাতীয় উদ্যানকে সেরা জায়গা মনে হয় প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে। অল্পবিস্তর পরিচিত সংরক্ষিত এই বনে রয়েছে হরিণ প্রজনন কেন্দ্র। ফলে এখানে ঘুরতে গেলে প্রকৃতির কোলে বন্যপ্রাণীদের ছুটে বেড়ানোর দৃশ্য আপনাকে মুগ্ধ করবে। মধুপুর গেলে আনারসের স্বাদ নিতে পারেন। এখানকার আনারসের জাত যেমন দেশসেরা, তেমনি দামেও কম।
ঢাকা থেকে ১২৫ কিলোমিটার দূরে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় অবস্থিত। টাঙ্গাইল শহর থেকে মধুপুর জাতীয় উদ্যানে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দুরত্ব।মধুপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। বাস ও অটোরিকশায় যাওয়া যায়।

পীরগাছা রাবার বাগান
সুউচ্চ বৃক্ষের সারি, তাদের কাঁচা সবুজ রঙের পাতা। মনে হবে যেন স্কেল দিয়ে মেপে একই সমান্তরালে লাগানো গাছগুলো। যতদূর চোখ যায় শুধু গাছ আর গাছ। চারদিকে সবুজের সমারোহ। দেখলেই মন ভরে যায়। গাছগুলোর নাম রাবার গাছ। মধুপুরের পীরগাছা রাবার বাগানের এই সৌন্দর্য অকৃত্রিম। দুই ধারে হাজারো গাছ আর এরই মাঝখানে সুবিশাল পথ। পথ চলতে চলতে মনে হয়, এই পথ যদি শেষ না হতো।
বাগানটির অন্যতম সৌন্দর্য হলো এটি একেক ঋতুতে একেক রকম সাজে সজ্জিত হয়। শীতকালে গাছের সব পাতা ঝরে গিয়ে যেমন রিক্ত হয়, তেমনি বর্ষায় ফিরে পায় নতুন যৌবন। কিছুদূর এগিয়েই চোখে পড়ে বাগানের অফিস।
বাগানের ঠিক পূর্বদিকে গেলে পাওয়া যাবে রাবার কারখানা। যেখানে কাঁচা রাবার সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিট প্রস্তুতকরণের পুরো প্রক্রিয়া দেখার সুযোগ মিলবে। অনুমতি সাপেক্ষে এখানকার ফুলের বাগানঘেরা রেস্ট হাউজে থাকা যায়। রঙিন চালের ছাউনিতে গেস্টহাউসটি যেন প্রকৃতিরই একটা অংশ। বৃষ্টির দিনে মেলে বৃষ্টিবিলাসের সুযোগ।
ঢাকা মহাখালী থেকে সরাসরি মধুপুরের বাস রয়েছে। ভাড়া বাসভেদে ২০০-৩০০ টাকা। মধুপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে রাবার বাগান ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাসস্ট্যান্ড থেকে রাবার বাগানে অটোরিকশা, সিএনজি অথবা মোটরসাইকেলে করে যাওয়া যায়। ভাড়া অটোরিকশায় ২৫-৩৫ টাকা।

আতিয়া মসজিদ
বাংলাদেশে সুলতানি এবং মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত যেসব স্থাপত্য রয়েছে, তার মধ্যে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আতিয়া মসজিদ অন্যতম। এই মুসলিম স্থাপত্যটি প্রায় ৪১৬ বছর আগে নির্মিত হলেও মসজিদটির কারুকাজ এখনো সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মুঘল ও সুলতানি আমলের অসাধারণ স্থাপত্যশৈলীর এই মসজিদের নকশা এক সময় ১০ টাকার নোটে দেখা যেত। মসজিদটি দেখতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, এমনকি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকেও দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন। সব মিলিয়ে আতিয়া মসজিদ যুগসন্ধিলগ্নের স্থাপত্য ও নিদর্শনরূপে পরিচিত।
ছোট পরিসরের এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটির নির্মাণশৈলী বেশ আলাদা ধরনের। বাংলায় এ ধরনের মসজিদ নির্মাণশৈলী খুব একটা দেখা যায় না। টাঙ্গাইল শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দক্ষিণে আতিয়া গ্রামে অবস্থিত এই সুন্দর মসজিদটিতে সিএনজি ও অটোরিকশায় করে যাওয়া যায়।

ধনবাড়ী নওয়াব শাহী জামে মসজিদ
প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের অপূর্ব নিদর্শন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ী উপজেলার ‘নওয়াব শাহী জামে মসজিদ। স্থানীয়দের কাছে ‘নবাব প্যালেস’ বা ‘নবাব মঞ্জিল’ নামে বেশি পরিচিত। ৭০০ বছরের পুরোনো এই মসজিদটিতে ১৯২৭ সাল থেকে কোরআন তিলাওয়াত হচ্ছে, যা নামাজের সময় ছাড়া ১ সেকেন্ডের জন্যও বন্ধ হয়নি, চলছে অবিরামভাবে। পৃথিবীর ইতিহাসে যা বিরল।
১৬০০ শতাব্দীতে (সেলজুক তুর্কি) বংশের ইসপিঞ্জার খাঁ ও মনোয়ার খাঁ (১ খণ্ডবিশিষ্ট ) মসজিদ নির্মাণ করেন। পরে মসজিদটিকে সংস্কার ও আধুনিক রূপ দেন বাংলা ভাষার প্রথম প্রস্তাবক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সদস্য, যুক্ত বাংলার প্রথম মুসলিম মুখ্যমন্ত্রী, ধনবাড়ীর নবাব ‘ সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী’। প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো এই মসজিদটি মোগল স্থাপত্যের নিপুণ নিদর্শন। এটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট এবং মেঝেতে মোজাইক ও মার্বেল পাথরের কাজ রয়েছে।
কালের স্রোতে এখন আর জমিদারি প্রথা ও জমিদার নেই। কিন্তু চুন-সুরকির নবাব প্যালেস ঐশ্বর্যে ও ঐতিহ্যে ঠিকই আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
১০০ টাকায় টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করামাত্রই চোখে পড়বে নয়নাভিরাম সবুজ-শোভিত বাগান। বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও ফলসহ নানা প্রজাতির গাছ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা ভিড় করেন নবাব প্যালেসে।
ঢাকা মহাখালী থেকে বিনিময় বা দ্রুতগামী পরিবহনে সরাসরি ধনবাড়ী যাওয়া যায়। টাঙ্গাইল জেলা সদর থেকে ধনবাড়ী শাহী মসজিদের দূরত্ব প্রায় ৫৫ কিলোমিটার। টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে সরাসরি বাসসিএনজি বা নিজস্ব পরিবহনে মধুপুর হয়ে ধনবাড়ী উপজেলায় পৌঁছানো যায়।

টাঙ্গাইল ডিসি লেক
দর্শনার্থী আর বিনোদন প্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে থাকে টাঙ্গাইলের একমাত্র বিনোদন কেন্দ্র ডিসি লেক। প্রতিদিন হাজারো শিশু, মধ্যবয়সী নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধদের আনাগোনা এবং নতুনরূপে সাজানোয় মৃতপ্রায় লেকটি তার যৌবন ফিরে পেয়েছে।টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে ৩৩ দশমিক ৪৫ একর আয়তনের দৃষ্টিনন্দন ডিসি লেক অবস্থিত।
টাঙ্গাইল পুরাতন ও নতুন বাসস্ট্যান্ড থেকে নেমেই রিকশা করে ডিসি লেক পার্ক এ যাওয়া যায়। এছাড়া রেলপথে টাঙ্গাইল স্টেশেন এ নেমে টাঙ্গাইল নতুন বাসস্ট্যান্ড গিয়ে অটোরিকশায় করে যাওয়া যায়।
আরিফুল ইসলাম/আরকে