চারবার গিনেস রেকর্ডধারী আবদুল হালিমের পরিবারে অভাবের ছায়া

মাথার ওপর ফুটবল রেখে সাইকেল চালিয়ে একটানা ২০ দশমিক ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লিখিয়েছেন মাগুরার শালিখা উপজেলার আবদুল হালিম (৪৯)। গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি মাগুরা ইনডোর স্টেডিয়ামে এই রেকর্ড গড়েন তিনি। চলতি মাসের ৪ মার্চ গিনেস কর্তৃপক্ষ তার হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সনদ তুলে দেয়।
স্বীকৃতি অর্জন করলেও অর্থকষ্ট আর হতাশাই হালিমের নিত্যসঙ্গী। নিজের দেশে তেমন কোনো সম্মাননা বা সহায়তা পাননি বলে আক্ষেপ তার।
মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালী ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হালিম। মাথায় ফুটবল রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটা, সাইকেল চালানো কিংবা স্কেটিং করার মতো নানা কসরতে পারদর্শী তিনি। গত বছরের রেকর্ড গড়ার সময় তার মাথার ওপর ছিল একটি ফুটবল এবং দুই হাত ছিল সাইকেলের হ্যান্ডেলে। এভাবে তিনি একটানা ১ ঘণ্টা ৪৯ মিনিট সাইকেল চালিয়ে ২০ দশমিক ২০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেন। পুরো সময়জুড়ে একবারের জন্যও বলটি মাথা থেকে পড়ে যায়নি।
এই কৃতিত্বের মধ্য দিয়ে চতুর্থবারের মতো গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখান তিনি। কিন্তু এত বড় অর্জনের পরও আর্থিক সংকটের কারণে পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। অনার্সে পড়ুয়া দুই ছেলেসহ সংসারের খরচ বহন করা এখন তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
ফুটবল নিয়ে বিভিন্ন কসরত দেখিয়ে বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের সামনে প্রদর্শনী করেন তিনি। এ ছাড়া, জেলা ও উপজেলা শহরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে খেলা দেখিয়ে যে সম্মানী পান, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চালালেও তা পর্যাপ্ত নয়।
গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের তথ্যানুযায়ী, মাথায় ফুটবল রেখে সাইকেল চালিয়ে সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম’-এর রেকর্ড এখন আবদুল হালিমের দখলে। এর আগে ২০১৭ সালের ৮ জুন ঢাকায় ১ ঘণ্টা ১৯ মিনিটে মাথায় বল রেখে ১৩ দশমিক ৭৪ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে একই রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। এবার সেই রেকর্ড নিজেই ভেঙে গড়েছেন নতুন ইতিহাস।
আবদুল হালিম প্রথম গিনেস রেকর্ড করেন ২০১১ সালের ২২ অক্টোবর। সেদিন ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে মাথায় ফুটবল রেখে ১৫ দশমিক ২ কিলোমিটার পথ হেঁটে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। পরে ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ২ ও ৩ নম্বর প্ল্যাটফর্মে মাথায় ফুটবল রেখে রোলার স্কেটিং করে ১০০ মিটার দূরত্ব মাত্র ২৭ দশমিক ৬৬ সেকেন্ডে অতিক্রম করে দ্বিতীয়বারের মতো গিনেস স্বীকৃতি পান।
ছোটবেলায় এক গোলরক্ষকের বল নিয়ন্ত্রণ দেখে ফুটবল কসরতের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই প্রায় ৩৪ বছর ধরে তিনি ফুটবল নিয়ে নানা ধরনের কৌশল অনুশীলন ও প্রদর্শন করে আসছেন।
সীমাখালী বাজারের ব্যবসায়ী রাজ্জাক মণ্ডল বলেন, আবদুল হালিম আমাদের এলাকার গর্ব। তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, এমন একজন মানুষ এখনও আর্থিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাকে সহায়তা করত, তাহলে তিনি আরও বড় কিছু অর্জন করতে পারতেন।
ফারুক নামে স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষক বলেন, আবদুল হালিম ফুটবল কসরত দেখিয়ে যা আয় করেন তাতে তার সংসার চালানো কষ্টসাধ্য। তিনি অসাধারণ প্রতিভাবান কিন্তু তার মতো একজন মানুষ যদি অভাবের মধ্যে থাকেন, তাহলে এটা আমাদের জন্যও লজ্জার বিষয়। তাকে সহযোগিতা করলে নতুন প্রজন্মও অনুপ্রাণিত হবে।
আবদুল হালিম বলেন, ফুটবল নিয়ে কসরত দেখিয়েই সংসার চালাই। কিন্তু এতে আয় খুবই কম। অনেক সময় শ্রম ও অর্থ ব্যয় করে রেকর্ড করতে হয়। পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে আমার মতো মানুষের পক্ষে এটা করা খুব কঠিন।
হালিম জানান, আগের তিনটি রেকর্ডের সময় কিছু স্পনসর ছিল। তবে এবার কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নতুন রেকর্ড গড়তে হয়েছে তাকে। তিনি বলেন, গিনেস রেকর্ড করে দেশের সুনাম বাড়িয়েছি। কিন্তু এর বিনিময়ে তেমন কিছুই পাইনি। যদি আর্থিক উন্নতি না হয়, তাহলে অন্যরা কীভাবে এসব কাজে আগ্রহী হবে?
ভবিষ্যতে নিজের অর্জিত কৌশল নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চান আবদুল হালিম। তিনি বলেন, আমি চাই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা এসব কৌশল শিখুক। তারা যেন নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে দেশের সুনাম বাড়াতে পারে। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
বর্তমানে বয়স বাড়লেও অনুশীলন থামিয়ে দেননি আবদুল হালিম। প্রতিদিন সুযোগ পেলেই ফুটবল কসরতের চর্চা করেন তিনি। তার স্বপ্ন, সুযোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আরও নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে দেশের নাম বিশ্ব দরবারে তুলে ধরবেন।
শতখালী ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য হাসিনা বেগম বলেন, আবদুল হালিম আমাদের এলাকার গর্ব। আমরা চাই সরকারিভাবে তাকে সহযোগিতা করা হোক। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে যতটুকু পারি সহযোগিতা করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম বয়ে আনা এই প্রতিভাবান মানুষটিকে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়া হলে তিনি যেমন স্বস্তি পাবেন, তেমনি তার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মকেও গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
তাছিন জামান/এএমকে