ঈদের ছুটিতে খাগড়াছড়ির যেসব দর্শনীয় স্থানে যেতে পারেন

ঈদের দীর্ঘ ছুটি মানেই পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা। চারদিকে সবুজ পাহাড়, ঝরনা, মেঘের খেলা আর নীরব প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েকটি দিন কাটাতে চাইলে ঘুরে আসতে পারেন। ভ্রমণপিয়াসী প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এ সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি।
চেঙ্গী ও মাইনী নদীঘেঁষা এ অঞ্চল বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত কিংবা শীত সব ঋতুতেই ভিন্ন রূপে ধরা দেয়। প্রতি বছর ঈদ কিংবা ভিন্ন উৎসবের ছুটিতে পাহাড়ি পথ ধরে মেঘ ছোঁয়ার অভিজ্ঞতা নিতে পর্যটকদের আগ্রহ থাকে চোখে পড়ার মতো।
আলুটিলা
খাগড়াছড়ি শহর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত জেলার প্রধানতম পর্যটন কেন্দ্র। এখানে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রহস্যময় সুরঙ্গ রয়েছে। সূর্যাস্তের পর আলুটিলা থেকে খাগড়াছড়ি শহরের দৃশ্য যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবি। অন্ধকার পাহাড়ের বুকে লাখো বাতির মিটমিটে আলো রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি করে।

রহস্যময় সুরঙ্গের এক প্রান্ত দিয়ে প্রবেশ করে অন্য প্রান্ত দিয়ে বের হওয়ার অভিজ্ঞতা পর্যটকদের জন্য রোমাঞ্চকর। সুরঙ্গে প্রবেশের আগে টর্চ বা মশাল সংগ্রহ করা যায়। সুরঙ্গের ভেতর ভয়ের কিছু না থাকলেও সতর্কতা জরুরি।
রিছাং ঝরনা
আলুটিলার পাদদেশে অবস্থিত রিছাং ঝরনা। শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। স্থানীয় মারমা জনগোষ্ঠী ঝরনাটির নাম দিয়েছে ‘রিছাং’। পাহাড়ি পথ পেরিয়ে পৌঁছালে দেখা মেলে ঠান্ডা স্বচ্ছ জলের ধারা। কাছেই প্রায় ৩০ হাত উঁচু আরেকটি ঝরনা পর্যটকদের বাড়তি আকর্ষণ।
দেবতা পুকুর
পাহাড়ের চূড়ায় স্বচ্ছ জলাধার জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মাইসছড়ির নুনছড়িতে ৭৫০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত দেবতা পুকুর। স্থানীয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মতে, এ পুকুরের পানি কখনও কমে না এবং পরিষ্কার করতে হয় না। তাই এর নাম ‘মাতাই পুখুরি’ বা দেবতা পুকুর। বিশেষ করে বৈসাবী ও নববর্ষে এখানে হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটে।

অরণ্য কুঠির
পানছড়ি উপজেলায় অবস্থিত অরণ্য কুঠির বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এখানে রয়েছে প্রায় ৪৮ ফুট উচ্চতার দেশের অন্যতম বৃহত্তম বৌদ্ধ মূর্তি। সবুজে ঘেরা বিশাল এলাকাজুড়ে নীরবতা ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
তৈদু ছড়া ঝরনা
খাগড়াছড়ি সদর ও দীঘিনালা উপজেলার সীমান্তে দুর্গম সীমানাপাড়া গ্রামে অবস্থিত তৈদু ছড়া ঝরনা। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ পেরিয়ে যেতে হয় এখানে। পথে দেখা মেলে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা। বর্ষায় ঝরণার বিশাল জলপ্রবাহ পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
খাগড়াছড়ি শহরের কাছেই পরিবার নিয়ে ঘোরার আদর্শ স্থান জেলা পরিষদ পার্ক। জিরো মাইল এলাকায় প্রায় ২২ একর জায়গাজুড়ে পার্কটি অবস্থিত। পার্কে রয়েছে ঝুলন্ত সেতু, কিডস জোন, কটেজ ও পিকনিকের সুব্যবস্থা।
মানিকছড়ির ডিসি পার্ক
প্রায় ১৬০ একর জায়গায় বিস্তৃত মানিকছড়ির ডিসি পার্ক। পার্কে তিনটি লেক, পাখির অভয়ারণ্য, ট্রি হাউস, জিপ লাইন, কায়াকিং, ক্যাম্পিং, ক্লাইম্বিং, জায়ান্ট সুইংসহ নানা রোমাঞ্চকর আয়োজন রয়েছে।

ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে খাগড়াছড়ি যাওয়া যায়। উল্লেখযোগ্য পরিবহন সংস্থার মধ্যে রয়েছে শান্তি পরিবহন, এস আলম পরিবহন, সৌদিয়া কোচ সার্ভিস, শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, গ্রীন লাইন পরিবহনের এসি-নন এসি, স্লিপার বাস। এ ছাড়া, ঢাকা থেকে ট্রেনে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এসে সেখান থেকে বাসে খাগড়াছড়ি পৌঁছানো যায়।
কোথায় থাকবেন
খাগড়াছড়িতে সরকার পরিচালিত পর্যটন মোটেলসহ বিভিন্ন মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে। জেলা সদরে ব্যক্তিমালিকানাধীন হোটেল ও কটেজে এসি ও নন-এসি রুম ভাড়া সাধারণত ১ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকার মধ্যে।
খাবার হোটেল
খাগড়াছড়ি শহরে অসংখ্য খাবার হোটেল রয়েছে। দেশি খাবারের পাশাপাশি এখানকার ট্রেডিশনাল খাবার পাওয়া যায়। ট্রেডিশনাল খাবার খেতে পানখাইয়া পাড়া এলাকায় সিস্টেম রেস্টুরেন্ট, নিউজিল্যান্ড এলাকায় ব্যাম্বুসুট, হাতির কবর এলাকায় বাঁশঝার রেস্টুরেন্ট অন্যতম।

খাগড়াছড়ি গেট এলাকায় সাফারি এবং ‘চাঁদের গাড়ির কাউন্টার রয়েছে। কাউন্টার থেকে সহজেই গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া, শহরের ভেতর মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। নির্ধারিত কাউন্টার থেকে দরদাম জেনে গাড়ি ভাড়া করা যায়।
অতিরিক্ত ভিড় এড়াতে আগে থেকে হোটেল বুকিং নিশ্চিত করুন। ঝরণায় নামার আগে পাথরের পিচ্ছিলতা খেয়াল রাখবেন। পরিবেশ রক্ষায় প্লাস্টিক বা ময়লা ফেলে আসবেন না। স্থানীয় সংস্কৃতি ও অদিবাসীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবেন।
ঈদুল ফিতরের ছুটিতে পরিবার-বন্ধুদের নিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটাতে চাইলে খাগড়াছড়ি হতে পারে আদর্শ গন্তব্য। পাহাড়, ঝরনা, মেঘ আর নীরবতার মেলবন্ধনে সাজানো এ পার্বত্য জেলা ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দিতে প্রস্তুত।
এএমকে