ইউটিউব ভিলেজসহ কুষ্টিয়ার যে ৭ দর্শনীয় স্থানে যেতে পারেন ঈদের ছুটিতে

গড়াই নদীর তীরে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম দর্শনীয় জেলা কুষ্টিয়া। সংস্কৃতির রাজধানীও বলা হয় কুষ্টিয়াকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্বে সমৃদ্ধ কুষ্টিয়ায় রয়েছে লালন সাাঁইয়ের আখড়াবাড়ি, রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি, মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তু ভিটা, ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ, সাংবাদিকতার পথিকৎ কাঙ্গাল হরিনাথের বাস্তুভিটা জাদুঘর, রেনউইক বাঁধসহ আরও দর্শনীয় স্থান রয়েছে।
লালন সাঁইয়ের আখড়া বাড়ি
কুষ্টিয়ার অন্যতম দর্শনীয় স্থান লালন আখড়া বা লালন সাঁইজির মাজার। এটি কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালি উপজেলার ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত। মরমী বাউল সাধক লালন ফকিরের আখড়া সংস্কৃতিপ্রেমী পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় স্থান। এটি মূলত লালনের মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা। এখানে বছরে দুইবার লালন মেলা বসে। ফাল্গুন মাসে দোল পূর্ণিমা উৎসব ও ১৭ অক্টোবর লালনের জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে এই মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

কুষ্টিয়ার মজমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মাত্র ২০ মিনিটে লালন আখড়ায় যেতে সময় লাগে। অটোরিকশায় জনপ্রতি ২০ টাকা করে ভাড়া লাগে।
রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি
কুমারখালীর শিলাইদহে অবস্থিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি। কুষ্টিয়া জেলার আকর্ষণীয় জায়গা এটি। প্রতি বছর বিশ্বকবি রবীন্দ্রানাথের জন্মদিন উপলক্ষে ২৫ বৈশাখ আয়োজিত রবীন্দ্র জয়ন্তীর উৎসবে দর্শনার্থীদের আনাগোনা হয় অনেক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার জীবনের দীর্ঘ সময় এই কুঠিবাড়িতে অবস্থান করেছেন এবং বাবার জমিদারি দেখাশুনা করেছেন, আর ফাঁকে কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প ও উপন্যাসও রচনা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে প্রায় এক দশক অবস্থান করেছেন। বাগান, পুকুর ও কুঠিবাড়ির মূল ভবনসহ এর আয়তন ৩৩ বিঘা। আর মূল ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে আড়াই বিঘার ওপর। রবীন্দ্রনাথের ব্যবহার্য অনেক জিনিসপত্রই রয়েছে এখানে। অত্যন্ত মনোরমভাবে সাজানো এই কুঠিবাড়ি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়ি কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নে অবস্থিত। এটি কুষ্টিয়া থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে। কুষ্টিয়ার মজমপুর থেকে জনপ্রতি ৬০ টাকা অটোরিকশায় যাওয়া যায়।
মীর মশাররফ হোসেনের বাস্তু ভিটা
বাংলা সাহিত্যের অমর কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন। বিষাদ সিন্ধু, রত্নাবতী উপন্যাসসহ অসখ্যা সাহিত্যকর্ম রচনার পাশাপাশি সাংবাদিকতায়ও পারদর্শী ছিলেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে অমর কথাশিল্পী মীর মশাররফ হোসেনের অবদান অনস্বীকার্য। তার এসব সাহিত্যকর্ম আজো সংরক্ষিত আছে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়া এলাকার স্মৃতি পাঠাগারে।
তার এই জন্মস্থানকে ঘিরে বর্তমানে এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, লাইব্রেরি, জাদুঘর ও অডিটোরিয়াম রয়েছে। সেখানে মীর মশাররফ হোসেনের ব্যবহার্য জিনিসপত্র রয়েছে।

১৮৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার লাহিনীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বিষাদ সিন্ধুর রচয়িতা মীর মশাররফ হোসেন। প্রতিবছর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে তার জন্ম ও মৃতবার্ষিকীতে এই বাস্তুভিটায় গ্রামীণ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
কুষ্টিয়ার মজমপুর থেকে অটোরিকশা জনপ্রতি ৩০ টাকা ভাড়ায় এখানে আসা যায়।
ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ
মুঘল স্থাপত্যে নির্মিত ঝাউদিয়া শাহী মসজিদ কুষ্টিয়ার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সমাদৃত। ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে ইতিহাসপ্রেমীদের কাছেও বেশ জনপ্রিয়। কুষ্টিয়ার সদর উপজেলার ঝাউদিয়া এলাকায় এটি অবস্থিত।
কুষ্টিয়া মজমপুর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরে ঝাউদিয়া গ্রাম। ইট, পাথর, বালি ও চিনামাটির মিশ্রণে এ মসজিদটি এক ঐতিহ্যের চমৎকার নিদর্শন। মসজিদটি শৈল্পিক কারুকার্য আছে। মূল কাঠামোতে তিনটি গম্বুজ ও তিনটি দরজা রয়েছে।

কুষ্টিয়া মজমপুর থেকে যেতে গণপরিবহনে মসজিদটির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলে অন্তত এক ঘণ্টা সময় লাগে। অটোরিকশায় জনপ্রতি ৬০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যায়।
সাংবাদিকতার পথিকৎ কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বাস্তুভিটা
হরিনাথ মজুমদার যিনি কাঙাল হরিনাথ নামে বেশি পরিচিত। কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে জন্ম নেওয়া হরিনাথ বহুমাত্রিক প্রতিভা। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার এ উপমহাদেশের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ প্রকাশ করেন। প্রথম দিকে তিনি হাতে লিখে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন। পরে কলকাতা থেকে একটি পুরোনো মুদ্রণযন্ত্র (প্রেস) এনে সংবাদপত্র প্রকাশ করতেন। সেই ছাপাখানার নাম দেন এম এন প্রেস।
শতবর্ষী প্রাচীন মুদ্রণযন্ত্র এম এন প্রেস থেকে সিসার হরফের কম্পোজে পত্রিকা প্রকাশ করা হতো। সজ্জিত হরফ প্রেসের পাটাতনে সাজিয়ে হাতল চেপে ধীরগতিতে চলত ছাপার কাজ।
বর্তমানে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের প্রেসটি পরিবারের কাছ থেকে নিয়ে কুমারখালীতে অবস্থিত তার নামে নির্মিত কাঙ্গাল হরিনাথ জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
কুষ্টিয়া মজমপুর থেকে গণপরিবহনে অথবা অটোরিকশায় যাওয়া যায়।
রেনউইক বাঁধ
শহরের গড়াই নদী-সংলগ্ন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আখ মাড়াই কলের যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা ছিল রেনউইক অ্যান্ড যজ্ঞেশ্বর কোম্পানি। ছায়াঘেরা সুন্দর পরিবেশের এ কোম্পানির শেষ প্রান্তে নদীর তীরে গড়ে তোলা হয়েছে শহররক্ষা ‘রেনউইক বাঁধ’। শত শত মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। চাইলে নৌভ্রমণ করতে পারেন পর্যটকরা।

কুষ্টিয়া মজমপুর থেকে পায়ে হেঁটে মাত্র ১০ মিনিট সময় লাগে এইে রেনউইক বাঁধে যেতে। প্রতিদিনসহ বিশেষ বিশেষ দিনে এই বাঁধে ভিড় লেগেই থাকে।
ইউটিউব ভিলেজ
সোশ্যাল মিডিয়া ‘ইউটিউবের’ কল্যাণে শিমুলিয়া গ্রামের নাম বদলে হয়ে গেছে ‘ইউটিউব ভিলেজ’। গ্রামটির আসল নাম শিমুলিয়া হলেও ২০১৬ সালের পর এটি পরিচিত হচ্ছে ইউটিউব ভিলেজ নামে। ইউটিউব চ্যানেল থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে এই গ্রামের সামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামের সৌন্দর্য্যবর্ধন এবং বিনোদনের জন্য তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ইউটিউব পার্ক।
কুষ্টিয়া মজমপুর থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে খোকসায় অবস্থিত এই গ্রাম। এই ইউটিউব ভিলেজে যেতে প্রায় ১ ঘণ্টা সময় লাগে।
এএমকে