ঈদের ছুটিতে যেতে পারেন ফুলের রাজধানীসহ যশোরের যেসব স্থানে

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী জেলা যশোর। ইতিহাস, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ধর্মীয় স্থাপনা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এ জনপদ। ফুলের রাজ্য থেকে প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ, কবির স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে ভাসমান সেতু—ভ্রমণপিপাসুদের জন্য যশোর এক সমৃদ্ধ গন্তব্য। ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের নিয়ে এসব দর্শনীয় স্থানে ঘুরে এসে সময়টাকে করে তুলতে পারেন আরও আনন্দময়।
বিজ্ঞাপন
৩৬০ দুয়ারি কালেক্টরেট ভবন ও পার্ক
যশোরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে যশোর কালেক্টরেট ভবন। স্থাপনাটি ৩৬০ দুয়ারী কালেক্টরেট ভবন নামেও খ্যাত। কালেক্টরেট ভবনের পাশে ভৈরব নদের তীরে গড়ে তোলা হয়েছে যশোর কালেক্টরেট পার্ক। কালেক্টরেট পার্কের পাশে রয়েছে ফ্লাওয়ার পার্ক। পার্কের ভেতরে তিন বিঘা জায়গাজুড়ে রয়েছে একটি পুকুর। সেখানে হাত থেকে রঙিন মাছের খাবার খাওয়া মন কাড়বে সবার। পূর্ব ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা না থাকলে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বিনা টিকেটে প্রবেশ করতে পারবেন এখানে।

যশোর জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা থেকেই দেখতে পাবেন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কালেক্টরেট ভবন।
বিজ্ঞাপন
ভরত রাজার দেউল
কেশবপুর উপজেলা থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রায় ১৮০০ বছর আগে গুপ্ত যুগে এ বিশাল আকৃতির সপ্তকটি নির্মাণ করেছিলেন ভরত রাজা, যা বর্তমানে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রতীক। দেউলটিতে মোট ৮২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ রয়েছে।

যশোর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে কেশবপুর হয়ে চুকনগর বাজার যেতে হবে। এরপর গৌরীঘোনা সড়ক ধরে কিছু দূর গেলেই ভরতভায়না গ্রাম। প্রাচীন এই নিদর্শন উপভোগের টিকেট মূল্য ২০ টাকা। প্রতিদিনই সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
বিজ্ঞাপন
চাঁচড়া শিবমন্দির
যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া গ্রামে অবস্থিত চাঁচড়া শিবমন্দির। মন্দিরটি প্রাচীন বাংলার চারচালা কুঁড়েঘরের আদলে একটি আটচালা স্থাপনা। পুরো মন্দির পোড়ামাটির ফলকে অলংকৃত।

যশোর শহরের দড়াটানা থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে চাঁচড়া গ্রাম। যশোর-বেনাপোল মহাসড়ক থেকে দেখা যায় শিবমন্দিরটি। রিকশা বা ইজিবাইকে যেতে ১০০-১২০ টাকা ভাড়া লাগবে।
যশোর রোড
কালীগঞ্জের নলডাঙ্গার জমিদার কালী পোদ্দার ঐতিহাসিক যশোর রোড নির্মাণ করেন। রাজমাতা যশোদা দেবীর নামানুসারে রাস্তাটিকে যশোর রোড নামকরণ করা হয়। শতবর্ষী সেইসব গাছ আজও যশোর রোডের শোভা বর্ধন করে আসছে।

যশোর থেকে বেনাপোলগামী ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ রোডটিই যশোর রোড নামে পরিচিত।
বিনোদিয়া ফ্যামিলি পার্ক
যশোর ক্যান্টনমেন্টের সীমানা ঘিরে বিনোদিয়া ফ্যামিলি পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত এ পার্কটি সাপ্তাহের সাতদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। যে কোনো প্রাপ্ত বয়স্ক দর্শনার্থীদের জন্য পার্কে প্রবেশ টিকেটের মূল্য ৫০ টাকা এবং ছোট বাচ্চাদের প্রবেশ করতে ৩০ টাকা।
যশোর পালবাড়ি মোড় হতে ইজিবাইকে চড়ে বিনোদিয়া পার্কে যাওয়া যায়। ভাড়া ২০ টাকা।
বেনাপোল স্থলবন্দর
দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ বেনাপোলের মাধ্যমে সংঘটিত হয়। শুল্ক আদায়ের জন্য এখানে কাস্টম হাউস রয়েছে। রয়েছে একটি সীমান্ত তল্লাশি ঘাঁটি ও একটি আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর। এখানে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে আপনি শূন্যরেখায় প্রবেশ করতে পারবেন। স্থলবন্দরে যাওয়ার পূর্বেই বিশাল আকৃতির বেনাপোল পৌরগেট আপনার নজর কাড়তে বাধ্য।

যশোর চাঁচড়া চেকপোস্ট থেকে বাসে উঠে বেনাপোলে বাস টার্মিনাল পর্যন্ত যেতে ভাড়া লাগবে ৮০ টাকা। সেখান থেকে ইজিবাইকে ১০ টাকায় আপনি পৌঁছে যাবেন শূন্য রেখায়।
দেশের দীর্ঘতম ভাসমান সেতু
যশোরের মণিরামপুরের ঝাঁপা বাওড়ের ওপর প্রায় ১৩০০ ফুট দীর্ঘ একটি ভাসমান সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। প্রায় ৮৩৯টি নীল রঙের ভাসমান ড্রামের ওপর স্টিলের পাত ফেলে তৈরি করা। বাংলাদেশের প্রথম ও দীর্ঘতম দৃষ্টিনন্দন এই ভাসমান সেতু। এই সেতুতে চড়তে ১০ টাকা দিয়ে টিকেট কাটতে হয়।

যশোর বাস টার্মিনাল অথবা চাঁচড়া চেকপোস্ট থেকে লোকাল বাসে চড়ে পুলেরহাট হয়ে রাজগঞ্জ বাজারে পৌঁছালেই ভাসমান সেতু দেখতে পাবেন। ভাড়া ৫০ টাকা।
দমদম পীরস্থান ঢিবি
মণিরামপুর বাজার থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে ভোজগাতি ইউনিয়নের দোনার গ্রামে নিভৃতে দাঁড়িয়ে আছে এক ঢিবি, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে ‘দমদম পীরস্থান’ নামে পরিচিত। এটি কেবল কয়েকশ বছরের নয়, বরং ১৮শ’ বছরেরও বেশি প্রাচীন এক জনপদের ধ্বংসাবশেষ, যা আমাদের নিয়ে যায় যিশুখ্রিষ্টের জন্মের সমসাময়িক এক সুপ্রাচীন অতীতে।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের মাজার
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার গোয়ালহাটি গ্রামে সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন বীর শ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ। সহযোদ্ধাদের প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে সহযোদ্ধারা নিরাপদে থাকলেও রণক্ষেত্রের পাশের একটি ঝোপ থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করে যশোরের শার্শার কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়।

যশোর জেলা সদর থেকে বাসে চড়ে নাভারণ কলেজ মোড় অথবা শার্শা উপজেলায় যেতে হবে। সেখান থেকে থ্রি-হুইলারে (মাহেন্দ্রা) যেতে পারবেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের মাজারে। নাভারণ অথবা শার্শা থেকে ভাড়া নেবে ২০ টাকা।
মীর্জানগর হাম্মামখানা
কেশবপুর উপজেলা সদর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে কপোতাক্ষ ও বুড়িভদ্রা নদীর ত্রিমোহিনীতে মীর্জানগরের নবাববাড়িতে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন হাম্মামখানা, যা মীর্জানগর হাম্মামখানা নামে পরিচিত। ১০ ফুট উঁচু প্রাচীরবেষ্টিত দূর্গের এক অংশে হাম্মামখানা স্থাপন করা হয়। মোগল স্থাপত্যশৈলীর অনুকরণে তৈরি হাম্মামখানায় ৪টি কক্ষ ও একটি কূপ রয়েছে।
বাসে চড়ে যশোর থেকে কেশবপুর হয়ে ৭ কিলোমিটার দূরে মির্জানগর হাম্মামখানা যেতে পারবেন। বাসে ভাড়া লাগবে ৫০-৬০ টাকা।
হনুমান গ্রাম
যশোরের কেশবপুরে রয়েছে ভবঘুরে প্রজাতির প্রায় ৪০০ কালোমুখী হনুমানের আবাস, আর তাই এলাকাটি কেশবপুরের হনুমান গ্রাম নামে পরিচিত। বর্তমানে কেবল বাংলাদেশের কেশবপুর এবং ভারতের নদীয়া জেলায় আচরণ এবং বুদ্ধিমত্তায় উন্নত কালোমুখ ভবঘুরে হনুমানের এই প্রজাতিটি দেখতে পাওয়া যায়।

কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে বাসে চড়ে যশোর থেকে কেশবপুর যেতে পারবেন। সেখান থেকে স্থানায় যানবাহনে হনুমান গ্রামে যেতে পারবেন। বাসের ভাড়া লাগবে ৫০-৬০ টাকা।
জেস গার্ডেন পার্ক
যশোর জেলা শহর থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরত্বে জেস গার্ডেন পার্ক নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে ওয়াটার গার্ডেনসহ সব আধুনিক বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। সপ্তাহের ৭ দিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। পার্কে প্রবেশ টিকেটের মূল্য ৫০ টাকা এবং মিনি চিড়িয়াখানার টিকেটের মূল্য ১০ টাকা।

যশোর নিউমার্কেট বাসস্ট্যান্ড হতে ইজিবাইজে বাহাদুরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে নেমে ইজিবাইকের ভাড়া লাগবে ১০ থেকে ১৫ টাকা।
মধুসূদন দত্তের বাড়ি মধুপল্লী
যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, মধুসূদন জাদুঘর, লাইব্রেরি এবং সাগরদাঁড়ি পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করে মধুপল্লী নামকরণ করা হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ির-সংলগ্ন কপোতাক্ষ নদের তীরে একটি নৌঘাট এবং কাঁঠবাদামের গাছ রয়েছে। এই ঘাটটিকে কবির বিদায়ী ঘাট বলা হয়। প্রতি সাপ্তাহের রোববার এবং সব সরকারি ছুটির দিনে মধুপল্লী সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। মধুপল্লীতে প্রবেশমূল্য ১০ টাকা।

যশোর জেলা শহর থেকে বাসে চড়ে কেশবপুর আসতে হবে। কেশবপুর থেকে ভ্যানযোগে সাগরদাঁড়ি গ্রামের মধুপল্লী পৌঁছাতে পারবেন। যশোর জেলা শহর থেকে মধুপল্লীর দূরত্ব প্রায় ৪৫ কিলোমিটার।
ফুলের রাজ্য গদখালী ও ফুলকানন পানিসারা
গদখালী বাংলাদেশের ফুলের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। যশোর জেলা শহর থেকে বেনাপোলের দিকে ১৮ কিলোমিটার গেলেই গদখালী বাজার। গদখালীতে আসা ফুলগুলো ঝিকরগাছা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। গদখালী ফুলের বাজার সাধারণত প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর পর শুরু হয়। এ ছাড়া, গদখালী থেকে তিন কিলোমিটার ভেতরে তিন ইউনিয়নের (গদখালী-পানিসারা-নাভারণ) সমন্বয়ে ফুলমোড় হিসেবে পরিচিত। যেখানে তিন-চারটি পিকনিক স্পট তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি কর্নারে প্রবেশ করতে ৫০-১০০ টাকা খরচ করতে হবে।

ফুলের রাজ্যে যেতে হলে চাঁচড়া চেকপোস্ট থেকে গদখালি যাওয়ার বাস পাওয়া যায়। ভাড়া নেবে ৩৫ টাকা। গদখালি পৌঁছে ফুলমোড়ে যেতে ইজিবাইকে জনপ্রতি ভাড়া নেবে ১০ টাকা।
রাজকন্যা অভয়ার ১১ শিব মন্দির
রাজকন্যা অভয়ার অভয়নগরে আছে ১১ শিবমন্দির। যা এখন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এই নিদর্শন দেখতে ও পূজা অর্চনা করতে এখানে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। যশোর-খুলনা মহাসড়কের মাঝামাঝি স্থানে অভয়নগরের নওয়াপাড়া বাজার। ১৭৪৫ থেকে ১৭৬৪ সালের মধ্যে মেয়ের জন্য ভৈরব নদের পাড়ে এগারোটি পৃথক শিব মন্দির নির্মাণ করে দেন রাজা নীলকণ্ঠ রায়।

যশোর মনিহার থেকে বাসে উঠে নওয়াপাড়া যেতে হবে। বাসভাড়া প্রয়োজন হবে ৬০ টাকা। এরপর ইজিবাইকে যেতে হবে রাজঘাট এলাকায়। সেখান থেকে ভৈরব নদ পার হয়ে পাঁয়ে হেঁটে বা ভ্যানে করে যেতে হবে রাজকন্যা অভয়ার ১১ শিব মন্দির।
এএমকে