ঈদের ছুটিতে জয়পুরহাটের যেসব স্থানে ঘুরতে পারেন

ঈদ মানেই শিকড়ের টানে বাড়ি ফেরা, আর বাঁধভাঙা আনন্দ। সেই খুশিতে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে টানা ৭ দিনের ঈদের ছুটি। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে ঈদের আনন্দকে স্মরণীয় করে রাখতে ইতোমধ্যে নানা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে ছোট-বড় সবাই।
বিজ্ঞাপন
ঈদে নতুন পোশাকে কেউ হয়তো প্রিয়তমার হাত ধরে কোনো নিভৃত দিঘি বা নদীর পাড়ে শান্ত বাতাসে খুঁজে নেবেন পরম প্রশান্তি। কেউবা পরিবার-পরিজন আর বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠবেন সাজানো-গোছানো কোনো বিনোদন পার্কের উল্লাসে কিংবা ভিড় করবেন ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী প্রাচীন নিদর্শনে। ঈদের উল্লাসে এবার ভ্রমণের নেশায় মাতবে জয়পুরহাট। সেজন্য এ জেলার আনাচে-কানাচে অপেক্ষা করছে চমৎকার সব দর্শনীয় স্থান। কিন্তু কোথায় সেই স্থানগুলো? এ জেলার দর্শনার্থীরা এবার ঈদের ছুটিতে ঠিক কোথায় ঘুরতে পারেন তা নিয়েই ঢাকা পোস্টের এই আয়োজন।
জয়পুরহাট শিশু উদ্যান
জয়পুরহাট জেলা শহর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে বুলুপাড়া মহল্লায় অবস্থিত এই পার্কটি শিশু উদ্যান নামে হলেও সেখানে সব বয়সি মানুষ ভিড় জমায়। এখানে দুটি লেক রয়েছে। সেখানে প্যাডেল বোট ও স্পিড বোট চড়ে সময় কাটানো যায়। শিশুদের জন্য নাগরদোলা, ট্রেন, নানা রকম রাইড এবং আদিমগুহা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
রিকশা বা অটোরিকশায় শহরের জিরো পয়েন্ট মসজিদ মার্কেটের সামনে থেকে সেখানে যেতে ভাড়া লাগবে ১০ থেকে ২০ টাকা। শিশু উদ্যানে প্রবেশে ৩ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য ৫০ টাকা এবং বড়দের জন্য প্রবেশ মূল্য ১০০ টাকা। এছাড়া ভেতরে গিয়ে নির্ধারিত স্থানের জন্য আলাদাভাবে ভাড়া দিতে হবে, আবার বিভিন্ন রাইডের জন্য ২০ টাকা থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত আলাদাভাবে টিকেট কেটে নিতে হবে। এটি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৮ টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
দ্য ফেন্ডস আইল্যান্ড
‘দ্য ফ্রেন্ডস আইল্যান্ড’ বর্তমানে জয়পুরহাট শহরের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্র। আধুনিক সাজসজ্জা, স্বচ্ছ পানির আধুনিক সুইমিংপুল এবং শিশুদের আনন্দের জন্য রয়েছে হরেক রকমের মনোরম রাইড। এটি শহরের একদম কাছাকাছি হারাইল এলাকায় অবস্থিত। রিকশা বা অটোরিকশায় শহরের বাস টার্মিনাল থেকে সেখানে যেতে ভাড়া লাগবে ৫ থেকে ১০ টাকা। এটি সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সেখানে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা। এছাড়া ভেতরে গিয়ে কিছু রাইডের জন্য টিকেট কাটতে হবে। এছাড়া সুইমিংপুলের জন্য ২০০ টাকায় টিকেট কেটে নিতে হবে।
বিজ্ঞাপন

হারাবতী ইকো রিসোর্ট
সবুজের সমারোহ আর গ্রামীণ স্নিগ্ধতার মাঝে আধুনিকতার ছোঁয়ায় জয়পুরহাট সদর উপজেলার মাধাইনগর হাটুভাঙ্গা এলাকায় হারাবতী ইকো রিসোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। রিসোর্টের চারপাশের গাছপালা, সাজানো বাগান এবং সুন্দর বসার জায়গাগুলো পর্যটকদের মানসিক প্রশান্তি জোগায়। সেখানকার সবুজের মাঝে প্রিয়জনদের নিয়ে নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য এটি এক চমৎকার জায়গা। জয়পুরহাট বাস টার্মিনাল থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে এটির অবস্থান। সেখানে বাস টার্মিনাল থেকে ৫০ টাকা ভাড়ায় সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোতে যাওয়া যায়। আবার ক্ষেতলালের নিশ্চিন্তা মোড় থেকে সিএনজি বা ব্যাটারিচালিত অটোতে ৪০ টাকা ভাড়ায় সেখানে যাওয়া যাবে।
পাঁচবিবি উপজেলা সদর থেকেও সেখানে যাওয়া যায়। এজন্য পাঁচবিবি থেকে সিএনজিতে ৪০ টাকা ভাড়ায় চাঁনপাড়া বাজারে নামতে হবে, সেখান থেকে ২০ টাকা ভাড়া দিয়ে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে ভূতগাড়ি হয়ে ওই রিসোর্টে যাওয়া যায়। এই রিসোর্টে প্রবেশ মূল্য ৫০ টাকা।
পাথরঘাটা ও নিমাই পীরের মাজার
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা সদর হতে প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্বে তুলসীগঙ্গা নদীর পাশের এলাকার নামই ‘পাথরঘাটা’। সেখানে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আর নদীর স্নিগ্ধ রূপ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। বিশাল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ এবং মাটির নিচে চাপা পড়া ইতিহাসের গল্প জানেত প্রতি বছরই ঈদের ছুটিতে এখানে ভিড় করেন হাজারো মানুষ। নদীর ধারের খোলা আকাশ আর স্নিগ্ধ বাতাস প্রিয়জনের হাত ধরে বিকেল কাটানোর জন্য এক চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে। এই একই এলাকায় রয়েছে নিমাই পীরের মাজারও। পাঁচবিবি রেলওয়ে স্টেশনের পূর্বপাশ থেকে থেকে ব্যাটারিচালিত অটোতে উচাই হয়ে সরাসরি পাথরঘাটা যাওয়া যায়। এজন্য জনপ্রতি ৩০ টাকা ভাড়া গুনতে হবে।
লকমা রাজবাড়ি
জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার ভারত সীমান্ত ঘেঁষা লকমা এলাকায় অবস্থিত কয়েকশ বছরের প্রাচীন এই ‘লকমা রাজবাড়ি’। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ আজও দর্শনার্থীদের কৌতূহল জাগায়। সেখানকার দালানকোঠা আর লতাপাতায় ঘেরা জীর্ণ দেওয়ালগুলো দেখতে অনেক ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে ভিড় করেন। এবার ঈদে আপনার জন্য লকমা রাজবাড়ি এক চমৎকার গন্তব্য হতে পারে।
এটি পাঁচবিবি উপজেলা থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে সোজা পশ্চিমে অবস্থিত। সেখানে যেতে পাঁচবিবির পাঁচমাথা এলাকা থেকে ব্যাটারিচালিত অটোতে সহজেই যাওয়া যায়। এজন্য জনপ্রতি ৩০ টাকা থেকে ৪০ টাকা ভাড়া গুনতে হবে।
নান্দাইল দিঘী
বিশালতার স্বাদ নিতে চাইলে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক নান্দাইল দিঘিতে চলে যান। প্রায় ৫৯ একর আয়তনের নান্দাইল দিঘীর পাড়ে বসে নীল জলের খেলা দেখা কিংবা নৌকায় ভেসে বেড়ানো আপনার ঈদ বিনোদনকে পূর্ণতা দেবে। এখানে যেতে কালাই বাসস্ট্যান্ড থেকে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে চড়তে হবে। প্রায় ৫ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর দিক দূরে এই দিঘীতে যেতে ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা গুনতে হবে।

নিঃশব্দ (বিলের ঘাট)
তুলসীগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত ক্ষেতলাল উপজেলার নিঃশব্দ বিলের ঘাট এখন ভ্রমণপিপাসুদের পছন্দের শীর্ষে। নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেতু আর বাঁধ হতে নিচের দিকে থাকা নদী দেখার জন্য ‘ভিউ পয়েন্ট’ এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করেছে। এখানে ক্ষেতলাল উপজেলা এবং সদর উপজেলার জামালপুর চার মাথা থেকে সহজেই যাওয়া যায়। উভয়দিক থেকেই ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে সেখানে যাওয়া যাবে। ক্ষেতলাল সদর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই বিলের ঘাটে যেতে জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা ভাড়া গুনতে হবে। আর জামালপুর চারমাথা থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে বিলের ঘাটে যেতে ১০ থেকে ১৫ টাকা ভাড়া দিতে হবে।
হিন্দা-কসবা শাহী জামে মসজিদ
ইসলামি স্থাপত্য ও কারুকার্যের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ হলো জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার হিন্দা-কসবা শাহী জামে মসজিদ। এটি ক্ষেতলাল উপজেলা থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দক্ষিণে হিন্দা গ্রামে অবস্থিত। অপূর্ব নির্মাণশৈলীর জন্য এই মসজিদটি স্থানীয় এবং বাহির হতে আগত লোকজনদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই মসজিদে যেতে ক্ষেতলাল হাসপাতাল মোড় হতে ব্যাটারিচালিত ভ্যান বা অটোতে চড়তে হয়। প্রতিজন ২০ টাকা ভাড়াতে খুব সহজে ইটাখোলা বাজার হয়ে ওই মসজিদে যাওয়া যায়।

আছরাঙ্গা দিঘী
যারা ঈদের ছুটিতে বিশাল জলরাশি আর সবুজের মাঝে সময় কাটাতে চান, তাদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ক্ষেতলাল উপজেলার ‘আছরাঙ্গা দিঘি’। বিশাল দিঘির স্বচ্ছ পানি আর পাড়ের সারিবদ্ধ গাছপালা দর্শনার্থীদের মুহূর্তেই প্রশান্তি দেয়। ক্ষেতলাল উপজেলা থেকে আছরাঙ্গা দিঘির দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। আবার আক্কেলপুর উপজেলা সদর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। দুই উপজেলা সদর থেকেই ব্যাটারিচালিত অটোতে সরাসরি দিঘি পাড়ে যাওয়া যায়। ক্ষেতলাল থেকে থানা বাজার বা হাসপাতাল মোড়ে গাড়িতে চড়তে হয়। জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা ভাড়ায় সেখানে যাওয়া যায়। আবার আক্কেলপুর হাসপাতাল মোড় হতে গাড়িতে চড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় দিঘী পাড়ে যাওয়া সম্ভব।
গোপীনাথপুর মেলা
এ জেলার আক্কেলপুর উপজেলা থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পূর্বে গোপীনাথপুর মন্দির অবস্থিত। পাঁচশত বছরের অধিক সময়ের পুরনো এই মেলাটি লোকজ ঐতিহ্যের এক বিশাল কেন্দ্র। এটি মূলত দোল পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে শুরু হলেও এর ব্যাপ্তি থাকে প্রায় মাসজুড়ে, ফলে ঈদের ছুটিতেও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ থাকে এই মেলা। গোপীনাথ মন্দিরের এই মেলাটি ঘোড়া ও পশুর মেলার জন্য এক সময় বিশ্বজুড়ে পরিচিত ছিল। বর্তমানে এখানে হরেক রকমের আসবাবপত্র, মাটির তৈরি জিনিসপত্র, গৃহস্থালি পণ্য আর মিঠাই-মিষ্টান্নের পসরা বসে। এছাড়া নাগরদোলা ও সার্কাসের মতো গ্রামীণ বিনোদন পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দেয়। যারা উৎসবের আমেজে গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য গোপীনাথপুর মেলা এবার অন্যতম সেরা গন্তব্য।
ব্যাটারিচালিত অটো বা ভ্যানে করে গোপীনাথপুর মেলায় যাওয়া যায়। এছাড়া সরাসরি সিএনজি রিজার্ভ করেও যাওয়া সম্ভব। হাসপাতাল গেটে ব্যাটারিচালিত অটো বা ভ্যানে চড়ে জনপ্রতি ১৫ টাকা ভাড়া দিয়ে এ মেলায় যাওয়া যায়। এছাড়া আক্কেলপুর থেকে বাসযোগেও যাওয়া সম্ভব।
আরএআর