স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও অবহেলায় অস্তিত্ব সংকটে গাইবান্ধার বধ্যভূমি

স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু যে মাটিতে একসময় মুক্তিযুদ্ধের নির্মমতা আর শহীদের রক্ত মিশে ছিল, সেই গাইবান্ধার বহু বধ্যভূমি আজ নিজ অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে। সংরক্ষণের অভাব, দখলদারিত্ব এবং অবহেলায় জেলার অধিকাংশ বধ্যভূমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
জেলার সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও সংগঠনের বিভিন্ন সূত্র জানায়, গাইবান্ধায় চিহ্নিত ৪৩টি বধ্যভূমি ও গণকবরের মধ্যে অন্তত ২৫টির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কোথাও আবর্জনার ভাগাড়, কোথাও প্রভাবশালীদের দখল, আবার কোথাও চলছে কৃষিকাজ—যেন ইতিহাসকে মুছে ফেলার এক নীরব প্রক্রিয়া।
স্বাধীনতার পর থেকে এসব স্থান সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে সেগুলোর ফল খুব একটা দেখা যায়নি। এছাড়া দেশের জেলায় জেলায় রয়েছে ‘বদ্ধভূমি সংরক্ষণ কমিটিও’। প্রতিবছর এদিন এলে তারা বদ্ধভূমি সংক্ষণে সরকারের নানা সমালোচনা করে ব্যর্থতা তুলে ধরেন। প্রতিবাদ সমাবেশ মিটিং, মিছিল আলোচনা সভাসহ মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কিংবা আলোর মিছিলের আয়োজন করে থাকে। কিন্তু বাস্তবে বদ্ধভূমি উদ্ধার কিংবা সংরক্ষণ সফল হয় না।
২০১৪ সালে উচ্চ আদালত সারা দেশের বধ্যভূমি সংরক্ষণের নির্দেশ দিলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যার একটি গাইবান্ধা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জেলা শহরের প্রধান বদ্ধভূমি।
বিজ্ঞাপন
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরাধীন শক্তির আত্মসমর্পণ দিনেও গাইবান্ধার প্রত্যন্ত অঞ্চলজুড়ে চলছিলো শোকের নিঃশব্দ স্রোত। টানা নয় মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞ এই জনপদের মানুষকে যে ক্ষত দিয়েছে, তার দাগ মুছে যায়নি আজও।
গাইবান্ধা শহরের কেন্দ্রস্থলে জেলা স্টেডিয়ামসংলগ্ন বধ্যভূমি- একাত্তরে যেখানে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মানুষকে মাটিচাপা দেওয়া হতো, আজ সেই জায়গা আগাছায় ভরা, কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই উল্টো সেখানে চাষাবাদ চলছে। উর্বর এ জেলার ভূমির গভীরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য অচেনা শহীদের নিঃশব্দ কবর। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও গাইবান্ধার অধিকাংশ বধ্যভূমি ও গণকবর এখনো পায়নি প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ যা ইতিহাসের প্রতি এক গভীর অবহেলার প্রতিচ্ছবি।
শুধু তাই নয়, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই স্থানটিতে ক্ষমতাচ্যুত তৎকালীন আ.লীগের ফ্যাসিস্ট সরকার ‘শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন সেন্টার’ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়। জেলার বধ্যভূমি সংরক্ষণ কমিটিসহ গাইবান্ধার প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা এর বিরোধিতা করলে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। রীট-আপীল প্রক্রিয়াতে এই জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াও স্থগিত হয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের দাবি, শহিদের স্মৃতিবাহী এ ধরনের জায়গায় কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা ইতিহাসের প্রতি চরম অসম্মান।
এদিকে, একই চিত্র সদর উপজেলার কামারজানি এলাকাতেও। যেখানে একসময় ছিল আর্মি ক্যাম্প ও বধ্যভূমি, সেখানে এখন চলছে কাঠ চেরাইয়ের ব্যবসা। স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু দখল নয় শহিদের স্মৃতির প্রতি অবমাননাও।
পলাশবাড়ীর পশ্চিম রামচন্দ্রপুর বধ্যভূমির অবস্থা আরও করুণ। স্মৃতিস্তম্ভ থাকলেও তা অরক্ষিত, ভাঙচুরের শিকার। পুরো এলাকা ময়লা-আবর্জনায় ভরা, এমনকি গবাদিপশু রাখার জায়গা হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো সরকারি অনুষ্ঠান বা রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
গবেষক ও সচেতন মহলের মতে, বধ্যভূমি শুধু একটি জায়গা নয় এগুলো জাতির ইতিহাস, আত্মত্যাগ আর বেদনার নিঃশব্দ সাক্ষী। এসব স্থান সংরক্ষণে ব্যর্থতা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সত্য ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করা। শহিদ পরিবারের সদস্যরাও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রিয়জনের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে না পারা রাষ্ট্রের জন্য লজ্জার।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গাইবান্ধার বধ্যভূমিগুলো একসময় পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে। আর তখন ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হারিয়ে যাবে চিরতরে।
গাইবান্ধা বদ্ধভূমি সংরক্ষণ কমিটির সদস্য সচিব মোস্তফা মনিরুজ্জামান বলেন, ২০২২ সালে ৭ ফ্রেব্রুয়ারি গাইবান্ধার গণপূর্ত বিভাগ বদ্ধভূমি সংরক্ষণ করাসহ সেখানে স্মৃতিস্তম্ভ করবে বলে জানায়। কিন্তু তৎকালীন সরকার দলীয় একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বেদখল করে ভবন নির্মাণের পায়তারা করেছিল। শেষ পর্যন্ত তারা বাধার মুখে করতে না পরে তৎকালীন জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে একটি রিট করলে উদ্যোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে আমরাও আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করেছি।
এ সময় তিনি অবিলম্বে জেলার বেদখল হওয়া বদ্ধভূমিগুলো সরকারি উদ্যোগে উদ্ধার করাসহ, সংরক্ষণ ও জেলার ৪৩টি বদ্ধভূমিতে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান।
উল্লেখ্য, আজ সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে গাইবান্ধার পৌরপার্কের স্মৃতিস্তম্ভ থেকে আলোর মিছিল নিয়ে জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন বদ্ধভূমিতে যাওয়া যাবে গাইবান্ধার বদ্ধভূমি সংরক্ষণ কমিটি।
এছাড়া একই দিন বিকেল ৪টা থেকে পৌর পার্কের শহীদ মিনারে আলোচনা, গান-কবিতা ও আলোর মিছিলের উদ্যোগ রেখেছে গাইবান্ধার প্রগতিশীল রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসমুহ। তারা একই ব্যানারে এসব আয়োজন করবে।
আরকে