বিজ্ঞাপন

আলিফ বেঁচে ফিরলেও ফেরেননি তার মা

অ+
অ-
আলিফ বেঁচে ফিরলেও ফেরেননি তার মা

ঈদের ছুটি শেষে মায়ের সঙ্গে বাসে ঢাকায় আসছিল শিশু আলিফ মোল্লা (১০)। হঠাৎ তার জীবনে নেমে এলো কালো মেঘের ঘনঘটা। নদীতে বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় শিশু আলিফ বেঁচে ফিরলেও ফেরেনি তার একমাত্র গর্ভধারণী মা জ্যোৎস্না বেগম (৩৫)।

বিজ্ঞাপন

নিহত জ্যোৎস্না বেগম রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বড় চর বেনিনগর গ্রামের মান্নান মণ্ডলের স্ত্রী। জ্যোৎস্না বেগম ঢাকার বাইপাইলের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করতো। পাঁচ বছর ধরে জ্যোৎস্নার সঙ্গে তার স্বামীর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তখন থেকেই ছেলে আলিফকে নিয়ে ঢাকার বাইপাইলে থাকতো জ্যোৎস্না। আলিফ বাইপাইলে একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করতো।

সরেজমিনে নিহত জ্যোৎস্না বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। একমাত্র ছোট বোনকে হারিয়ে পাগলপ্রায় আসমা বেগম। একই অবস্থা নিহত জ্যোৎস্নার মা শাহেদা বেগমের। ছোট মেয়েকে হারিয়ে তিনিও পাগলপ্রায়, বার বার মেয়ের কথা ভেবে কান্না আর আহাজারি করছেন। তাদের কান্না ও আহাজারিতে ভারি হয়ে ওঠে এলাকার পরিবেশ। মেয়ের কথা ভেবে তিনি বার বার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

বাস ডুবির ঘটনায় বেঁচে ফেরা শিশু আলিফ বলে, আমি ও আমার মা বাসের মধ্যে পাশাপাশি বসেছিলাম। হঠাৎ বাস নদীতে পড়ে গেলে মা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেই। মানুষের চাপাচাপিতে মা বের হতে পারেনি। আমি তখন নদীতে ভাসতেছিলাম। তখন এক ব্যক্তি আমাকে গামছা দিয়ে টেনে তোলেন।

বিজ্ঞাপন

আলিফ আরও বলে, মা আমাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দেন, পরে আর তাকে আমি দেখিনি।

আলিফের নানি শাহেদা বেগম বলেন,  গত ১৯ মার্চ ঈদের ছুটিতে মা জ্যোৎস্না বেগমের সঙ্গে রাজবাড়ীতে এসেছিল আলিফ। ছুটি শেষে গত ২৫ মার্চ ঢাকার বাইপাইলে ফেরার কথা ছিল তাদের। এজন্য রাজবাড়ী বড়পুল থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের ৩টা ২০ মিনিটের ট্রিপে তাদের আমি উঠিয়ে দিয়ে আসি। দৌলতদিয়া ঘাট থেকে জ্যোৎস্না আমাকে ফোন দিয়ে বলে, ‘মা আমরা এখন ঘাটে’। এ কথা বলতে বলতেই ফোনের ওপাশ থেকে চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। তখন জ্যোৎস্না আমাকে বলে, ‘আম্মা বাস পদ্মায় পড়ে যাচ্ছে’। এরপর আর কোনো কথা শুনিনি।  আমার মেয়েটা ফোনে কথা বলতে বলতে নদীর মধ্যে চলে গেলো।

তিনি আরও বলেন, বাসের মধ্যে আমার মেয়ের সঙ্গে আমার নাতিও ছিল। আমার মেয়ে নাতিকে ধাক্কা দিয়ে জানালা দিয়ে বের করে দেয়। কিন্তু আমার মেয়ে বের হতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

আলিফের মামি মিতা বেগম বলেন, দৌলতদিয়ায় বাস ডুবে যাওয়ার ঘটনায় আলিফ বেঁচে ফিরলেও তার মা বেঁচে ফিরতে পারেনি। আলিফের এখন আপন বলতে কেউ রইলো না। আমরা আছি, কিন্তু আমরা থাকলেও তো কিছু করার নেই। আমরা তো ওর মা-বাবার মতো করতে পারবো না।

এদিকে দৌলতদিয়া বাস ডুবির ঘটনায় মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করে পরিবারকে বুঝিয়ে দিয়েছে প্রশাসন।

এ বিষয় জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, নিহতের প্রত্যেক পরিবারকে দাফন সম্পন্নের জন্য ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, আহতদের ১৫ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া, নিহতদের পরিবারকে স্থায়ীভাবে কিছু করা যায় কিনা সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলছি।

মীর সামসুজ্জামান সৌরভ/এএমকে

বিজ্ঞাপন