পাবনায় বাড়তে শুরু করেছে সংক্রামক রোগ হাম। আক্রান্ত বেশিরভাগই শিশু রোগী বলে জানা যাচ্ছে। ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। সব মিলে হাসপাতালটিতে ২৫ শিশু হাম ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এছাড়া গত তিন মাসে হাম আক্রান্তে দুজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে পাবনা জেনারেল হাসপাতালেরপরিসংখ্যান কর্মকর্তা সোহেল রানা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। হাম ওয়ার্ডে ২৫ জন রোগী ভর্তি আছে। বেশিরভাগই শিশু রোগী। তবে একজন ২২ বছর ও আরেকজন ৩৬ বছর বয়সী রোগী রয়েছে।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে রোগীতে ঠাসা। মেঝেতেও রোগী। হেঁটে যাওয়ার উপায় নেই। শিশু ওয়ার্ডে একেকটি শয্যায় দুইজন, তিনজন করে ভর্তি। এই ওয়ার্ডের বারান্দায় একটি কাঁচঘেরা কক্ষে হামে আক্রান্ত শিশুরা চিকিৎসাধীন। সেখানে একেকটি শয্যায় দুইজন করে। মেঝেতে চার শিশু চিকিৎসাধীন।
পাবনা সদর উপজেলার আশুতোষপুর গ্রামের গৃহবধূ স্মৃতি খাতুন হামে আক্রান্ত তার চার মাস বয়সী মেয়েকে গত ২৬ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। এখনও সুস্থ হয়নি।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, তার মেয়ের প্রথমে ঠান্ডা-জ্বর আসে। তারপর শরীরে, মুখে লাল গুটি গুটি বের হয়। অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে। বিছানায় ঘুমাতে পারে না। এমন অবস্থায় তারা হাসপাতালে এসে চিকিৎসকদের পরামর্শে ভর্তি করা হয়েছে। পরে পরীক্ষা করে হাম শনাক্ত কলেছেন চিকিৎসকরা।
একই উপজেলার হারিয়াবাড়িয়া গ্রামের সুফিয়া বেগম তার ৯ মাস বয়সী নাতি মাশরাফকে কোলে নিয়ে পায়চারী করছিলেন। তার কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন তিনি। সুফিয়া বেগম বলেন, গত শনিবার (২৮ মার্চ) তার নাতিকে হাসপাতালে ভর্তি করেছেন। এখানে ঠিকমতো চিকিৎসা পাওয়া যাচ্ছে না। এই কক্ষে নার্সদের ডেকেও পাওয়া যায় না। আর রুমটাও ঠিকমতো পরিষ্কার করা হচ্ছে না।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। হাসপাতালটিতে মোট ২৫ জন রোগী বর্তমানে ভর্তি আছে। এ পর্যন্ত হাম আক্রান্তে পাবনা জেলায় কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি। যারা ভর্তি হয়েছে তাদের মধ্যে মৃত্যুর আশঙ্কা নেই। সাধ্য অনুযায়ী চিকিৎসা চলছে। হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের মধ্যে কাঁচঘেরা একটি ঘরে হাম আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা চলছে।
বিজ্ঞাপন
পাবনার ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক রফিকুল হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, হাম ভাইরাসজনিত ছোঁয়াচে রোগ। শিশুসহ যেকোনো বয়সী মানুষের হাম হতে পারে। আপাতত ভর্তিকৃত রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ায় সংকট নেই।
রোগীর স্বজনেদের অভিযোগ বিষয়ে সহকারী পরিচালক বলেন, ৩৮ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন ভর্তি থাকে ২০০ রোগী। আমাদের তো ওই ৩৮ শয্যার ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এক্ষেত্রে কিছু সংকট থেকে যায়। তবে হামের জন্য নতুন করে একটি ওয়ার্ড চালুর কথা জানান তিনি। টিকা নেওয়ার পরও কী কারণে হঠাৎ করে হামের এমন প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, সে বিষয়টি স্বাস্থ্য বিভাগের তদন্ত করে দেখা দরকার বলে মনে করেন এই চিকিৎসক।
অপরদিকে পাবনা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ জেলায় চলতি বছরের তিন মাসে ৩৩ জনের শরীরে ভাইরাসটি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পাবনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সিনিয়র পরিসংখ্যান কর্মকর্তা অংশুপতি বিশ্বাস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, এ সময়ে ১০৪টি সন্দেহভাজন ঘটনার মধ্যে ৬৬টির ল্যাব পরীক্ষায় ৩৩টিতে হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, শুধু গত এক সপ্তাহেই নতুন তিনটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের বেশিরভাগই শিশু। তবে বয়স্করাও আক্রান্ত হতে পারে।
এদিকে হাম ভাইরাসের প্রকোপ দেখা দিলেও পাবনায় এ রোগের নমুনা পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে রোগ নির্ণয়ের জন্য পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে ঢাকার ওপর। দেশের বিভিন্নস্থান থেকে নমুনা পাঠানো হয় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে, যেখানে একমাত্র ল্যাবে হামের পরীক্ষা করা হয়। ফল পেতে সাত দিন সময় লাগে। এসময় রোগীদের আইসোলেশনে রেখে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যাতে সংক্রমণ ছড়িয়ে না পড়ে।
পাবনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রতি বছরেই হামের সংক্রমণ হয়ে থাকে। তবে এ বছর উদ্বেগজনকভাবে বেশি। তবে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দু-চারজন করে হামের রোগী ভর্তি হচ্ছে। যে কারণে জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৃথক আইসোলেশন সেন্টার করা হয়েছে। ৯ মাস বা তার কম বয়সী শিশু রোগীর সংখ্যা বেশি। যেহেতু ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়ার পরও নতুন করে হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এ বিষয়টি নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
রাকিব হাসনাত/আরকে
