‘নৌকা তেলে চলে, কিন্তু এখন তেলই নাই। ঈদের আগে বগুড়া থেকে তেল বেশি দামে নিয়ে আইসা নৌকার ট্রিপ মারছি। এখন তো তাও পাওয়া যায় না। এপারে তেলের দাম ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, তাও পাওয়া যায় না। তাই আর কি করমু, তেল নাই, মেশিনও চলে না। নৌকা চালামু কেমনে? আঙ্গরে তো কেউ দেহে না, এহন পেটও বন্ধ হয়ে থাকব।’
বিজ্ঞাপন
কথাগুলো আক্ষেপের সাথে বলছিলেন জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলার গুঠাইল ঘাটে দীর্ঘদিন ধরে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা রবিউল ইসলাম। ডিজেল সংকটে এখন নৌকা ঘাটে ভিড়িয়ে বসে থাকতে হচ্ছে এই মাঝিকে। জ্বালানি তেল না পাওয়ায় বন্ধ রেখেছে নৌকা, বন্ধ হয়েছে উপার্জনও।
শুধু এই মাঝিই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব তার মতো আরও পেশাজীবীদের ঘাড়ে পড়েছে। সড়ক পথের পাশাপাশি নৌপথেও দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট। বিশেষ করে চরাঞ্চলে ডিজেল সংকট ঘিরে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এতে জামালপুরের যমুনা নদী ঘেঁষা বিভিন্ন ঘাটে খেয়া নৌকা চলাচল এখন প্রায় বন্ধের পথে।
রোববার (২৯ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে ইসলামপুরের গুঠাইল ঘাট ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র। দীর্ঘ সারি করে নৌকা পারে বাঁধা রয়েছে। আর অলস সময় পার করছে মাঝিরা। সেই সাথে দুই একটি খেয়া নৌকা চলাচল করলেও ভাড়া বৃদ্ধিতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। আর চরের মানুষের একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা নৌকা সীমিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন

জানা গেছে, জেলার অন্যতম বড় গুঠাইল বাজার ঘাট থেকে নৌপথে গাইবান্ধা ও বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে ঈদুল ফিতরের আগ থেকেই তেলের সংকটে নৌ চলাচল সীমিত হয়ে পড়েছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন চরাঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ, এক জেলা থেকে নৌ পথে অন্য জেলায় যাওয়া যাত্রী, নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা।
গুঠাইল ঘাট থেকে সারিয়াকান্দি ঘাটে খেয়া নৌকা চালান মো. আমানুল্লাহ। তিনিও নৌকা বন্ধ রেখেছেন ডিজেলের জন্য। তিনি বলেন, প্রতি হাটের দিন আমাদের যাত্রী অনেক হয়। এছাড়া দিনে অন্তত দুইবার আমরা যাতায়াত করি। প্রতিবার গেলে ১৯ কেজি ডিজেল লাগে। কিন্তু তেল না থাকায় আমরা যেতে পারছি না। ১০০ টাকার তেল এখন ১৮০ টাকা দিয়েও পাওয়া যায় না।
ঘাটের শ্রমিক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে প্রতিদিন মালামাল লোড-আনলোড করতাম। এখন নৌকা না চলায় কাজও নেই। সারাদিন ঘাটে বসে থাকতে হচ্ছে।’
বিজ্ঞাপন
কথা হয় যমুনা নদীতে মাছ ধরতে যাওয়া শুভল নামের এক জেলের সাথে। তাকে ইঞ্জিন চালিত নৌকা করে প্রতিদিন নদীর গভীরে গিয়ে মাছ ধরতে হয়। তিনিও তেল না পেয়ে মাছ মারতে যাচ্ছেন না ৫ দিন হলো। তিনি বলেন, তেল ছাড়া তো আমাগো চলতেছে না। তেল ছাড়া নৌকা নিয়ে গেলে এমনও জায়গায় আটকে যাইগা আর বাড়িতে আসার মতো বুদ্ধি নাই। তেলের তো খুব সংকট। শুধু আমি বলতে না চরের মানুষের সবারই এক সমস্যা। তেল তো এখন স্বর্ণের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে।
এদিকে যাত্রীদের দুর্ভোগও বেড়েছে। বালাসি ঘাটে যাওয়ার জন্য অপেক্ষমান রিপন মিয়া বলেন, ‘সকাল থেকে বসে আছি, কিন্তু কোনো নৌকা নেই। শুনছি তেল না থাকায় নৌকা চলছে না। এতে বাড়ি যাওয়া নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছি।’
ঘাটটির ইজারাদারদের একজন মো. আইনাল বলেন, আমাদের এই ঘাটটি ইজারা নিতে লেগেছে দেড় কোটি টাকা। কিন্তু নদীতে পানি না থাকায় একটা ধাক্কা আমরা খেয়েছি। এবার আবার তেল না থাকায় নৌকার মাঝিরা বন্ধ করে দিচ্ছে। এই অবস্থা হলে আমরা একেবারে পথে বসে যাব। আমরা চাই দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হোক।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতোমধ্যে জ্বালানি তেল মজুদদারদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং বাজার মনিটরিং চালানো হচ্ছে।
অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ. কে. এম. আব্দুল্লাহ-বিন-রশিদ বলেন, ‘জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষি ও নৌ চলাচল সচল রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।’
জামালপুরের যমুনা নদীর বাম তীরের বাহাদুরাবাদ, মোরাদাবাদ, কুলকান্দি ও গুঠাইলসহ অন্তত নয়টি ঘাটে একই চিত্র দেখা গেছে। দ্রুত সংকট সমাধান না হলে চরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা আরও বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এসএইচএ
