বিজ্ঞাপন

তেল সংকট

বিআরটিএ অফিসে বেড়েছে চাপ, মোটরসাইকেল শোরুমে মন্দাভাব

অ+
অ-
বিআরটিএ অফিসে বেড়েছে চাপ, মোটরসাইকেল শোরুমে মন্দাভাব

ঈদের এক সপ্তাহ আগে মোটরসাইকেল কেনার কথা ছিল নজরুল ইসলামের। কিন্তু জ্বালানি তেলের সংকটের কথা শুনে সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন তিনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পছন্দের ২৫০ সিসি মোটরসাইকেল কিনবেন। তবে কবে নাগাদ জ্বালানি তেলের সংকট ঘুচবে আর কবেই বা তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে সড়কে নতুন মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটবেন, সেই প্রশ্ন তার মনে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (৩০ মার্চ) দুপুরে রংপুর নগরীর শাপলা চত্বর হাজীপাড়ায় সিএফ মোটো ব্রান্ডের পিসিডিটি মটরস্ শো-রুমে কথা হয় নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।

কাউনিয়া উপজেলার সারাই ইউনিয়নের মালিয়াটারী মধ্যপাড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম জানান, ঈদের চতুর্থ দিনে বিয়ে করেছেন তিনি। ইচ্ছে ছিল পছন্দ করে রাখা মোটরসাইকেল বিয়ের পরদিন কিনবেন। সেই মোটরসাইকেলে সহধর্মীনিকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে যাবেন দূরে। কিন্তু জ্বালানি তেলের সংকট আর ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় সেই সিদ্ধান্ত থমকে গেছে তার।

তিনি বলেন, বর্তমানে যেভাবে সারা দেশে জ্বালানি তেলের সংকট প্রকট হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল ছাড়া তো মোটরসাইকেল নিয়ে দূরে কোথাও যাওয়া সম্ভব হয়। আবার জ্বালানি তেল নিতে হলে মোটরসাইকেলের কাগজপত্রও সঙ্গে রাখতে হবে। যদি কষ্ট করে তেল সংগ্রহও করি কিন্তু প্রশাসন পথে গাড়ি আটক করলেও ছাড় পাবো না। উল্টো মামলাসহ জরিমানা কিংবা হয়রানির শিকার হতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে মোটরসাইকেল কিনবেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

নজরুল ইসলামের মতো অনেকেরই শখ পছন্দসই প্রিয় ব্রান্ডের মোটরসাইকেল কেনার। আবার কারও কারও প্রয়োজনের তাগিদেই কিনতে হবে দুই চাকার এই বাহন। কিন্তু জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে অনেক গ্রাহকই এখন মোটরসাইকেল কিনছেন না। বিক্রেতাদের দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির আগেও যেখানে দিনে ৭-৮টি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো তা এখন তা নেমে এসেছে শূন্যে।

মোটরসাইকেল চালক, গ্রাহক ও বিক্রেতাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ইরান-ইসরাইলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় দেশে দেখা দিয়েছে তীব্র জ্বালানি সংকট। যার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। আর মোটরসাইকেল শো-রুমগুলোতে ব্যবসায় নেমেছে মন্দাভাব।

গণমাধ্যমকর্মী শরিফুল ইসলাম প্রতিদিন পেশাগত কাজে শহর ও গ্রামগঞ্জে ছুটে বেড়ান। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তেল সংকটের কারণে কাজের গতি কিছুটা কমেছে। আগের মতো চাইলেও তিনি দূর-দূরান্তে যেতে পারছেন না। এর কারণ জানতে চাইলে শরিফুল ইসলাম বলেন, আগে তো ইচ্ছে মতো জ্বালানি তেল কেনা যেত। কিন্তু ২০০ টাকার বেশি তেল কেনার সুযোগ নেই। তাও আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পে অপেক্ষা করতে হবে। কখনো কখনো সেটাও পাওয়া যায় না। এখন তেল পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার।

বিজ্ঞাপন

সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত রংপুর নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়ে মেসার্স সিটি ফিলিং স্টেশন, শাপলা চত্বরে মেসার্স ইউনিক ট্রেডার্স ও স্টেশন রোডে ছালেক পাম্পসহ বেশ কয়েকটি পাম্পে শত শত মোটরসাইকেল ও গাড়ির লাইন দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে অনেক গ্রাহককে তেল না পেয়ে ফিরে যেতেও দেখা যায়।

যেসব স্টেশনে তেল সরবরাহ রয়েছে, সেগুলোতেও সীমিত পরিমাণে বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন গ্রাহককে সর্বোচ্চ ২০০ টাকার বেশি তেল দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। জ্বালানি তেলের সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অবিলম্বে তারা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার দাবি জানান।

এদিকে, ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহে শৃঙ্খলা ফেরানোসহ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন। রংপুরের বেশির ভাগ ফিলিং স্টেশনে পুলিশি নিরাপত্তার পাশাপাশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ট্যাগ অফিসার। জেলার তিনটি জ্বালানি তেল ডিপোতে মোতায়েন করা হয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি। এছাড়াও সড়কে শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধে বিশেষ করে অনিবন্ধিত মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

গতকাল নগরীর ডিসির মোড়, মেডিকেল মোড়, কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল, মর্ডাণ মোড়, সাতমাথা মোড় ও শাপলা চত্ত্বরে মেট্রোপলিটন পুলিশ বিশেষ চেকপোস্ট পরিচালনা করে। এসময় ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা এবং আইন অমান্য করায় ২১টি মোটরসাইকেল ও ৫টি যানবাহনে মামলা, ২৭টি যানবাহন আটক করা হয়।

এ পরিস্থিতিতে মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স বা রেজিস্ট্রেশনসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জন্য বিআরটিএ অফিসেও আগের চেয়ে কিছুটা বাড়তি ভিড় বেড়েছে। যদিও বেশির আবেদন আনলাইনে করতে হয় চালকদের।  

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ রংপুর অফিস সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসে মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশনের জন্য ৪৬৫ আবেদন করেছেন। এছাড়াও চারটি বড় গাড়ির আবেদনও রয়েছে। রমজান, ঈদ ও স্বাধীনতা দিবসের ছুটি থাকার পরও গত মাসের চেয়ে এ মাসে আবেদনের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

বিআরটিএ রংপুর অফিসের মোটরযান পরিদর্শক মো. মাহবুবার রহমান বলেন, প্রতি মাসে ৪০০ থেকে ৪৫০টি, আবার কখনো কখনো আবেদনের সংখ্যা বেশিও হয়। আনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া সহজ এবং ঝামেলামুক্ত হওয়ায় চালকদের আগ্রহ বেড়েছে। তাছাড়া এখন সচেতনতাও বেড়েছে। মানুষ মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহন নিয়ে সড়কে নেমে কাগজের বিড়ম্বনায় পড়তে চায় না।

এদিকে, দুপুরে বিআরটিএ রংপুর অফিস সংলগ্ন জেলা মডেল মসজিদ চত্বরে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদনকারীদের জটলা দেখা যায়। যাদের অনেকই তাদের কাঙ্ক্ষিত লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিতে এসেছেন। সেখানে আবেদনসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে উত্তীর্ণ চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্সের কাগজপত্র বিতরণ করা হয়।

রংপুর নগরীর শাপলা সিনেমা টকিজ সংলগ্ন সুজুকি ব্রান্ডের মমতাজ মটরস শো-রুমের ব্যবস্থাপক মারুফ আহমেদ হিরা বলেন, জ্বালানি তেল সংকটের প্রভাবে ব্যবসায় ধস নেমেছে। আগের মতো মোটরসাইকেল বিক্রি নেই বললেই চলে। গত দুই মাসের তুলনায় এ মাসে অর্ধেকে নেমেছে বিক্রি। জ্বালানি তেলের সংকটে সৃষ্ট এ পরিস্থিতি অব্যাহত  থাকলে শো-রুমে সার্ভিসিং ছাড়া বিক্রয় কার্যক্রম শুন্যে নামবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।  

কথা হয় নগরীর শাপলা চত্বর হাজীপাড়ায় সিএফ মোটো ব্রান্ডের পিসিডিটি মটরস্ শো-রুমের ব্যবস্থাপক তানবীর ফেরদৌসের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমাদের সিএফ মোটো ব্রান্ডের মোটরসাইকেল ২৫০ সিসি থেকে শুরু, এসব মোটরসাইকেলে তেল পরিমাণে বেশি লাগে। বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসায় মন্দাভাব যাচ্ছে।  

তিনি আরও বলেন, রমজানে এবং ঈদের আগে কিছু গ্রাহক মোটরসাইকেল কেনার জন্য বুকিং করেছিল। কিন্তু তেল সংকটের কারণে এখন বিক্রি কমেছে। অনেকে শোরুমে এসে খোঁজ নিচ্ছেন, কিন্তু কিনছেন না। চাহিদা মতো জ্বালানি না পাওয়া ও কাগজপত্রের ঝামেলার কারণে মোটরসাইকেল বিক্রি কিছুটা স্থবির হয়ে গেছে। গত মাসে যেখানে ১৪-১৫টি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে। এ মাসে ৭-এ দাঁড়িয়েছে সেই সংখ্যা।

রংপুরের জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান জানান, জ্বালানি তেল বিপণন পরিস্থিতি দেখাশোনার জন্য  ৮৫টি জ্বালানি তেল পাম্পে বিভিন্ন পর্যায়ের ৮৫ জন কর্মকর্তাকে ট্যাগ অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিদিন জ্বালানি তেল বিক্রি কার্যক্রম পরিচালনা তদারকি করবেন।

এমএএস