‘প্রতি ঈদে স্বাভাবিক মাসের তুলনায় মোটরসাইকেল বিক্রিতে ডাবল টার্গেট থাকে। তবে এই ঈদে টার্গেটের ৬০ শতাংশ বিক্রি হয়েছে। ঈদ চলে গেছে ১০ দিন হয়ে গেল। এ সময়ের মধ্যে মাত্র একটি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে।’
কথাগুলো বলছিলেন যশোর ভেনাস অটোর স্বত্বাধিকারী আবু শাহরিয়াদ মিতুল। হোন্ডা কোম্পানির মোটরসাইকেলের ডিলার তিনি। জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি তার। শুধু হোন্ডা নয়, এ জেলায় রানার, বাজাজ, সুজুকি, টিভিএসসহ ইঞ্জিনচালিত সকল মোটরসাইকেল বিক্রিতেই এক প্রকার ধস নেমেছে।
বিজ্ঞাপন
মিতুল বলেন, ঈদুল ফিতরে আমাদের ২০০টি মোটরসাইকেল বিক্রির টার্গেট ছিল। তবে হয়েছে মাত্র ১১০টি। প্রতি মাসে আমরা ৮০-১০০টি মোটরসাইকেল বিক্রি করি। তবে ঈদের পর শেষ ১০ দিনে মাত্র একটি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেল সার্ভিসিংয়েও ধস নেমেছে। আমরা নতুন মোটরসাইকেল বিক্রির পাশাপাশি সার্ভিসিং করি। তবে তেলের অভাবে দূর-দূরান্ত থেকে মোটরসাইকেল না আসায় মিস্ত্রিদের পাশাপাশি আমরাও সংকটে আছি।
টিভিএস ও সুজুকি ব্র্যান্ডের ডিলার নিউ যশোর ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী শরিফুল আলম ভুলু বলেন, জ্বালানি তেল সঠিকভাবে সরবরাহ না থাকায় মোটরসাইকেল বিক্রিতে প্রভাব পড়েছে। ২০০ টাকার তেল কিনতে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে ৩০০ টাকার জোন (শ্রমিক) লাগার মতো পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। যে কারণে মোটরসাইকেল ক্রয়ে মানুষের অনীহা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মোটরসাইকেল চালক কামরুজ্জামান বিদ্যুৎ বলেন, যশোরের পাম্পগুলোতে যেভাবে তেল দিচ্ছে মনে হচ্ছে যে কোনো সময় বন্ধ করে দেবে। এ কারণে বাইকাররা ট্যাংকি সব সময় ফুল রাখার চেষ্টা করছেন। বার বার পাম্পে যাওয়ার কারণে ভিড় বাড়ছে। ফলে দৈনন্দিন যাদের তেল দরকার তারা পাচ্ছি না।
মোটরসাইকেল মেকানিক ফসিয়ার রহমান জানান, আগে প্রতিদিন এক-দেড় হাজার টাকার কাজ করতাম। তবে তেল না পাওয়ায় বাইকাররা আগের মতো মোটরসাইকেল নিয়ে বের হচ্ছেন না। ফলে আমাদের কাজ ব্যাপকহারে কমে গেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে দোকানে কর্মচারীদের বেতনও উঠবে না।
এদিকে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতায় যশোরে ইলেকট্রিক বাইকের দিকে ঝুঁকছেন বাইকাররা। বিশেষ করে যারা দৈনন্দিন যাতায়াত বা পেশাগত কাজে নিয়মিত তেলনির্ভর, তাদের জন্য খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে কম খরচ, সহজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব হওয়ায় ইলেকট্রিক বাইক এখন হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় বিকল্প।
বিজ্ঞাপন
যশোর শহরসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, নতুন করে অনেকেই ইলেকট্রিক বাইক কিনছেন বা ব্যবহারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। স্থানীয় কয়েকজন বাইকার জানান, পেট্রোল না পাওয়ার কারণে মোটরসাইকেল নিয়ে ঝামেলার মধ্যে রয়েছেন। সেক্ষেত্রে ইলেকট্রিক বাইকাররা ঘরে বসেই চার্জ দিয়ে ঝামেলামুক্ত থাকছেন।
পালবাড়ি এলাকার ইমাম হাসান নাওহীদ বলেন, মোটরসাইকেলের তেল কিনতে গিয়ে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছিলাম। পরে ইলেকট্রিক বাইক কিনে সেই ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়েছি।
টেইলজি যশোর শোরুমের ম্যানেজার এহসানুল ফারুকি আবির বলেন, তেল না পাওয়ায় মানুষ ইলেকট্রিক বাইকে ঝুঁকেছে। প্রতিমাসে আমাদের ১০-১৫টি ইলেকট্রিক বাইক বিক্রি হতো। তবে মার্চ মাসে আমাদের ২৫-৩০টি বাইক বিক্রি হয়েছে।
রানার গ্রুপের বোর্ড অব ডিরেক্টর জহুরুল আলম বলেন, আমরা হিরো ও রানার ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল বিক্রি করে থাকি। পাশাপাশি আমরা ইলেকট্রিক বাইক ইয়াদিয়ার ডিলার। বর্তমানে জ্বালানি তেলের অস্থিরতায় হিরো ও রানার মোটরসাইকেল বিক্রিতে টার্গেট পূরণ হয়নি। তবে ইলেকট্রিক বাইকের বেচাবিক্রি ব্যাপক হারে বেড়েছে।
তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন ঝঞ্ঝাটমুক্ত থাকতে চায়। ইঞ্জিনচালিত মোটরসাইকেলের তুলনায় ইলেকট্রিক বাইকে ঝামেলা কম। এ কারণে এখন মানুষ ই-বাইকে ঝুঁকছে।
বিআরটিএ যশোর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেবাশীষ বিশ্বাস জানান, মোটরসাইকেলে কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া তেল পাবেন না- এমন কোনো নির্দেশনা এখনো পাইনি। তবে যেটা শোনা যাচ্ছে সেটা বাস্তবায়নে সময় লাগবে। এখন যাদের পরীক্ষা হচ্ছে তাদের আরও আগে আবেদন করা।
তিনি জানান, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া তেল দেওয়া হবে না- এমন কথা শুনে মোটরসাইকেল এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন বেড়েছে। গত তিন দিনে (রোববার থেকে মঙ্গলবার) রেজিস্ট্রেশনের আবেদন পড়েছে ২২৭টি। ড্রাইভিং লাইসেন্সে লার্নারের আবেদন পড়েছে ১৪৫টি।
দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে আমরা একাধিক অভিযান চালিয়েছি। সড়কে গাড়ির বৈধ কাগজ ও বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। লাইসেন্সবিহীন গাড়ি ও চালকদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।
আরএআর
