জ্বালানি তেলের সংকটে সারাদেশের মতো পঞ্চগড়েও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মিলছে প্রয়োজনীয় তেল। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে মোটরসাইকেল বিক্রিতে। ক্রেতারা নতুন মোটরসাইকেল কেনায় আগ্রহ হারাচ্ছেন বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন কোম্পানির মোটরসাইকেল শোরুমগুলোতে বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) জেলার বিভিন্ন মোটরসাইকেল বিক্রির শোরুম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে এসব তথ্য জানা গেছে।
পঞ্চগড় শহরের হোন্ডা শোরুমের ম্যানেজার রঞ্জন রায় বলেন, বর্তমানে বেচাকেনার অবস্থা খুবই খারাপ। আগে সপ্তাহে ১২-১৩টি মোটরসাইকেল বিক্রি হতো। প্রতিদিন দুই-একটি গাড়ি বিক্রি হতো। কিন্তু তেলের সংকটের কারণে এখন কোনো বিক্রি নেই। ঈদের পর গত ১০ দিনে মাত্র দুটি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে।
রঞ্জন রায় আরও বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শোরুম বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। কারণ স্টাফদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ বিক্রি না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের মুখে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
হোন্ডা শোরুমের সিনিয়র সেলস ম্যানেজার শাকিল ফেরদৌস বলেন, গতকাল একজন ক্রেতা ক্যাশ টাকা নিয়ে মোটরসাইকেল কিনতে এসেছিলেন। কিন্তু শোরুমে জ্বালানি না থাকায় মোটরসাইকেল রেডি করে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ক্রেতা ফিরে যান। তিনি বলেন, তেলের সংকটের কারণে আমরা গাড়ি বিক্রি করতে পারছি না। যত দ্রুত সম্ভব এই সংকট কাটলে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারব।
হোন্ডা শোরুমের সার্ভিস সেন্টারের কর্মী শাহানশাহ বলেন, তেলের সংকটের কারণে সার্ভিস সেন্টারেও কাজ কমে গেছে। আগে প্রতিদিন ৫০-৬০টি মোটরসাইকেল সার্ভিস দেওয়া হতো। এখন তা নেমে এসেছে ৮ থেকে ১২টিতে। তিনি বলেন, কাস্টমারদের জিজ্ঞেস করলে তারা জানান, তেল না পাওয়ায় মোটরসাইকেল নিয়ে বের হতে পারছেন না। বিশেষ করে দূরদূরান্ত থেকে আসা গ্রাহকরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
পঞ্চগড় শহরের প্রভা এন্টারপ্রাইজ নামে ইয়ামাহা শোরুমের ম্যানেজার রবিউল ইসলাম বলেন, গত বছর তারা ৮০টির বেশি মোটরসাইকেল বিক্রি করেছিলেন। চলতি বছর ঈদের আগে পর্যন্ত প্রায় ৬০টি বিক্রি হয়েছে। কিন্তু ঈদের পর থেকে এখন পর্যন্ত একটি মোটরসাইকেলও বিক্রি হয়নি।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ক্রেতারা ভয় পাচ্ছেন। অনেকেই বলছেন, রাস্তায় তেল শেষ হয়ে গেলে বিপদ হবে। ফলে সার্ভিস করতেও কেউ আসছেন না। সরকারি চাকরিজীবীসহ অনেক ক্রেতা লাইনে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করতে না চেয়ে মোটরসাইকেল বের করাই বন্ধ করে দিয়েছেন।
শোরুমের সহকারী ম্যানেজার সুজন বলেন, ঈদের আগে তারা সপ্তাহে ৮-১০টি মোটরসাইকেল বিক্রি করতেন। কিন্তু ঈদের পর থেকে এখন পর্যন্ত দুইটি মোটরসাইকেল বিক্রি হয়েছে।
কমলেশ ট্রেডার্সের হিরো শোরুমের ম্যানেজার হাবিবুর রহমান বলেন, তেলের সংকটের কারণে মোটরসাইকেল কেনাবেচা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঈদের আগে ভালো বিক্রি হলেও এখন নতুন মডেলের মোটরসাইকেলে অফার থাকার পরও বিক্রি হচ্ছে না। তিনি বলেন, তেল থাকলে অবশ্যই গাড়ি বিক্রি করতে পারব। কিন্তু এখন কাস্টমারই আসছে না।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) পঞ্চগড় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত জেলায় নিবন্ধিত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ১৮ হাজার ৩০৬টি।
পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এসএম ইমাম রাজী টুলু বলেন, জেলায় মোট ২৮টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। বর্তমানে মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং চালকের হেলমেট না থাকলে পেট্রোল বা অকটেন দেওয়া হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আগামী ২ এপ্রিল থেকে ফুয়েল কার্ড ছাড়া জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে না। জ্বালানি তেল বিক্রির কার্যক্রম তদারকির জন্য ৪১ জন ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা প্রতিদিন ফিলিং স্টেশনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন।
নুর হাসান/এসএইচএ
