নড়াইলের কালিয়ার মুন্নি বেগম। বুধবার (১ এপ্রিল) খুলনা শিশু হাসপাতালে টায়ফয়েড আক্রান্ত আট বছরের মেয়ে সাবিহা ইসলামকে নিয়ে এসেছেন তিনি। সঙ্গে রয়েছে তার ছেলেও। আউটডোরে ডাক্তার দেখানোর পর জরুরি ভিত্তিতে তার মেয়েকে ভর্তির জন্য বলা হয়েছে। তবে বেড সংকটে ভর্তি করাতে না পেরে দুই সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলার সিড়ির বারান্দার অবস্থান নেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
মুন্নি বেগম ঢাকা পোস্টকে বলেন, মেয়ের জ্বর ছিল। পরবর্তীতে কালিয়ার হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে টায়ফয়েড জ্বর হয়েছে বলে জানানো হয়। আজ (বুধবার) সকাল ৭টার দিকে শিশু হাসপাতালে এসেছি। ডাক্তার হাসপাতালে ভর্তি করাতে বলেছেন। ওর বাবা সিটের জন্য দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ব্যবস্থা করতে পারেনি।
সিড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলা থেকে নিউমোনিয়া আক্রান্ত ছেলেকে নিয়ে নামছিলেন দৌলতপুরের বিথী বেগম। তার সন্তানকেও বলা হয়েছে ভর্তি হওয়ার জন্য। তারও একই অবস্থা। হাসপাতালের বেডের জন্য অপেক্ষা করছেন তিনি। বিথী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ছেলের এক সপ্তাহ ধরে কাশি আর ঠান্ডা-গরম লেগেছে। আজ ডাক্তার দেখানো হলে তিনি হাসপাতালে ভর্তি করানোর কথা বলেছেন। কিন্তু বেড পাইনি।

শুধু খুলনা শিশু হাসপাতালই নয়, বেড সংকট রয়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডেও। শিশু ওয়ার্ডে ধারণ ক্ষমতার চারগুণ রোগী বেশি রয়েছে। ৪৮টি বেডের বিপরীতে রোগীর সংখ্যা দুই শতাধিক। ফলে বারান্দার ফ্লোরে অবস্থান নিতে হচ্ছে তাদের। বেড সংকটে বিপাকে পড়ছেন শিশু রোগী ও তাদের স্বজনেরা। একই অবস্থান উপজেলা পর্যায়েও।
বিজ্ঞাপন
গেল এক সপ্তাহে খুলনায় বেড়েছে হাম, নিউমোনিয়া, টায়ফয়েড ও ডায়রিয়াসহ ঠান্ডাজনিত রোগী। আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি।
খুলনা শিশু হাসপাতালে ভর্তি নিউমোনিয়া আক্রান্ত নাতি ইব্রাহীমকে কোলে নিয়ে নূরজামাল বলেন, গত শুক্রবার নাতিকে ভর্তি করিয়েছি। প্রথমে বেড পাইনি। পরবর্তীতে অনেক চেষ্টা করে পেয়েছি। এখন অনেকটা সুস্থ। বৃহস্পতিবার তাকে ছাড়পত্র দেবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
দৌলতপুর দেয়ানা এলাকার বাসিন্দা উর্মি খাতুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, সাত মাসের ছেলে আরফান নিউমোনিয়া আক্রান্ত। অনেক কাশি ছিল তার। চার দিন হলো ভর্তি করা হয়েছে। প্রথম দিন বেড পাইনি। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। পরেরদিন এই ওয়ার্ডে বেড পেয়েছি। এখানে বেডের সংকট রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসকরা বলছেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে হাম, নিউমোনিয়া, টায়ফয়েড ও ডায়রিয়াসহ ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রোগীর তুলনায় বেডের সংখ্যা কম। যে কারণে সবাইকে বেড দেওয়া সম্ভব নয়।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সৈয়েদা রুখশানা পারভীন বলেন, হাসপাতালে ৪৮টি শয্যা রয়েছে। আর ভর্তি রয়েছে প্রায় ২০০ শিশু। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি। এরমধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রয়েছে ১৫ জন। বাকিরা জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত।
খুলনা শিশু হাসপাতালে ভর্তি রোগীর চেয়ে বহির্বিভাগে শিশু রোগী বেশি আসছে। যার বেশিরভাগই ঠান্ডাজনিত রোগী।
খুলনা শিশু হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. প্রদীপ দেবনাথ ঢাকা পোস্টকে বলেন, পদ্মার এপারে সর্ববৃহৎ শিশু হাসপাতাল এটি। এটি ২৭৫ বেডের হাসপাতাল। এখানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী আসছে। পাশাপাশি ভর্তি রোগী সবসময় পরিপূর্ণ থাকে। ছাড়পত্র দিলে পরবর্তীতেই সেটি পূরণ হয়ে যায়। জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া, ডাইরিয়া, টাইফয়েড জ্বরসহ নবজাতকদের ইনফেকশন জাতীয় নানা সমস্যা থাকে এমন শিশুদের ভর্তি করা হয়।
তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্যি সকালে যে রোগীগুলোর ছুটি হয়, তার পরপরই আর বেড দিতে পারি না। যার কারণে অন্যান্য হাসপাতালে রেফার্ড করতে হয়। বর্তমানে হামের প্রকোপও বেড়ে গেছে। কিছু হামের রোগী পাচ্ছি। কিন্তু এখানে ভর্তি রাখতে পারি না। যার কারণে আমরা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিরেরডাঙ্গায় পাঠিয়ে দিচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তন হওয়ার পরপরই বর্তমানে সিজনাল রোগ জ্বর, সর্দি, কাশি, নিউমোনিয়া ও ডাইরিয়া রোগী বেশি আসছে।
মোহাম্মদ মিলন/এএমকে
