পটুয়াখালীতে বাড়ছে ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা, আর রোগীদের বড় অংশই শিশু। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি ৪৬ জনের মধ্যে ৩৬ জনই শিশু, যা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও চিকিৎসকদের মধ্যে। এর সঙ্গে হামের জটিলতা যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দুপুরে সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি অধিকাংশই শিশু। শয্যা সংকটের কারণে অনেক ক্ষেত্রে একই বেডে একাধিক শিশুকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে হালকা জ্বর ও পাতলা পায়খানা দিয়ে উপসর্গ শুরু হলেও পরে তা ডায়রিয়ায় রূপ নিচ্ছে। অনেক শিশু ৩ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত অসুস্থ থাকলেও প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে আসতে হচ্ছে।
রাঙ্গাবালী উপজেলা থেকে ১ বছর ২ মাস বয়সী সন্তান মুনতাহাকে নিয়ে আসা মা মীম আক্তার বলেন, আজ ১৪ দিন ধরে আমার সন্তান ডায়েরিয়ায় আক্রান্ত। শুরুতে স্থানীয় ক্লিনিকে ব্যক্তিগতভাবে দেখিয়েছি, সেখানে বিভিন্ন এন্টিবায়োটিক ওষুধ দিলেও সুস্থ হয়নি। এরপর ৩ দিন ধরে এই হাসপাতালে আছি। এখনও আমার সন্তান পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।
বিজ্ঞাপন
আরেক শিশু সুলাইমানের মা জয়নব বেগম বলেন, আমার বাচ্চা আজ ৫ দিন ধরে অসুস্থ, হাসপাতালে নিয়ে আসছি। স্যালাইন ও ইনজেকশন দিচ্ছে। কিন্তু যে আশায় এখানে নিয়ে এসেছিলাম তার কিছুই হয়নি, এখনও সুস্থ হয়নি।
সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের খারিজ্জমা থেকে আসা সাড়ে ৬ মাস বয়সী শিশু ফয়সাল আহাম্মেদের মা নাইমা আক্তার বলেন, ‘প্রথমে ওর পায়খানা একটু পাতলা হয়েছিল, পরে প্রাইভেটভাবে ডাক্তার দেখাইছি, সে বলেছে ঠান্ডা লেগে এমনটা হইছে। সুস্থ না হওয়ায় পরে আরেক ডাক্তার দেখাইছি। সে বলছে, ওর একসাথে ডায়েরিয়া ও নিউমোনিয়া হয়েছে হাসপাতালে ভর্তি করান। গত তিনদিন ধরে এখানে কিন্তু কোনো পরিবর্তন নাই।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তন, পানি দূষণ, ছয় মাসের আগেই শিশুদের বাড়তি খাবার খাওয়ানো এবং সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব—সব মিলিয়ে বাড়ছে ডায়রিয়ার ঝুঁকি।
বিজ্ঞাপন
পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. সিদ্ধার্থ শংকর দাস বলেন, ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের শুধুমাত্র মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো উচিৎ। কিন্তু দেখা যাচ্ছে- অনেকেই ৬ মাসের আগেই বিভিন্ন বাড়তি খাবার খাওয়াচ্ছেন। এসব কারণে ডায়েরিয়ার প্রকোপটা বাড়ছে। আমরা সবসময়ই বলি, ৬ মাস বয়সের আগে শিশুকে বাড়তি খাবার নয়, ছয় মাস পূর্ণ হলেই কেবল বাড়তি খাবার খাওয়াতে হবে। এছাড়াও আবহাওয়ার পরিবর্তন ও যেসব জায়গা থেকে পানি ব্যবহার করা হচ্ছে- তা তেমন স্বাস্থ্যকর নয়। একারণেও শিশুরা ডায়েরি আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি হামের উপসর্গ দেখা দিলে শিশুর যত্ন নিতে হবে, এতে ডায়েরিয়া দেখা দিলে স্বাস্থ্যসম্মত তরল খাবার ও স্যালাইন খাওয়াতে হবে। তাছাড়াও এ মৌসুমে বাংলাদেশে ডায়রিয়ার প্রকোপটা একটু বৃদ্ধি পায়।
পটুয়াখালী ২৬০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা বলেন, বর্তমানে হামের একটি প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে। হামের কমপ্লিকেশনেও শিশুরা অনেকেই ডায়েরিয়া আক্রান্ত হচ্ছে।
শিশুদের পাশাপাশি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন পূর্ণবয়স্ক রোগীরাও। তাদের অভিযোগ, বেড সংকটের কারণে অনেকেই মেঝেতে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হওয়া বদরপুর ইউনিয়নের খলিসাখালী গ্রামের বাসিন্দা মুজিবুর রহমান হাওলাদার (৫৭) বলেন, শুরুতে অল্প অল্প পাতলা পায়খানা ছিল, গত পরশুদিন থেকে অনেক বেড়ে গেছে। যেমন বমি, তেমন পাতলা পায়খানা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখানে বেড পাইনি।
ডায়রিয়া আক্রান্ত বাবা লতিফ মৃধাকে নিয়ে হাসপাতালে আসা নুপুর বেগম বলেন, এখানে আসার পর কোনো বেড না পেয়ে মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছি। এখান থেকে স্যালাইন দেওয়ার পরে আমাদের বাইরে থেকেও কিনতে হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ২৫০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন প্রায় ৮০০ রোগী। ডায়রিয়া ওয়ার্ডে মাত্র ২০টি শয্যার বিপরীতে চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় অর্ধশতাধিক রোগী। জনবল সংকট, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজা বলেন, আমাদের ডায়রিয়া ওয়ার্ডটা খুবই একটা ছোট এরিয়া। এখানে মাত্র ২০টি শয্যা আছে। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৪৬ জন রোগী। এ কারণেই শিশুরা অনেকে একই বেডে ২ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। কেউ কেউ বাধ্য হয়ে মেঝেতেই চিকিৎসা নিচ্ছে।
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুর রহমান মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমানে আগের থেকে একটু বাড়ছে ডায়রিয়া আক্রান্তের সংখ্যা। তবে পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলমান রয়েছে।
সোহাইব মাকসুদ নুরনবী/এসএইচএ
