ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের সরকারপাড়া এলাকার মো. বাবুল (৩৮) দীর্ঘ ৯ বছর ধরে অসুস্থ। একসময় নিজের পরিশ্রমে পরিবারকে আগলে রাখতেন তিনি। এখন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালে শুয়ে আছেন। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট, কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। অসুস্থ হওয়ার পর থেকে তার পরিবারে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার।
বিজ্ঞাপন
টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে বাবুলের চিকিৎসা। তার দুই স্কুলপড়ুয়া মেয়ে বাবার শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে প্রতিদিনই কাঁদে। মেয়েদের কান্না, স্ত্রীর অসহায় চাহনি এবং বৃদ্ধা মায়ের বুকফাটা বিলাপ—সবকিছু মিলিয়ে পরিবারটি আজ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
ঠাকুরগাঁও পৌর শহরের সরকারপাড়া এলাকার মৃত আব্দুর রহমান ওরফে ভেলু ও তুলন বেগম দম্পতির ছেলে বাবুল একসময় স্থানীয়ভাবে ছোট ব্যবসা করতেন। সংসার সচ্ছল ছিল না, তবে পাঁচ সদস্যের পরিবারে ছিল হাসি-খুশির পরিবেশ। কিন্তু নয় বছর আগে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে সবকিছু। রোগ, চিকিৎসাব্যয়—সব মিলিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে সংসারে।
দিনাজপুর ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে যা ছিল সব বিক্রি করে ফেলেছে দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী বাবুলের পরিবার। বর্তমানে তার হার্টের কার্যক্ষমতা মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা জীবন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার ইঙ্গিত। চিকিৎসকরা দ্রুত উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে প্রয়োজন প্রায় ১০ লাখ টাকা, যা পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব।
বিজ্ঞাপন
বাবুলের স্ত্রী মুক্তা আক্তারের চোখে ঘুম নেই। স্থানীয় একটি এনজিওতে কাজ করেন। সেই সামান্য আয়ে কোনোমতে চলে পাঁচ সদস্যের সংসার, স্বামীর ওষুধ এবং দুই মেয়ের পড়াশোনা। কখনো সংসারে খেয়ে বা না খেয়ে চললেও স্বামীর চিকিৎসা থামিয়ে দেননি তিনি। কিন্তু এখন আর তার পক্ষে সম্ভব নয়। মুক্তা আক্তারের চোখেও আজ শুধু একটাই আকুতি, আমার স্বামীকে বাঁচাতে সাহায্য করুন। আমার মেয়েদের ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে ডুবে না যায়।
হাসপাতালের কোণায় বসে কাঁদছিলেন বাবুলের বৃদ্ধা মা তুলনা বেগম। বয়সের কারণে কণ্ঠটাই ভেঙে আসে। কথাও ঠিকমতো বলতে পারেন না। তবুও বলেন, আমার ছেলেটাকে বাঁচান বাবা। ও ছাড়া আমি বাঁচব না। আল্লাহর দোহাই লাগে, আমার ছেলেটাকে বাঁচান।
প্রতিবেশী নূর আলম বলেন, বাবুল আমাদের এলাকার ছেলে। নিজের কষ্ট নিজের মধ্যে রাখত সব সময়। আজ তাকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে হৃদয়টা ভেঙে যায়। ওর চিকিৎসা বন্ধ হয়ে গেলে বেচারা বাঁচবে না। আমরা নিজেরা যতটুকু পারছি করছি, কিন্তু চিকিৎসার খরচ এত বেশি যে আমাদের পক্ষে সম্ভব না। সমাজের মানুষ সাহায্যের হাত বাড়ালে বাবুল বেঁচে যাবে।
বিজ্ঞাপন
সাজ্জাত হোসেন বলেন, নয় বছর ধরে অসুস্থ হয়ে আছে মানুষটা। কখনো কারও কাছে হাত পাতেনি। নিজের মান-সম্মান নিয়ে চলত। আজ টাকার অভাবে তার চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কী হতে পারে। আমরা সবাই চাই মানুষটা বাঁচুক। তার দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ যেন অন্ধকারে না ডুবে যায়।
সাবিনা বেগম বলেন, বাবুলের মেয়ে-স্ত্রী ও বৃদ্ধ মায়ের অবস্থা দেখলে মনটা কেঁদে ওঠে। মেয়েরা বাবার হাত ধরে কাঁদে। এমন দৃশ্য দেখে আমাদেরও চোখে পানি আসে। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, কেউ না কেউ যেন এগিয়ে আসে। একটু সাহায্য করলে একটি পরিবার রক্ষা পাবে।
ঠাকুরগাঁও জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কার্ডিওলজি কনসালটেন্ট ডা. মো. রেজাউল করিম শিপলু বলেন, বাবুলের হার্টের কার্যক্ষমতা বর্তমানে স্বাভাবিকের তুলনায় খুব কম। তার হার্টের কার্যক্ষমতা মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। সঙ্গে আছে ভালভের জটিলতা। এই ধরনের রোগীর দ্রুত উন্নত চিকিৎসা খুব জরুরি। প্রয়োজনমতো ওষুধ, মনিটরিং ও উন্নত চিকিৎসা পেলে তার অবস্থা অনেকটা উন্নতি করতে পারে। তবে চিকিৎসা ব্যয়বহুল রয়েছে।
রেদওয়ান মিলন/এএমকে
