বিজ্ঞাপন

নাব্যতা হ্রাস ও বৈদ্যুতিক ফাঁদে মাছ নিধন

প্রবল সংকটে গাইবান্ধার জেলেদের জীবন-জীবিকা

অ+
অ-
প্রবল সংকটে গাইবান্ধার জেলেদের জীবন-জীবিকা

উত্তরের জেলা গাইবান্ধার ওপর দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও তিস্তা নদী একসময় ছিল জেলেদের জীবিকার প্রধান ভরসা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব নদীর নাব্যতা কমে ভরাট হয়ে পড়ছে। বছরের বেশিরভাগ সময়ই শুকিয়ে থাকছে নদীর বুক। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাটারিচালিত বৈদ্যুতিক ফাঁদ ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ নিধন। ফলে নদীর প্রাকৃতিক মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একদিকে নদীর প্রাণশক্তি হারানো, অন্যদিকে অবৈধ পদ্ধতিতে মাছ ধরা—এই দুইয়ের চাপে চরম সংকটে পড়েছে গাইবান্ধার জেলেদের জীবন-জীবিকা। দায়িত্বশীল সংশ্লিষ্টদের অনিয়ম আর উদাসিনতায় এর প্রকট তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী জেলেদের।

বিজ্ঞাপন

জেলা মৎস্য ও সমবায় অফিস সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২২ হাজার ৩২ জন। এর বাইরেও অনেক জেলে আছে বলে জানা গেছে। তবে, জেলায় মৌসুমি জেলের সংখ্যা জানাতে পারেনি জেলা কিংবা সদর উপজেলা মৎস্য অফিস। এ ছাড়া, এখানে মৎসজীবী সমিতি রয়েছে ১৫৮টি। এসব সমিতিতে জেলে সদস্যের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৪৯ জন।

দপ্তরের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী জেলায় মাছের উৎপাদনে চাহিদার থেকে ঘাটতি ১০ হাজার ১৩৬ মেট্রিক টন মাছ। চাহিদা ৫২ হাজার ৩৭২ মেট্রিক টন হলেও উৎপাদন হচ্ছে কেবল ৪২ হাজার ২৩৬ মেট্রিক টন মাছ। যা জেলার ৬টি নদী, বিল, সরকারি-বেসরকারি পুকুর, জলাশয় ও প্লাবন ভূমিসহ অন্যান্য জলাশয় থেকে আহরণ হয়।

সরেজমিনে বৃহস্পতিবার সকালে জেলার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাটে মাছের বাজারে গিয়ে দেখা যায়, একে একে ছোট বড় বিভিন্ন নৌকা ছুটে আসছে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের দিকে। প্রতিটি নৌকায় একাধিক জেলে। যাদের প্রত্যেকের চোখে মুখে উচ্ছ্বাসের বদলে হতাশার ছাপ। নৌকা ভেড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বড় বড় থালায় মাছ নিয়ে হাজির হচ্ছেন হাক-ডাকের স্থানে। তবে, আগের মত নেই মানুষের উপস্থিতি কিংবা মাছের পরিমাণও।

বিজ্ঞাপন

সেখান থেকে দূরদৃষ্টিতে তাকাতেই চোখে পড়ে নদীর মাঝেই বালিচরের বিশাল এলাকা। চাষাবাদ হয়েছে অনেক খানে। ভরা বর্ষায় যেখানে বিশাল জলরাশি, সেখানে শুষ্ক মওসুমে বদলেছে সবকিছুই। এখানে নাব্য সংকটে বদলেছে জীবিকা, পাল্টে গেছে হাজারো মানুষের প্রতিদিনের লড়াই পদ্ধতিও। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নভেম্বর থেকে এপ্রিলে ব্রহ্মপুত্রের জলস্রোত কমে আসে। জেগে ওঠে অসংখ্য চর। এই সময়ে ব্রহ্মপুত্রের তলপেটে কেবল বয়ে চলে মৃদু স্রোতো ধারা।

ব্রহ্মপুত্র পাড়ের জেলেরা জানান, গেল কয়েক বছর থেকেই ব্যাটারির সাহায্যে কারেন্ট তৈরি করে নদীতে শতাধিক মানুষ মাছ ধরছেন। তারা এক কেজি মাছ ধরতে পারলেও মেরে ফেলছেন ১০০ কেজি। ওই কারেন্ট পদ্ধতিতে ডিমপাড়া মাছ, সদ্যফাটা রেনু, ছোট ছোট পোনা মাছসহ যাবতীয় পোকা পর্যন্ত মরে যাচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, বারবার জানানোর পরেও মৎস্য অফিসের কর্তারা এ ব্যাপারে উদাসিন। তারা কোনো ধরণের পদক্ষেপ নেন না। এ ছাড়া, এখানকার নৌপুলিশ নদীতে কারেন্ট শট দিয়ে মাছ ধরা লোকদের থেকে নিয়মিত টাকা নেন। ফলে অবৈধভাবে মাছ ধরাদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছ। আর নদীতে কমছে মাছের পরিমাণ। যার প্রভাব পড়ছে এখানকার প্রকৃত জেলদেরে ওপর। এতে বাধ্য হয়ে কেউ কেউ পেশা বদল করছেন। কেউ মাছের ব্যবসা করলেও ছেড়েছেন জাল। তবে বৃহত্তরও একটি অংশ বাপ-দাদার পেশা আঁকড়ে ধরেই করছেন জীর্ণশীর্ণ বসবাস।

বিজ্ঞাপন

গাইবান্ধা ইলিশ জোনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া সত্বেও এই জেলাকে করা হয়নি ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের’ আওতাভুক্ত। ২০২০ সালে চালু হওয়া প্রকল্পটি ইলিশ জোন এলাকার দেশের ২৯টি জেলার ১৩৪টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করলেও গাইবান্ধা আজও রয়েছে এই বাইরে। অথচ প্রতিবছর ইলিশের প্রজনন মৌসুমে গাইবান্ধার ইলিশ জোনের চার উপজেলায় অভিযানে জেলেদের পোড়ানো হয় জাল, বিভিন্ন মেয়াদে দেওয়া হয় জেল। জেলার জেলেরা নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বঞ্চিত থেকে যায় প্রকল্প সুবিধা থেকে। যা চরম বৈষম্যের বলে দাবি জেলে নেতাদের।

বালাসীঘাটের জ্যেষ্ঠ জেলেদের মধ্যে মৎস্য অফিসের ফিশারী (এফআইডি) কার্ডভুক্ত জেলে একজন কাশেম আলী (৬৫)। এখনও তিনি রাতভর নদীতে মাছ ধরেন যুবকদের সঙ্গে। পাঁচ সদস্যের সংসারে ঋণ করে মেয়ে বিয়ে দিলেও তা পরিশোধে ছেলে ফণি পেশা বদল করে কাজে গেছেন ঢাকায়।

কাশেম আলী বলেন, গতকাল বিকেলে নৌকায় মাছ ধরতে গেছি ৭ জন। আজ মাছ বিক্রি করলাম ২০০০ টাকা। নৌকার তেল, খাওয়াসহ খরচ ৮০০ টাকা, কেমনে চলে বলেন? কারেন্ট শর্টে সব মাছ মেরে ফেলতেছে।

আরেক জেলে নূর মোহাম্মদ আক্ষেপ করে বলেন, নদীতে যত অত্যাচার, কেমনে মাছ থাকবে! অবৈধ কারেন্ট জাল, চায়না দুয়ারি জাল, আর এখন সব চেয়ে বেশি ক্ষতি করছে কারেন্ট শর্টের মাছ নিধন। এরা এক কেজি ধরে কিন্তু ১০০ কেজি নষ্ট হয়ে যায়। তিনি জাল মারা বাদ দিয়ে এখন মাছ কিনে বাজারে বিক্রি করেন। পেশা বদলে এখন রিকশা চালান এখানকার আরেক জেলে মানিক।

এখান থেকে কিছুটা উত্তরে গেলেই জেলে পাড়া। একইদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে জেলে পাড়ায় গেলে দেখা যায়, কয়েক বছরের একটি পুরোনো জাল সেলাই-ঠিকঠাক করছেন কয়েকজন জেলে। এখানে ৪০টি জেলে পরিবার বসবাস করেন। যাদের আথির্ক অবস্থা প্রায় একই। প্রায় সবাই ‍ঋণের জালে আটকা। এ পাড়ার জেলেদেরও একই অভিযোগ নদীতে কারেন্ট তৈরি করে মাছ নিধন।

এখানকার প্রবীণ জেলে শ্রী ঝড়ু চন্দ্র জানান, এখন আর আগের মতো নদীতে মাছ পাওয়া যায়না। আগে জাল ফেললেই নদীতে বুড়াল, বাইম, ইলিন্দা-ভাগনা, বালিয়া, চেলা-চিংড়ি, পুকাজলি, গোলসা নামের মাছ জাল ভরে উঠতো। কিন্তু এখন নেই, কারেন্ট শর্ট সব মাছ মেরে ফেলতেছে। কিন্ত আমাদের উপায় নাই, তবু বাপ দাদার পেশা আকড়ে ধরে আছি।

এখানকার জেলে সরদার (জালের মালিক) শ্রী মনোরঞ্জন বলেন, পুরাতন জাল ঠিকঠাক করছি কারণ হাতে টাকা নেই। নতুন জাল করতে গেলে ঋণ নিতে হবে কিন্তু মাছ না থাকলে শোধ হবে কেমনে। আমাদের কথা কেউ ভাবে না। ইলিশের নিষিদ্ধ সময়ে মাত্র ২৫ কেজি চাল দেয়, নদীতে নামতে দেয় না ২২ দিন। তাও সবাই পায় না।

জেলে শিরিশ চন্দ্র বলেন, লাখ টাকা ঋণ নিয়ে জাল করা হয়েছে। কিন্তু এখন নদীতে মাছ নাই, কিস্তিও বন্ধ নেই। এই গ্রামের জেলে শ্রী সুরজিতের পাঁচজনের সংসারে ছেলে ক্লাস সিক্সে পড়ে। নদীতে মাছ নেই, ঋণও আছে। স্ত্রী সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করার কথা জানান সুরজিত।

ঘাটপাড়ের একাধিক জেলের অভিযোগ, রাতে এখানকার পুলিশ (নৌপুলিশ) কারেন্ট মেশিন (ব্যাটারির সাহায্যে তৈরি বিদ্যুৎ যন্ত্র) ধরে বিভিন্ন অংকের টাকা নিয়ে জাল ছেড়ে দেয়।

তাদের দাবি, কারেন্ট মেশিনের নৌকা ধরলে ৫০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত নেন পুলিশ। না দিলে তারা মেশিন নিয়ে যান। পরে আবার টাকা দিয়ে আনতে হয়। এ ছাড়া, পুলিশ জাল ধরে টাকা নিয়ে নিয়মিত তাদের সহযোগিতা করেন বলেও অভিযোগ করেন অনেক জেলে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বালাসীঘাট নৌপুলিশ ফাঁরির ইন্চার্জ নুরুল আলম মোবাইল ফোনে বলেন, বিষয়টি সঠিক নয়। আমরা অভিযান করি কিন্তু আমাদের টের পেলে তারা দ্রুত গতিতে পালিয়ে যায়। আমাদের তো স্পিডবোট নেই।

এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চলতি বছরে কয়েকটি অভিযান করেছি কিন্তু কোনো মামলা বা অবৈধ সরঞ্জাম জব্দ করতে পারিনি। বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখবেন বলে জানান তিনি।

জেলার বিভিন্ন নদীতে অবৈধ বৈদ্যুতিক ফাঁদে মাছ নিধন হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও বন্ধ করতে বা পদক্ষেপ নিতে নানা সীমাবদ্ধতার কথা জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রাশেদ। তিনি বলেন, এই অবৈধ পদ্ধতিতে তারা মাছ নিধন করছে রাতের বেলা। আমাদের নিজস্ব ফোর্স নেই, ফলে রাতের অভিযানে বেশ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে, এসব বন্ধে ওই এলাকার স্থানীয় সচেতন মহল, জনপ্রতিনিধি ও প্রকৃত জেলেদের সহযোগিতা চান তিনি।

স্থানীয় সচেতন মহল এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সংশ্লিষ্টদের দাবি, অবৈধ পন্থায় বৈদ্যুতিক শকে মাছ নিধন বন্ধ, চায়না দুয়ারী জাল ও কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আবারও মাছে সমৃদ্ধ হবে গাইবান্ধা। অন্যধায় ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের বিশাল এক জনগোষ্ঠী স্থায়ীভাবে জীবিকা হারাবে। একইসঙ্গে নদীর নাব্যতা ফেরাতে পদক্ষেপ গ্রহণসহ ইলিশ প্রকল্প চালুর দাবিও তাদের। টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অভিযান চান তারা।

এ ব্যাপারে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ রক্ষায় অবৈধ কারবারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থাসহ সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়া, ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি’ যাতে এ জেলাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় সেজন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

এএমকে