বিজ্ঞাপন

বছরঘুরে পাহাড়ের উৎসব ‘বৈসাবি’ দোরগোড়ায়

অ+
অ-
বছরঘুরে পাহাড়ের উৎসব ‘বৈসাবি’ দোরগোড়ায়

পাহাড়ে আবারও ফিরে এসেছে প্রাণের উৎসব ‘বৈসাবি’। বছরজুড়ে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ঘরে ঘরে এখন উৎসবের আমেজ। প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের মেলবন্ধনে সাজতে শুরু করেছে খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য এলাকার জনপদগুলো। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অন্যতম বৃহৎ এই উৎসবকে কেন্দ্র করে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এখন আনন্দ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

বিজ্ঞাপন

‘বৈসাবি’ নামটি এসেছে তিনটি প্রধান পাহাড়ি সম্প্রদায়ের উৎসবের নামের আদ্যক্ষর থেকে ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’ এবং চাকমাদের ‘বিজু’। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রতি বছর এপ্রিল মাসে এই উৎসব উদযাপন করা হয়। চলতি বছর আগামী ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হবে বৈসাবির মূল আনুষ্ঠানিকতা। তবে এরই মধ্যে পাড়া-মহল্লায় শুরু হয়ে গেছে নানা আয়োজন, মেলা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক প্রস্তুতি।

অরণ্যঘেরা পাহাড়ি জনপদের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন উৎসবের ছোঁয়া স্পষ্ট। ছোট ছোট ঘরে, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও চলছে প্রস্তুতি। দরিদ্র ও হতদরিদ্র ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পরিবারগুলো জীবিকার কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন উৎসব উদযাপনের জন্য। অনেকের কাছে এই উৎসব শুধু আনন্দ নয়, বরং আত্মপরিচয় আর সংস্কৃতির এক অনন্য প্রকাশ।

শহরাঞ্চলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন থাকলেও গ্রামাঞ্চলের উৎসবের রূপ ভিন্ন। সেখানে নেই বড় আয়োজন, নেই আলোর ঝলকানি কিংবা ঢাকঢোলের শব্দ। তবুও ছোট ছোট আয়োজনেই তারা খুঁজে নেয় পরম আনন্দ। যেন এক গুচ্ছ পাহাড়ি ফুলের মতো সরল ও নির্মল এই উৎসব। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষের হাসি আর উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে পুরো পরিবেশ।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রতিবছরের মতো এবারও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের বিষয়টি সামনে এসেছে। সরকারি বরাদ্দ থাকলেও তা তৃণমূলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাছে খুব কমই পৌঁছায় বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কিছু শোভাযাত্রা, মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকে। ফলে উৎসবের আনন্দে বৈষম্যের ছায়া থেকে যায়।

ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ‘বৈসু’ উৎসব তিন দিনব্যাপী উদযাপিত হয়। প্রথম দিন ‘হারি বৈসু’, দ্বিতীয় দিন ‘বৈসু’ এবং তৃতীয় দিন ‘বিছিকাতাল’। হারি বৈসুর দিনে তরুণ-তরুণীরা বন-জঙ্গল থেকে ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজায়। বাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়, এমনকি গৃহপালিত পশুপাখিও এই পরিচ্ছন্নতার বাইরে থাকে না। দ্বিতীয় দিনে ছোটরা বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয় এবং অতিথি আপ্যায়নের মাধ্যমে দিনটি উদযাপন করা হয়। তৃতীয় দিনে নতুন বছরকে স্বাগত জানিয়ে বড়দের গোসল করানো, বস্ত্র দান এবং মন্দিরে পূজার আয়োজন করা হয়।

মারমা সম্প্রদায়ের ‘সাংগ্রাই’ উৎসব চার দিন ধরে চলে। প্রতিদিনের আলাদা নাম ও তাৎপর্য রয়েছে সাংগ্রাই, আক্যে, আতাদা এবং আতং। এই চার দিনে চলে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, বিশেষ রান্না, অতিথি আপ্যায়ন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উৎসবের প্রতিটি দিনই আনন্দ ও ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ।

বিজ্ঞাপন

চাকমা সম্প্রদায়ের ‘বিজু’ উৎসবও তিন দিনব্যাপী। প্রথম দিন ‘ফুল বিজু’, দ্বিতীয় দিন ‘মূল বিজু’ এবং তৃতীয় দিন ‘গজ্জাপজ্জা’। ফুল বিজুর দিনে তরুণ-তরুণীরা বন থেকে ফুল এনে নদীতে ভাসিয়ে দেয়, যা সকলের মঙ্গল কামনার প্রতীক। ঘরবাড়ি সাজানো হয় এবং পরবর্তী দিনগুলোতে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে উৎসব উদযাপন করা হয়।

উৎসবকে আরও প্রাণবন্ত করতে বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দলও এগিয়ে এসেছে। খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির উদ্যোগে এবারও একদিনের বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আগামী ১৪ এপ্রিল খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের বটতলায় দিনব্যাপী মেলা ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন থাকবে। সকালে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে শুরু হবে এই আয়োজন, যা দিনভর চলবে।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমএন আবছার জানান, পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও পহেলা বৈশাখকে আরও প্রাণবন্ত করতে গত বছর প্রথমবারের মতো এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্যাপক সাড়া পাওয়ায় এবারও একই আয়োজন করা হচ্ছে।

অন্যদিকে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদও বৈসাবি উপলক্ষ্যে তিনদিনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। আগামী ৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা শেষে টাউন হলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী ডিসপ্লে অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি তিন দিনব্যাপী বিকেলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ইনস্টিটিউটে।

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা জানান, এবারের আয়োজনকে আরও আকর্ষণীয় করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

উৎসবকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনও সতর্ক রয়েছে। সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে ইতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে নেওয়া হচ্ছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

খাগড়াছড়ি রিজিওন কমান্ডার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল কেএম ওবায়দুল হক জানিয়েছেন, উৎসবটি যাতে শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হয়, সে লক্ষ্যে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতার মাধ্যমে উৎসবকে সফল করার আহ্বান জানান তিনি।

সব মিলিয়ে, বৈসাবি শুধু একটি উৎসব নয় এটি পাহাড়ি মানুষের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। বৈষম্য আর সীমাবদ্ধতার মাঝেও এই উৎসব মানুষকে একত্র করে, আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে দেয় পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত।

মোহাম্মদ শাহজাহান/এসএইচএ

বিজ্ঞাপন