গত বছরের ৪ জুলাই আরোগ্য ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় বদরগঞ্জ লালদিঘী এলাকার জমির উদ্দিনের কন্যা শিশু জুঁই মনিকে (১২)। অপারেশনের সময় রাতে ওই শিশুর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে পরিবারের সদস্যরা রাস্তায় মরদেহ রেখে প্রতিবাদ জানায়। সন্তানহারা মা-বাবার মধ্যরাতের আহাজারি উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। এ ঘটনার চারদিন পর সেই ক্লিনিকে অভিযান পরিচালনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ।
বিজ্ঞাপন
অভিযানে আরোগ্য ক্লিনিকে ২০ শয্যার অনুমোদন নিয়ে ৩৫ থেকে ৪০ শয্যায় চিকিৎসা চালানো, অপরিষ্কার অপারেশন থিয়েটার, জরুরি ওষুধপত্র ও যন্ত্রাংশ না থাকাসহ নানা অভিযোগে অপারেশন থিয়েটারটি সিলগালা করা হয়। সেই সঙ্গে কর্তৃপক্ষকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।
ঘটনার নয় মাস পর এখনো পুরোনো চিত্র আরোগ্য ক্লিনিকে। নগরীর কেন্দ্রীয় সিটি বাস টার্মিনাল সংলগ্ন বড়বাড়ি দেওডোবা রোড এ ক্লিনিকের বর্তমান ঠিকানা। এর আগে ক্লিনিকটি আরেক জায়গায় ছিল। অবস্থান বদলেও বদলায়নি ক্লিনিকের ভেতরের পরিবেশ। এ অবস্থা শুধু আরোগ্য ক্লিনিক কিংবা জরিমানার ধকল পোহানো অন্যান্য ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নয়, জেলার বেশির ভাগ চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠানের চিত্র এটি। তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও নেই তেমন কোনো পরিবর্তন।
বরং জেল-জরিমানা, বন্ধ-সিলগালা আর সতর্ক বার্তা সহজেই হজম করে চিকিৎসাসেবার নামে কোটি কোটি টাকা লুটছে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলো।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্যসেবার নামে গড়ে তোলা এসব প্রতিষ্ঠানের ৮০ ভাগের বৈধ কাগজপত্র নেই বলে অভিযোগ বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের।
ব্যাঙের ছাতার মতো ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক
জেলায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার-প্যাথলজি বাণিজ্য। বিশেষ করে মহানগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় থেকে মেডিকেল মোড় হয়ে সিও বাজার পর্যন্ত তিন কিলোমিটার রাস্তার দুই পাশে তাকালে নজর কাড়বে দেড় শতাধিকের বেশি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক, হাসপাতাল, প্যাথলজি ল্যাব ও ব্লাড ব্যাংক। শুধু তাই নয়, দুই পাশের রাস্তা ছাড়াও অলিগলির সর্বত্র রোগ নির্ণয়ের নামে রয়েছে সাইনবোর্ড সর্বস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি।
বিজ্ঞাপন
রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাপসাপাতালের আশপাশের তিন কিলোমিটার এলাকার মধ্যেই এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে সরকারি এই হাসপাতালের কোলঘেঁষে রয়েছে রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সম্প্রতি হার্টে রিং পরানোর সময় এক রোগীর মৃত্যুকে ঘিরে বেসরকারি এই হাসপাতালটিতে ঘটেছে লংকাকাণ্ড।

এছাড়াও মডার্ন মোড় থেকে শুরু করে টার্মিনাল রোড, পর্যটন মোটেল রোড, ইসলামাবাগ রোড, ধাপ চেকপোস্ট, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ রোড, বদরগঞ্জ রোড, বেতার সংলগ্ন বুড়িরহাট রোড, মাহিগঞ্জ রোডসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে এমন অসংখ্যা চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠান। সরকারি-বেসরকারি হিসেবে মিলিয়ে রংপুর মহানগরসহ জেলার আট উপজেলায় চার শতাধিকের বেশি ক্লিনিক, হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি ল্যাব ও ব্লাড ব্যাংক রয়েছে।
ভুক্তভোগীসহ সচেতন মহলের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই প্রশাসনের নাকের ডগায় রমরমা বাণিজ্য করছে। বেশির ভাগ ক্লিনিকে সার্বক্ষণিক থাকেন না ডাক্তার। ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই ভালো টেকনিশিয়ান। তারপরও নেওয়া হচ্ছে ইচ্ছেমাফিক ফি। অনেকের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ভুল রিপোর্ট আসছে, ভুল চিকিৎসায় কখনো কখনো রোগীর মৃত্যুর অভিযোগও উঠছে। প্যাথলজি আর ব্লাড ব্যাংকের মানও যাচ্ছেতাই। পুরোনো মেশিনারিজ ও হাতুড়ে টেকনিশিয়ান নির্ভরতাই বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে।
এদিকে চিকিৎসাসেবার নামে গড়ে তোলা এসব প্রতিষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে। পাশাপাশি লাইসেন্স প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ছাড়পত্র গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের হর্তাকর্তাদের সিন্ডিকেট নামক ফাঁদে বছরের পর বছর পার পেয়ে যাচ্ছে অবৈধের তকমা নিয়ে টিকে থাকা বেশির ভাগ বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার।
রোগী মৃত্যুর লম্বা অভিযোগ, মাঝেমধ্যে অভিযান
২০২৫ সালের ৪ জুলাই ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে নগরীর ধাপ এলাকার বাংলাদেশ হাসপাতাল ও রেইনবো ক্লিনিকে অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। অভিযানে দুটি ক্লিনিক সিলগালা করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই দুটি ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করে।
অভিযোগ পাওয়া যায়, প্রতিষ্ঠান দুটি বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। সেখানে ছিল না প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত জনবল। নোংরা ও অনিরাপদ পরিবেশে চালু ছিল অপারেশন থিয়েটার।
একই চিত্র নগরীর ইসলামবাগ আরকে রোড এলাকার ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালেও। এখানে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগে গত বছরের ২৫ জুন অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযানের সময় হাসপাতালটির কাগজপত্র নবায়ন করা না থাকাসহ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি ও অন্যান্য সমস্যা থাকায় ২ লাখ টাকা জরিমানা ও অনাদায় এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। হাসপাতালটিতে অনুমোদিত বেডের চেয়ে সংখ্যায় বেশি বেড থাকলেও ছিল না পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী।
এদিকে ১৬ জুন যৌথ বাহিনীর অভিযানে ধাপ এলাকায় স্বপ্ন জেনারেল হাসপাতাল বন্ধ করার পরেও গোপনে রোগী ভর্তি কার্যক্রম ও অপারেশন করে আসার অভিযোগে আবারও অভিযান চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সিলগালা করে দেওয়া হয়।
২০২৪ সালের ৪ জুন নগরীতে অনুমোদনহীন নাজমুন নাহার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অভিযান চালিয়ে লক্ষাধিক টাকা জরিমানা করে র্যাব। রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া ও ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে নানাভাবে রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নানা দুর্ভোগে ফেলার অভিযোগ রয়েছে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে পালানোর অভিযোগ
রেনেসাঁ হাসপাতালে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় পিএলআইডি অপারেশনের একদিন পর সারজিনা খাতুন (৩৯) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। পরে এ নারীর মরদেহ রেখে নার্স ও ওয়ার্ডবসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পালানোর অভিযোগ উঠে। ২০২৫ সালের ১৮ জুন সন্ধ্যার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
ওই সময় রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও চিকিৎসক সময়মতো আসেননি। বারবার বলার পরও সারজিনাকে অন্য কোথাও নিয়ে যেতেও দেননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইচ্ছে করেই রোগীকে রংপুর মেডিকেলে নিয়ে যেতে দেয়নি। এতে দীর্ঘক্ষণ থাকার পর ক্লিনিকই মারা গেছেন সারজিনা।’
ওই ঘটনার পর হাসপাতালটির কাগজ ঘেঁটে দেখা যায় পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন কাগজের মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। আর রোগীকে অপারেশনের আগে এনেস্থেসিয়া করেছিলেন পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এনেস্থিসিয়া বিভাগের একজন জুনিয়র কনসাল্টেন্ট।

নাকের অপারেশন করতে গিয়ে ভুল চিকিৎসায় ওখিল চন্দ্র বর্মন নামের এক রোগীর মৃত্যু হয় ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। নগরীর নিরাময় ক্লিনিক অ্যান্ড নার্সিং হোমে এ ঘটনা ঘটে। ওখিল চন্দ্র রংপুর নগরীর মাহিগঞ্জের বাসিন্দা।
তার পরিবারের অভিযোগ, নিরাময় ক্লিনিক অ্যান্ড নার্সিং হোমে রেজাউল করিম নামে একজন এনেস্থিসিয়া চিকিৎসক রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে অপারেশনের জন্য তাকে অজ্ঞান করেন। একপর্যায়ে রোগীর নার্ভ খুঁজে পাওয়া না গেলে অপারেশন বন্ধ করে দেন। পরে অবস্থার অবনতি দেখে আমরা (স্বজনরা) তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে চাইলে বাধা দেয় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ। এর ছয় ঘণ্টা পর মারা যান ওখিল চন্দ্র।
একই বছরের ১৭ আগস্ট নগরীর মেডিকেল মোড়ে সান ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভুল রিপোর্টে সেন্ট্রাল হসপিটালের অপারেশনে থিয়েটারে মুশফিকুর রহমান রাসেল নামে ষাটোর্ধ্ব বয়সী এক ব্যক্তির মৃত হয়। বিষয়টি জানান পর বিক্ষুব্ধ জনতা ও স্বজনরা হাসপাতাল ঘেরাও করে প্রতিবাদ জানান।
অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে চান না কেউ
এত মৃত্যু, এত অভিযোগ, এত অনিয়মের পরও স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট তদারকি প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই তালিকা। আর অভিযুক্তদের কেউই এসব নিয়ে মুখ খুলতে চান না। বরং একাধিক ব্যবসায়িক পার্টনারের অযুহাত এবং দায়িত্বশীলদের দেখা না পাওয়ায় অজানা থেকে যাচ্ছে নানা কারণ।
সান, সেবা, রেনেসাঁসহ বেশ কয়েকটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় চাকরি করেছেন- এমন একজন নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, সবাই মুখে বলে চিকিৎসাসেবা কিন্তু কেউই সত্যিকারের সেবা দেওয়ার মানসিকতা ধারণ করে না। বাণিজ্যিক চিন্তাটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে একেকজন একেকভাবে নামে বেনামে ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি ও ব্লাড ব্যাংক চালু রেখেছে। এটার আড়ালে অনেক কিছুই ঘটে, যেসব মিডিয়া আসে মানুষ সেটাই জানে। বাকি ঘটনাগুলো অজানাই থেকে যায়।
তিনি বলেন, যাদের ডাক্তার-নার্স, টেকনিশিয়ান, প্রয়োজনীয় লোকবল, ওটি, যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে সবকিছুই আছে তাদের কিন্তু চিন্তা নেই। এর প্রধান কারণ তাদের বৈধ কাগজপত্র। আর যাদের চিন্তা-ভাবনা ঠিক না, কাগজপত্রে ঝামেলা আছে খোঁজ নিয়ে দেখবেন এসব প্রতিষ্ঠানে বেশি অনিয়ম, দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগও রয়েছে। আমার মতো অনেকেই যারা চাকরি হারানোর ভয়ে কিংবা বেতন আটকে থাকবে, এই চিন্তায় প্রতিবাদ করে না। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে শুরু করে প্রশাসন যদি সঠিকভাবে তাদের দায়িত্বটা পালন করত, তাহলে মানুষ সত্যিকারের চিকিৎসাসেবা পেতো।
এদিকে, অন্যদের ভুল অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, অনেক সময় তার প্রভাব বৈধ প্রতিষ্ঠানের ওপরও পড়ে বলে জানান ল্যাবজোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক জাহাঙ্গীর কবির।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র সব কিছু রয়েছে, এক কথায় বৈধ লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এটি। কিন্তু কিছু অবৈধ প্রতিষ্ঠানের কারণে আমাদের মতো অন্যদেরকে মাঝেমধ্যে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। রোগীদের সেবা দেওয়া ও সঠিক রোগ নির্ণয় করাই আমাদের উদ্দেশ্য। আমরা শুরু থেকে চেষ্টা করছি, মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দায়বদ্ধতা এবং স্বচ্ছতা ধরে রাখতে।
চিকিৎসকের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার অভাব
এসব মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসা পেশাকে ব্যবসায়ী দৃষ্টিভঙ্গিতে নেওয়া ও বেসরকারি হাসপাতালে রোগীদের প্রতি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সচেতন মহলে। অন্যের ভুল আর বদনামে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে দায়িত্ববান চিকিৎসক-নার্সসহ বিধি মেনে পরিচালনা করা স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকেও।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও ডায়াবেটোলজিস্ট ডা. মো. মোস্তফা আলম বনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, জীবনের প্রতি প্রত্যেকের মায়া আছে। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও আমরা সবাই বাঁচতে চাই এবং বেঁচে থাকার স্বপ্নও দেখি। এ কারণে সামান্য অসুখ-বিসুখে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ সবার আগে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। অথচ অনেকের মধ্যে সেই বোধ ও দায়বদ্ধতা কাজ করছে না। রেসপন্সিবিলিটি না থাকায় অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, রোগীদের প্রতি একজন ডাক্তারের প্রাইভেট হসপিটালে যে রকম দায়িত্ব-রেসপন্সিবিলিটি থাকা দরকার, সেটা তারা করেন না। অতি মুনাফার জন্য অনেকেই দৌড়ঝাঁপ করে থাকেন। যার কারণে কখনো বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। অন্যদিকে চিকিৎসক সমাজের প্রতি ক্ষোভ বাড়ছে এবং সেবাটাকে ব্যবসা মনে করছে মানুষ।
ছাড়পত্রের তথ্য দিতে অনীহা পরিবেশ অধিদপ্তরের
পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে জেলায় কতগুলো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে- তা জানতে যোগাযোগ করা হয় রংপুর জেলা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা ও সিনিয়র কেমিস্ট মো. মলিন মিয়ার সঙ্গে।
তিনি ঢাকা পোস্টের এই প্রতিবেদককে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এ তথ্য জানতে হলে আবেদন করতে হবে। আবেদন ছাড়া হঠাৎ করে তথ্য জানানো কিংবা পরিসংখ্যান বলা সম্ভব নয়। কারণ এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি না থাকায় বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, প্যাথলজি ল্যাব ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ব্লাড ব্যাংকের বেশির ভাগই নোংরা, অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে সেবা কার্যক্রম চালু রেখেছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনিবন্ধিত ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে আসছেন সিভিল সার্জন কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তারা। এ কারণে ছাড়পত্র থাকা বা না থাকা নিয়ে খুব বেশি তৎপরতা দেখা যায় না।
রোগীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা সম্মত পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা সভাপতি অধ্যক্ষ খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের নগরীর রাস্তার দুই পাশে এবং আলিগলিতে গণহারে গড়ে ওঠা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের হিসেব নেই। এসবের মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই ভুল চিকিৎসার অভিযোগ পাওয়া যায়। এ নিয়ে আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ নির্বিকার। সরকারি বিধি-নিষেধ বাস্তবায়নে যেভাবে মনিটরিং হওয়া উচিত, তারা সেটা করছেন না।
তিনি আরও বলেন, অভিযান আর জরিমানা করে তো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এখন এই সেবাখাতটি বাণিজ্যিক খাতে পরিণত হয়েছে। এ কারণে জবাবদিহিতা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা থাকাটা ভীষণ জরুরি। স্বাস্থ্য বিভাগের এখন যে দৈন্যদশা, তাতে বলা যায় তাদের মধ্যে স্বাভাবিক শ্রী বা সচ্ছলতা নেই। সিভিল সার্জন কার্যালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভোক্তা অধিদপ্তরসহ যাদের এসব দেখার দায়িত্ব তারা কেন নিয়মিত মনিটরিং করছেন না, এর কারণ খুঁজতে হবে।
বিভাগীয় শহর রংপুরে পরিকল্পিত নগরায়ন ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বারোপ করে ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, আমাদের শহরে পার্কিং ব্যবস্থা নেই। বিকল্প পথঘাট কিংবা সড়ক নেই। মূল শহর আর সড়কের দুই পাশ এবং অলিগলি ঘিরে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আমাদের স্বাস্থ্যনগরী। এক সড়ক ধরে হাঁটলেই চোখে পড়বে সরকারি, বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার, সনো ল্যাব ও ব্লাড ব্যাংকের ছড়াছড়ি। এতে রোগীর জন্য যে নিরিবিলি ও স্বাস্থ্যসেবা সম্মত পরিবেশের প্রয়োজন সেটা নিশ্চিত হয়নি। তিনি মূল শহর থেকে দূরে কোথাও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি উন্নত ‘হেলথ সিটি’ গড়ে তোলার জন্য সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সিটি কর্পোরেশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্বাস্থ্য বিভাগের সিন্ডিকেটের ফাঁদে আটকা মালিকরা
বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের শীর্ষস্থানীয় সংগঠন বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের রংপুর বিভাগীয় ও জেলা শাখা সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. মামুনুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের মধ্যে অনেকের লাইসেন্স মানসম্মত নয়, তাদের জন্য আমরা সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্টদের একটা নির্দিষ্ট সময় দিতে বলেছি। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে সেই সময়সীমা বছরের পর বছর বেড়ে যাচ্ছে। অথচ বৈধ লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কখনো কখনো অন্যদের কারণে বিড়ম্বনার পাশাপাশি সমালোচনা সইতে হয়। একটা হসপিটাল, ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের জন্য ৮টা থেকে ১২টা লাইসেন্স করতে হয় এবং প্রত্যেক লাইসেন্স পাওয়া কষ্টকর। পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, কলকারখানা, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সব সেক্টর থেকে লাইসেন্স নিতে হয়।
তিনি আরও বলেন, এসব লাইসেন্স পেতে তেমন কোনো নিয়মকানুন নেই। তারা যেভাবে ডিল করে সেভাবেই চলতে হয়। এতে করে আবেদনকারীকে নিষ্পেষিত হতে হয়। কখনো কখনো গভর্মেন্টকে ভ্যাট-ট্যাক্স দেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের ইচ্ছাপূরণও করতে হয়। আমরা এসবের প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছি। আমরা সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্টদের বলেছি, যাদের একেবারেই লাইসেন্স নেই, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন। কিন্তু সেটা করা হচ্ছে না। আমরা খেয়াল করছি, যাদের লাইসেন্স নেই তারা বছরের পর বছর একটা সিন্ডিকেট মেইন্টেন করে চলছে। স্বাস্থ্যখাতের সাথে সংশ্লিষ্ট যারা আছে তাদের সাথে যোগসাজশ করে বছরের বছর লাইসেন্স ছাড়াই চিকিৎসা সেবার নামে লুটপাট ও মানুষের প্রতারণা করা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেট অনেক শক্তিশালী।
৮০ ভাগ প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স নেই
ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান ও জরিমানার উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে গুড হেলথ হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ও অ্যাসোসিয়েশনের শীর্ষ নেতা ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, মোবাইল কোর্ট করে যাদের লাইসেন্স নাই তাদের বিরুদ্ধে কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, আমরা সবাই জানি। জরিমানা ছাড়া কিছুই করা হয় না। যদি এক-দেড় মাসের জন্য বন্ধও থাকে, পরে আবার খুলে ব্যবসা শুরু হয়। আমাদের কাছে সিভিল সার্জনের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ৮০ ভাগ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নেই। সেগুলো নিয়ে সরকারি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো মাথা ব্যাথা নেই। তারা লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত মনিটরিং কিংবা নিয়ন্ত্রণ করছে না।
বেআইনি বা লাইসেন্সবিহীন এসব প্রতিষ্ঠানে যা হয় তা এক ধরণের ‘ক্রাইম’ বলে মন্তব্য করেন এই চিকিৎসক ও সংগঠক। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, যদি এভাবে বেআইনি প্রতিষ্ঠান চলে এবং তাদের কোনো লাইসেন্স নেই, ডাক্তার নেই, নার্স নেই, এক্সপার্ট নেই, এইট-নাইন পাস নন মেডিকেল পারসন অপারেশন করছে, চিকিৎসা দিচ্ছে- তাহলে এটা তো ক্রাইম। এ ধরনের অপরাধ দমনে জন্য পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট, স্বাস্থ্যবিভাগ ও সিভিল সার্জন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর আছে। কিন্তু তারা কী করছে? সরকারের দায়িত্বশীল ভুরি ভুরি প্রতিষ্ঠানের নাকের ডগায় এ রকম একটা বিভাগীয় শহরে যথাযথ অনুমোদন ছাড়া অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান কিভাবে চলছে- এসব প্রশ্ন তো মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স নেই। সাইনবোর্ডে নাম আছে কিন্তু সেখানে ডাক্তার নেই। যন্ত্রপাতি নেই, এক্সপার্ট টেকনিশিয়ান নেই। অথচ এরা ডাক্তারের সাথে যোগসাজশ করে নিজেরাই হাতে রিপোর্ট তৈরি করে দিয়ে দিচ্ছে। এমনও প্রতিষ্ঠানে যাদের সাত-আটটা ওটি (অপারেশন থিয়েটার) রয়েছে, কিন্তু নার্স-ডাক্তার নেই। এসবে তো হরিলুট অবস্থা। সঠিক চিকিৎসাসেবা পাওয়া বদলে রোগী তো মরবেই। এখন এসব কে দেখবে?
তিনি আরও জানান, রংপুর মহানগরসহ জেলায় ২০০ বেশি হসপিটাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক, ল্যাব ও ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। যার মধ্যে বর্তমানে অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য ১৩৮ জন। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স মানসম্মত না হওয়ায় সেগুলো বিধিসম্মত করার ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশন থেকে পরামর্শ ও সহযোগিতা করা হচ্ছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান যা বলছে
সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রংপুর জেলায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ১৭৭টি। এর মধ্যে মহানগর ও সদর উপজেলা মিলে ১৪৪টি এবং উপজেলা পর্যায়ে ৩৩টি রয়েছে। এছাড়া নিয়ম-বহির্ভূত ত্রুটি সনাক্ত এবং প্রক্রিয়া ও স্থাপনা মানদণ্ড নিশ্চিত হতে নতুন ৩টি এবং নবায়নের জন্য আবেদন করা ১টি প্রতিষ্ঠানে ইন্সপেকশন বা পরিদর্শন শেষ হয়েছে।
পরিদর্শনের অপেক্ষায় বা ওয়েটিং ফর ইন্সপেকশনে থাকা ১০৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বন্ধ রয়েছে ৬৯টি। এছাড়া বিচারাধীন বা অমীমাংসিত ৯৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩৯টি বন্ধ রয়েছে। নতুন ও নবায়নের তালিকায় রয়েছে ৭টির প্রতিষ্ঠানের আবেদন। জেলায় মোট লাইসেন্সপ্রাপ্ত রয়েছে ১৩১টি। এছাড়াও অপেক্ষমান ৭৮টি, বিচারাধীন ৫২টি এবং একটিতে পরিদর্শন শেষ হয়েছে। নতুন আবেদনের তালিকায় রয়েছে আরও ৩টি প্রতিষ্ঠান। এ জেলায় মোট ব্লাড ব্যাংক রয়েছে ৯টি। এর মধ্যে লাইসেন্স রয়েছে মাত্র তিনটি। পরিদর্শনের অপেক্ষায় ৫টি ছাড়াও নতুন তিনটি ও নবায়নের একটিসহ ৪টি ব্লাড ব্যাংক অসম্পূর্ণ রয়েছে।
তিন মাসে ১১ অভিযানে ৮ লাখ টাকা জরিমানা
রংপুরের ডিপুটি সিভিল সার্জন ডা. ফিরোজ হাসান খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, যেসব বেসরকারি ক্লিনিক, হসপিটাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্যাথলজি ল্যাব ও ব্লাড ব্যাংকের কোনো লাইসেন্স নেই, সেগুলোর তালিকা জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠিয়েছি। আমরা তো ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া সরাসরি কোনো অভিযান পরিচালনা করতে পারি না। এ কারণে জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেবেন।
তিনি আরও বলেন, অপচিকিৎসা ও অননুমোদিত কার্যক্রমে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। যেসব বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে আমরা প্রশাসনকে সাথে নিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা করছি। গত তিন মাসে ১১টি অভিযানে প্রায় ৮ লক্ষ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। সাধারণ মানুষ যাতে ভুল জায়গায় চিকিৎসা না নেয়, সে বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরএআর
