বিজ্ঞাপন

জামালপুরে জ্বালানি তেল সংকট, হুমকিতে ইরি-বোরো

অ+
অ-
জামালপুরে জ্বালানি তেল সংকট, হুমকিতে ইরি-বোরো

জামালপুরে পানির অভাবে ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের জমি। এতে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছে কৃষকরা। এদিকে কৃষদের ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিচ্ছে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

বিজ্ঞাপন

জেলার বিভিন্ন কৃষি অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, ডিজেল না থাকায় গত কয়েকদিন থেকে বন্ধ রয়েছে অধিকাংশ সেচ পাম্প। বোরো মৌসুমে এই সময় ধানের গোড়ায় পানি থাকা অপরিহার্য। অথচ পানির অভাবে জমির মাটি শুকিয়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় ধানের চারা লালচে হয়ে মরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মাঠের এই ফাটল কেবল মাটির নয়, বরং কৃষকের বুক চেরা হাহাকার। সোনালী স্বপ্নের বদলে এখন তাদের চোখেমুখে কেবলই অন্ধকারের হাতছানি। 

কৃষকরা বলছে, এখনই যদি সরকারি উদ্যোগে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে সেচ পাম্পগুলোর জন্য ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা না হয়, তবে মাঠের ফসল মাঠেই নষ্ট হবে।

জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২৭হাজার ৬২৫ হেক্টর। যার মধ্যে ১ লাখ ২৬ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চারা লাগানো হয়েছে এবং পুরো জেলায় কৃষি জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য প্রায় ৫৫ হাজর ৭শ টি সেচ পাম্প রয়েছে। যার মধ্যে বিদুৎচালিত ১৯ হাজার ৬শ এবং ডিজেল চালিত শ্যালো ইঞ্জিন ৩৬ হাজার ১শ টি। বিদুৎচালিত পাম্পগুলো দিয়ে সেচ কিছুটা দেওয়া গেলেও লোডশেডিংয়ের কারণে তাও পর্যাপ্ত নয়। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছে যে সব এলাকার পাম্পগুলো সম্পূর্ণ ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। এদিকে বিদুৎচালিত পাম্পগুলো দিয়ে পর্যাপ্ত না হলেও কিছুটা সেচ দেওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ডিজেল চালিত পাম্পগুলো ডিজেল না থাকায় চালু করা যাচ্ছে না। এতে ডিজেল চালিত সেচ পাম্পের ওপর নির্ভরশীল কৃষকরা চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছে। জেলার বিভিন্ন খোলা দোকান ও পেট্রোল পাম্পগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, দোকান বন্ধ ও পেট্রোল পাম্পে ডিজেল নেই লেখা দেখেও বোতল হাতে ঘণ্টা পর ঘণ্টা সেচ পাম্প মালিকরা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। 

বিজ্ঞাপন

সদর উপজেলার হাটচন্দ্রা এলাকার নিয়ামত আলী (৬০) বলেন, আমি বাপ-দাদার আমল থেকেই চাষবাস করি, কিন্তু এমন দিন কখনো দেখি নাই। জমি খাঁ খাঁ করতাছে। পানির অভাবে ধান গাছগুলো লাল হয়ে যাচ্ছে। আগে তাও এই দিক দিয়ে নদী ছিল। তখন নদী থেকেও পানি দেওয়া যেত। এখন তো নদীতেও পানি নাই। এভাবে চললে ধানের ফলন ভালো হবে না। ফলন ভালো না হলে বিক্রিই করমু কি? খাবোই কি?

মাদারগঞ্জ উপজেলার নুর নবী (৫৫) বলেন, এনজিও থেকে কিস্তি নিয়ে ধান লাগাইছি, সার দিয়েছি। এখন ক্ষেতে পানি দিতে না পারাই মাটি ফেটে যাচ্ছে। এখন ধান গাছ লাল হয়ে মরে যাবে। ধান না পেলে কিস্তি শোধ করবো কেমনে? এটা তো জমি ফাটতাছে না আমাদের কপাল ফাটতাছে।

সরিষাবাড়ি উপজেলার সেচ পাম্প মালিক মো. মস্তু মিয়া (৫৬) বলেন, আগে ডিজেলের অভাব ছিল না। এখন যুদ্ধের কারণে ডিজেল নাই, কি একটা অবস্থা। এটা আমার ব্যবসা, ডিজেলের জন্য যে আমার মেশিন চলতাছে না এতে কৃষকের সাথে সাথে আমারো ক্ষতি হচ্ছে। এই এরিয়ার সব জমিতে আমি পানি দিতাম। দিনরাত ২৪ ঘন্টা মেশিন চলতো। এখন ডিজেল নাই মেশিনও চলে না। জমিতে পানি দেওয়ার বিনিময়ে টাকাও পাই না।

বিজ্ঞাপন

ইসমালপুর উপজেলার কুলকান্দি এলাকার কৃষক আলহাজ¦ ছামিউল হক (৬৫) বলেন, আমি নদীর ওপারে ৭ বিঘা জমিতে ধান লাগিয়েছি। রোজার আগে ধার-দেনা করে ছোট মেয়েকে বিয়ে দিছি। ভেবে রাখছি ধান বিক্রি করে দেনা শোধ করব। কিন্তু ধানের ক্ষেতে তো পানিই দিতে পারছি না। পানি না দেওয়ায় মাটি ফেটে যাচ্ছে। পানি না দিতে পারলে ভালো ফলন হবে না। সরকার সবাইকে তেল দেই আমাদের জন্য তেলের ব্যবস্থা করে না কেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা কৃষকদের জন্য জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে প্রতিটি উপজেলাই কৃষকদের ডিজেল দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছি। সবগুলো পেট্রোল পাম্পে বলা আছে কৃষকদের সবার আগে ডিজেল দিতে। কৃষকরা তাদের চাহিদা মতো ডিজেল পাচ্ছে। তারপরও যদি কোনো কৃষকের ডিজেল পেতে সমস্যা হয় তাহলে আমাদের জানালে আমরা ব্যবস্থা করে দেব। জমিতে সেচ দিতে না পারাই কোন কৃষকের জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এমন কোন তথ্য আমাদের কাছে নেই। কৃষদের জন্য উপজেলা কর্মকর্তারা সবসময় কাজ করছে।

আরকে