রাজধানী ঢাকায় জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে রাইডশেয়ারিং খাতে। তেলের জন্য মোটরসাইকেল চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে ফিলিং স্টেশনগুলোতে। এক সময় যে পেশাটি তরুণদের কাছে আয়ের একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন সেটি পড়েছে বেশ অনিশ্চয়তায়।
বিজ্ঞাপন
মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং করা চালকেরা সাধারণত দিনে গড়ে দেড় হাজারের বেশি টাকা আয় করেন। বর্তমানে সেই আয় অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। চালকেরা বলছেন, ট্রিপের সংখ্যা কমে যাওয়া, তেল পেতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এবং এমন পরিস্থিতিতেও ভাড়া না বাড়ার কারণে তাদের আয় কমে গেছে। ফলে অনেকে এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হওয়ার কথা ভাবছেন।
ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে দেশে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার আগে রাইডশেয়ারিং চালকেরা তুলনামূলক স্বস্তিতে ছিলেন। দৈনিক সব খরচ বাদ দিয়ে অন্তত ১,৫০০ টাকা আয় করা সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। জ্বালানি সংকট শুরুর পর, বিশেষ করে ঈদের পর পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে। এখন অনেক চালক দিনে ৭০০–৮০০ টাকাও ঘরে নিতে পারছেন না। ফলে তাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর নতুনবাজারের বাঁশতলা বাস স্টপেজে কথা হয় রাইডশেয়ারিং চালক শরীফ সুজনের সঙ্গে। করোনার পর থেকে তিনি মোটরসাইকেলে রাইডশেয়ারিং করছেন। তিনি জানান, আগে আধাবেলার বেশি কাজ করলে সব খরচ বাদ দিয়ে অন্তত ১,০০০ টাকা আয় হতো, আর সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করলে ১,৫০০ টাকার মতো আয় করা সম্ভব ছিল। তবে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। ঈদের পর এখন পর্যন্ত তিনি ৫ হাজার টাকাও আয় করতে পারেননি।
বিজ্ঞাপন

হতাশা প্রকাশ করে শরীফ সুজন বলেন, ইদানিং অ্যাপে তেমন কল আসে না। মানুষ আগের মতো যাতায়াতও করছে না। আগে সারাদিনে অনেক ট্রিপ পাওয়া যেত, এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও একটি ট্রিপ মেলে না। আবার কখনও একটি-দুটি ট্রিপ পাওয়া যায়। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। বিদেশে যাব, নাকি অন্য কোনো কাজ করব— সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, আগে যানজটে বসে থাকলে দিনে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নষ্ট হতো। এখন সেই সময়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে তেল সংগ্রহের দীর্ঘ অপেক্ষা। পাম্পে গেলেই দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তাও নিশ্চিত না, তেল পাব কি না। অনেক সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও খালি হাতে ফিরতে হয়। সব মিলিয়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে যায়। তাহলে কাজ করব কখন?
বেলা ১১টার দিকে রামপুরা এলাকায় কথা হয় আরেক চালক কবির হোসেনের সঙ্গে। তিনি সাড়ে তিন বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, সকাল সাড়ে আটটায় বের হয়েছি, এখন পর্যন্ত একটি ট্রিপও পাইনি। ঈদের পর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। সারাদিন অপেক্ষা করলে অল্প কিছু ট্রিপ পাওয়া যায়, তাও পর্যাপ্ত নয়। এর ওপর তেলের জন্য আবার দুই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়। তাহলে কাজ করব কখন, বিশ্রামই বা নেব কখন?
বিজ্ঞাপন
কবির হোসেন বলেন, আগে প্রতিদিন নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য নিয়ে বের হতাম। কিন্তু এখন সেই লক্ষ্য পূরণ করা তো দূরের কথা, দৈনিক খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। মোটরসাইকেলের কিস্তি, বাসা ভাড়া এবং সংসারের খরচ মিলিয়ে আর্থিক চাপ দিন দিন বাড়ছে। আয় না বাড়লে এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। নতুন কিছু ভাবতে হবে।
অন্যান্য চালকরা জানিয়েছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে শুধু সময়ই নষ্ট হচ্ছে না, বরং কাজের ধারাবাহিকতাও ভেঙে পড়ছে। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার কারণে দিনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে অনেক ট্রিপ নিতে পারছেন না। এতে করে সম্ভাব্য আয় আরও কমে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত মার্চের শুরু থেকেই দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়। প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। ফলে মোটরসাইকেলের জন্য তেল সংগ্রহে প্রতিটি চালককে গড়ে দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও রাইডশেয়ারিং ভাড়ায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। চালকদের দাবি, অ্যাপভিত্তিক ভাড়া আগের মতোই রয়েছে। দূরত্ব অনুযায়ী ভাড়ায় উল্লেখযোগ্য কোনো বৃদ্ধি হয়নি। এতে করে সময় ও খরচ বাড়লেও আয় বাড়ছে না।
রাইডশেয়ারিং চালক ফরিদুল ইসলাম বলেন, জ্বালানি নিতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। কিন্তু অ্যাপগুলো কোনো ভাড়া বাড়ায়নি। নতুনবাজার থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত ভাড়া আগে যেমন ১৭০–১৮০ টাকা ছিল, এখনো তেমনই আছে। চুক্তিতে গেলে কখনো ২২০–২৫০ টাকা পাওয়া যায়, তবে সেটাও নিয়মিত নয়।
আরেক চালক মো. মুরাদ আলী বলেন, আবুল হোটেল থেকে ধানমন্ডি শংকর পর্যন্ত অ্যাপে ভাড়া আসে ১৪০–১৬০ টাকার মধ্যে। চুক্তিতে গেলে কখনো ২০০ টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু সারাদিন কষ্ট করে তেল তুলে যে আয় করি, তাতে তেমন লাভ থাকে না। আমি না গেলে অন্য কেউ যাত্রী নিয়ে যাবে— এই প্রতিযোগিতায় আমরা বাড়তি ভাড়া নিতেও পারি না।
তিনি আরও বলেন, ঢাকায় রাইডশেয়ারিং চালকের সংখ্যা অনেক বেশি, কিন্তু যাত্রী তুলনামূলক কম। ফলে কেউ বেশি ভাড়া চাইলে যাত্রীরা সহজেই অন্য চালকের কাছে চলে যান। এই প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিতে চালকদের হাতে ভাড়া বাড়ানোর সুযোগ নেই বললেই চলে।
রাইডশেয়ারিং সেবার যাত্রীরাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। মহানগর প্রজেক্ট থেকে গুলশানের নিকেতন এলাকায় নিয়মিত যাতায়াতকারী সুব্রত দেব বলেন, আমি সাধারণত ১০০ টাকা ভাড়া দিই। কখনো ৯০ টাকা দেখালেও ১০০ টাকা দিয়ে দিই। তেল সংকটের কথা জানি, কিন্তু চালকেরা কখনো বাড়তি ভাড়া চাননি। তারা নিজেরাই চাপে আছেন।
পুরান ঢাকার মাহুতটুলি থেকে বারিধারা পর্যন্ত নিয়মিত যাতায়াত করেন রাশেদুল হাসান। তিনি জানান, এই দূরত্বে সাধারণত ২৬০–২৮০ টাকা ভাড়া লাগে। চুক্তিতে গেলে ৩০০ টাকা পর্যন্ত হয়। তবে এর বেশি নিতে দেখেননি। জ্বালানি সংকটের অজুহাতে ভাড়া বেড়েছে এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, যাত্রীরা হয়তো কিছুটা স্বস্তিতে আছেন, কিন্তু চালকদের কষ্টটা চোখে পড়ে। অনেক সময় দেখেছি তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন কখনও যাত্রীর জন্য বা তেলের জন্য।
এমএইচএন/জেডএস
