বিজ্ঞাপন

চাহিদা মতো মিলছে না জ্বালানি তেল, উৎকণ্ঠায় গাইবান্ধার কৃষকরা

অ+
অ-
চাহিদা মতো মিলছে না জ্বালানি তেল, উৎকণ্ঠায় গাইবান্ধার কৃষকরা

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকটের শুরু থেকেই প্রভাব পড়েছে উত্তরাঞ্চলের কৃষিতে। তেল সংকটের কারণে সঠিকভাবে পানি সেচ দিতে হিমসিম খেতে হচ্ছে তাদের। বাধ্য হয়ে দ্বিগুণ দামে ডিজেল ক্রয়ে বেড়েছে খরচের পরিমাণ। এর সঙ্গে নতুন করে ধানে ব্লাস্ট রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় ত্রিমুখী সংকটে পড়েছেন গাইবান্ধার কৃষকরা। সেচ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও রোগবালাই এই তিন চাপে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

কৃষক ও কৃষি সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন থেকেই কৃষিপণ্যের চাষাবাদে খরচের পরিমাণ ঊর্ধ্বমুখী। বন্যা, খরা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতির পর এবার জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলসহ ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিননির্ভর চাষিরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। এছাড়াও সম্প্রতি ধানে ব্লাস্ট রোগ শুরু হওয়ায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে কয়েকগুণ। সমাধান পেতে কৃষি কর্মকর্তা ও কীটনাশকের বিভিন্ন দোকানে দৌঁড়াচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষতির শঙ্কায় পড়া কৃষকরা। দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে উৎপাদনে বড় ধাক্কার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চাষবাদে আগাম পরামর্শ কিংবা পদক্ষেপ না থাকলেও ব্লাস্টের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ায় তৎপরতা বাড়িয়েছে কৃষি বিভাগ।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে গাইবান্ধার সাত উপজেলায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে গাইবান্ধার কৃষি বিভাগ। যার সমপরিমাণ জমিতে চাষাবাদও হয়েছে। এই ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ২৫ হাজার ৫৮৫ মেট্রিক টন ধান।

সরেজমিনে বুধবার (৭ এপ্রিল) সকাল ১০টার দিকে সদর উপজেলার বোয়ালী ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাঠে মাঠে সবুজ ধানক্ষেত। অধিকাংশ জমিতে ধানের শীষ বের হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেতে বের হচ্ছে। তুলনামূলক কিছুটা দেরিতে রোপণ করা এবং হাইব্রিড জাতের ধান এখনো বের হয়নি। তবে থোর হচ্ছে। 

বিজ্ঞাপন

রাধাকৃষ্ণপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এসকেএস ইন সংলগ্ন একাধিক ধানের জমি ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়েছে। ওইসব জমির যে অংশে ব্লাস্ট আক্রমণ করেছে সে অংশের ধান গাছের শীষ সাদা হয়েছে এবং তাতে দানা নেই। ধীরে ধীরে গাছও শুকিয়ে যাচ্ছে। 

ব্লাস্ট আক্রান্ত জমির মালিক শরিফুল ইসলাম বলেন, এখানে তিন বিঘা জমিতে চিকন ধান ব্রি-২৮ চাষ করেছি। কিন্তু ব্লাস্টে আক্রান্ত হওয়ায় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। কৃষি অফিসের লোক জমি দেখে পরামর্শ দিয়েছে স্প্রে করার জন্য।  

তিনি জানান, আমনে জলাবদ্ধতায় কবলে পড়ে সব জমির ক্ষেত নষ্ট হয়ে এক দানা ধানও হয়নি। তারপরও এখন ব্লাস্ট। চরম ক্ষতি হয়ে গেল দুই মওসুমে।

বিজ্ঞাপন

বর্গাচাষী রিয়াদ সরদার বলেন, এখানে আমরা ডিজেলচালিত মেশিনে ধানের আবাদ করি। হাল, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকসহ বিঘা প্রতি ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। এবার তেল সংকটের কারণে খরচ দ্বিগুণ হয়েছে। তারপরও ব্লাস্টে আক্রান্ত হয়েছে জমি। আমরা কোনোদিন কোনো প্রণোদনা পাইনি।

ব্লাস্ট আক্রান্ত জমি সংলগ্ন ধান চাষি শাহারুল আলম বলেন, দেড় বিঘা জমিতে ধানের আবাদ করেছি। পাশের জমিতে ব্লাস্ট লেগেছে, দুশ্চিন্তায় আছি। ওই জমিতে ব্লাস্ট দেখে একবার স্প্রে করেছি। এখন শীষ বের হওয়া শেষ হয়েছে। ধানে চাল হলে আবার স্প্রে করতে করতে হবে, তাতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। দুই দফা আমন রোপণ করেও জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়ে এ জমিতে ১ কেজি ধানও হয়নি।

এদিকে একই দিন দুপুর ১টার দিকে গাইবান্ধা শহরের আর রহমান পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, শহরের বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন আর রহমান পাম্পে ডিজেল নিতে কৃষক-কৃষাণীর দীর্ঘ লাইন। বিভিন্ন ধরনের বোতল, জারিকেন মাটিতে রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কৃষকরা। শুধু পুরুষ নয়, নারীরাও এসেছেন ডিজেল নিতে। প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে তারা একেবারে নাজেহাল। তপ্ত রোদে না কুলাতে পেরে লাইনে জার রেখে মাঝে মাঝে ছাঁয়ার খোঁজেও যান কৃষকরা।

কৃষকদের অভিযোগ, পেট্রোল পাম্পেও এখন চাহিদা মতো তেল দেয় না। মাঝে মাঝে খুচরা দোকানে ডিজেল পাওয়া গেলেও দাম দ্বিগুণ। ফলে নিয়মিত সেচ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে কাঙ্ক্ষিত ফসল উৎপাদন নিয়ে শঙ্কিত কৃষকরা।

এ সময় ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের বালাসী ঘাটের পাকার মাথা এলাকার আব্দুল জলিলের স্ত্রী রাশেদা বেগম বলেন, পাঁচবিঘা জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছি। চরে কারেন্ট নাই। এখন ওদিকে তেল নেই, তাই তেল নিতে এসেছি

সাদুল্লাপুর উপজেলার ভাতগ্রাম ইউনিয়নের টিয়াগাছা গ্রামের তেল নিতে এসে লাইনে দাঁড়ানো খাইরুল ইসলাম বলেন, তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছি। তেল সংকটে আবাদ ভালো হবে না মনে হয়। অনেক দূর থেকে এসে এই যে রোদ মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে, অনেক কষ্ট হচ্ছে। এই দুর্দশা কি আমাদের শেষ হবে না?

পলাশবাড়ী উপজেলার কুমেদপুর থেকে তেল কিনতে আসা বাবলু মন্ডল বলেন, দুই ঘণ্টা হলো লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। রোদে গা ভিজে যাচ্ছে।  গ্রামে ১ লিটার তেল ১৫০ টাকা পর্যন্ত নেয়। ৪ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছেন তিনি।

বোয়ালী ইউনিয়নের রাধাকৃষ্ণপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কুলসুম বলেন, ওই এলাকার আগাম ধান লাগানো কিছু জমিতে ব্লাস্ট রোগটি দেখা দিয়েছে। মূলত আবহাওয়াজনিত কারণে রোগটি হয়ে থাকে। ওই সকল আক্রান্ত জমি পরিদর্শন করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্যদের আগাম পদক্ষেপ নিতেও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। 

এ ব্যাপারে গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সাদেকুল ইসলাম মোবাইল ফোনে কোন কোন এলাকয় ব্লাস্ট তা জেনে নিয়ে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন এবং তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। 

আরএআর