বরগুনায় চলতি বছরে আলু আবাদ করে ভালো ফলন হলেও সঠিক দামে বিক্রি করতে পারছেন না স্থানীয় কৃষকরা। জ্বালানি সংকটের অজুহাতে দূর থেকে তেমন কেনো পাইকার না আসায় কম দামেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে, এমন অভিযোগ তাদের। অপরদিকে, জেলায় কোনো হিমাগার না থাকায় আলু সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থাও নেই। ফলে বাধ্য হয়েই কম দামে আলু বিক্রি করায়, এখন লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা।
বিজ্ঞাপন
ভুক্তভোগী কৃষকদের এমন অভিযোগের ভিত্তিতে যে কোনো সমস্যা সমাধান এবং আলু বিক্রির ব্যবস্থা করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়েছেন জেলা কৃষি বিপণন বিভাগ। অপরদিকে, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, বরগুনায় প্রত্যায়নের মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী কৃষক, পাইকার এবং আড়তদারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে জ্বালানি সরবরাহ করা হয়।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আলু আবাদের দিক থেকে বরিশাল বিভাগের মধ্যে বরগুনার অবস্থান তৃতীয়। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ অঞ্চলে আলুর চাষ কিছুটা কম হলেও বরগুনায় উৎপাদিত আলুতে এখানকার অনেকটাই চাহিদা পূরণ হয়। তবে গত বছর বরগুনায় ৯৭৫ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এবছর তা কমিয়ে ৯৪৫ হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা কমলেও জেলায় এবছর ভালো হয়েছে আলুর ফলন।

এ বছর বরগুনায় আলু আবাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৯৪৫ হেক্টরের বিপরীতে মোট ৭৭৩ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে বরগুনা সদর উপজেলায় নির্ধারিত ১২০ হেক্টরের বিপরীত ৩০, পাথরঘাটায় ৫৬২ হেক্টরের পরিবর্তে ৫০৫, বামনা নির্ধারিত ৪২ হেক্টর, বেতাগী ১৩২ হেক্টরের বিপরীতে ১৩৩, আমতলী ১৯ হেক্টরের বিপরীতে বেশি ৩০.৪৫, এবং তালতলীতে ৭০ হেক্টরের পরিবর্তে ৩৩ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ করা হয়েছে। বর্তমানে এসব জমির আলু উত্তোলনে কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে জ্বালানি সংকটের অজুহাতে পাইকারদের কাছ থেকে সঠিক দাম না পাওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন তারা। অপরদিকে জেলায় উৎপাদিত আলুর জন্য কোনো হিমাগার না থাকায় আলু সংরক্ষণও করতে পারছেন না স্থানীয় এ সব কৃষকরা।
বিজ্ঞাপন
সরেজমিনে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউনিয়নের বিভিন্ন আলু চাষের খেত ঘুরে দেখা যায়, উৎপাদিত আলু খেত থেকে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিভিন্ন বয়সী নারী ও পুরুষ চাষিরা। তাদের মধ্যে কেউ খেত থেকে আলু তুলছেন, আবার কেউ তা নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে জমা করছেন। তবে তুলনামূলক এ বছর কৃষকদের আলুর ফলন ভালো হওয়ায়, কাজের মধ্যে স্বস্তি থাকলেও চোখে মুখে রয়েছে চিন্তার ছাপ। অতিরিক্ত দামে সার ওষুধ কিনতে হলেও ভালো দামে বিক্রি করে লাভের আশা করছিলেন তারা। কিন্তু জ্বালানি সংকটের অজুহাতে পাইকার কমে যাওয়া এবং ভালো দাম না পাওয়ায় লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন বলে অভিযোগ করছেন এখানকার কৃষকরা।

মো. হেলাল নামে ওই এলাকার এক আলু চাষি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি প্রত্যেক বছরই আলু চাষ করি। এবছর পাইকার না পাওয়ায় আলু বিক্রি করতে পারছি না। আবার যাদেরকে পাই তারা জ্বালানি তেলের সংকট বলে ঠিকভাবে দাম দিতে চায় না। আলু চাষে এ বছর যে টাকা খরচ হয়েছে আমাদের সেই টাকাই উঠবে না।
৪ লাখ টাকা খরচ করে তিন একর জমিতে আলুর আবাদ করেছেন কৃষক জাকির হাওলাদার। খেতে উৎপাদিত আলু সঠিক দামে বিক্রি করতে না পেরে, তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবছর আমরা আলু বিক্রি করতে পারছি না। জমি থেকে আলু উঠিয়ে স্তূপ করে রেখেছি। ৪ লাখ টাকা খরচ করে আশা করছিলাম, অন্তত ৬ লাখ টাকায় আলু বিক্রি করতে পারবো। কিন্তু এখন জ্বালানি সংকটের কথা বলে কোনো পাইকার আলু কিনতে চায় না। এ অবস্থায় আলু বিক্রি করতে না পেরে শ্রমিকদের টাকাও দিতে পারছি না।
বিজ্ঞাপন
একই এলকার খাদিজা নামে আরেক নারী আলু চাষি ঢাকা পোস্টকে বলেন, এবছর আমাদের আলুর ফলন ভালো হলেও বিক্রি করতে পারছি না। পাইকারদের কাছে গেলে তারা তারা তেল সংকটের অজুহাত দেখিয়ে খরচ বেশির কথা বলে সঠিক দাম দিতে চায় না। তাদের দেওয়া দামে আলু বিক্রি করলে আমাদের খরচের টাকাই উঠবে না।

মুক্তা রানী নামে আরেক নারী আলু চাষি ঢাকা পোস্টকে বলেন, পাইকারদের কাছে আলু বিক্রি করতে চাইলে তারা পানির দামে আলু কিনতে চায়। কিন্তু ওই দামে বিক্রি করলে আমাদের লাভ তো দূরের কথা খরচ টাকায় ওঠে না। এখন কিভাবে আলু বিক্রি করবো? এবছর ছেলে মেয়ে নিয়ে আমাদের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়াও কাছাকাছি কোনো হিমাগার না থাকায় জমি থেকে আলু উঠিয়ে রাখারও কোনো ব্যবস্থা নেই।
কালমেঘা এলাকার স্থানীয় এক বেপারী মো. খলিলুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, তেলের কারণে আলু চাষিরা এবছর নাজেহাল অবস্থায় আছে। একটা গাড়িতে কমপক্ষে ১০০-২০০ লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু তেল না পাওয়ায় তারা আলু নিতে আসতে পারছে না। এমন একটা অবস্থা যে কোনো পাম্পেও এক দুই লিটারের বেশি তেল পাওয়া যায় না। মূলত তেলের কারণেই এখানকার সব কৃষকরা সমস্যার মধ্যে পড়েছেন।
ভুক্তভোগী বিভিন্ন এলাকার এসব কৃষকদেরকে সঠিক দামে আলু বিক্রি করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিয়ে বরগুনা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. শাহজাহান আলী ঢাকা পোস্টকে বলেন, চাষিরা যদি আলু বিক্রি করতে না পারেন এবং এ বিষয়ে আমাদের জানালে চাষি এবং ব্যবসায়ীদের নিয়ে বসে কথা বলে আমরা সমাধান করতে পারি। কেনো চাষি আলু বিক্রি করতে পারছে না এবং ব্যবসায়ীরা কেনো ক্রয় করছে না উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সরকারি নীতিমালা ও নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা তা সমাধান করে দিতে পারি। ভুক্তভোগী কোনো চাষি আমাদের কাছে আসলে, অথবা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে গিয়ে সমস্যা দেখলে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রথীন্দ্র নাথ বিশ্বাস ঢাকা পোস্টকে বলেন, কৃষকরা মৌসুমের শুরুতে ভালোই দাম পেয়েছেন। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যে একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হলেও আমাদের কৃষি ক্ষেত্রে এর তেমন কোনো প্রভাব নেই। বিশেষ করে কৃষি পণ্য উৎপাদন এবং পরিবহনের জন্য বরগুনা জেলায় জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। কোনো কৃষক এবং পাইকার যদি কৃষি পণ্য পরিবহন করতে চায় এবং সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কৃষি অফিসে যোগাযোগ করলে তাদের চাহিদা অনুযায়ী একটি প্রত্যায়ন দিয়ে দেবে। বরগুনার যে কোনো পাম্পে গেলেই ওই প্রত্যায়ন অনুযায়ী তাদেরকে তেল দেওয়া হয়।
কৃষকদের প্রয়োজনীয় হিমাগার স্থাপনের বিষয়ে তিনি বলেন, হিমাগার থাকলে কৃষকরা আলু সংরক্ষণ করতে পারেন এবং পরবর্তীতে যখন দাম বেশি পায় তখন তারা বিক্রি করতে পারেন। কিন্তু সরকারিভাবে কোনো হিমাগার তৈরি করা হয় না, এর জন্য কৃষি উদ্যোক্তা দরকার। ইতোমধ্যে আমরা বিভিন্ন জায়গায় কথা বলেছি, যদি কোনো কৃষি উদ্যোক্তা এগিয়ে আসে তাহলে আমরা তাদেরকে হিমাগার তৈরিতে প্রশাসনিকভাবে যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করবো।
মো. আব্দুল আলীম/এএমকে
