রাজশাহী বিভাগে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এক বছরের কম বয়সী শিশুরা। পাশাপাশি দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ায় মৃত্যুহার বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের আগে সংক্রমণ হওয়ায় টিকার সুরক্ষাও পুরোপুরি না পাওয়া। ছাড়াও উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর দ্রুত চিকিৎসা না নেওয়া এবং হাসপাতালে দেরিতে আসা—এই দুই কারণেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় থেকে দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
বিভাগের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত পাবনা জেলায়। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, তারপর রাজশাহী জেলা। তবে আক্রান্ত সবচেয়ে কমের জেলা বগুড়ায় সবচেয়ে বেশি হাম শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া বিভাগের বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ রোগী। ছেলে শিশুর মৃত্যুহার বেশি। ছেলে শিশুর মৃত্যুহার ৫৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যেখানে মেয়ে শিশু ৪২ দশমিক ১১ শতাংশ।
হামে আক্রান্ত বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও ঝুঁকিতে রয়েছে। হাম আক্রান্তদের মধ্যে ০-১ বছর বয়সীদের হার ৬৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা মোট আক্রান্তের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। এছাড়া ১-২ বছর ও ২-৩ বছর বয়সীদের মধ্যে আক্রান্তের হার ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ৩-৪ বছর বয়সে ৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ৮ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যেও ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ সংক্রমণ দেখা গেছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ০-১ বছর বয়সী শিশুর মৃত্যুহার ৬৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। যা সর্বোচ্চ। ১-৫ বছর বয়সে ২৮ দশমিক ২৮ শতাংশ এবং ৬-১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ মৃত্যু হয়েছে। আর ০-৬ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যেই সর্বোচ্চ মৃত্যু ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, এরপর ৬-৯ মাসে ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ৯-১২ মাসে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
হামে মৃত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে জ্বর ও র্যাশ। শতকরার হিসেবে ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ। এছাড়া শ্বাসকষ্ট ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ, নিউমোনিয়ায় ২১ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ব্রংকোপনিউমোনিয়া ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এছাড়া মেনিনজাইটিস, এআরডিএস, সেপটিসেমিয়া ও অন্যান্য জটিলতাও কিছু ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ রোগী সময়মতো হাসপাতালে আসছে না। ৩-৭ দিনের মধ্যে চিকিৎসা নিয়েছে ৩১ দশমিক৫৮ শতাংশ। যা সর্বোচ্চ। এছাড়া ৩ দিনের কম সময়ে এসেছে ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং ১০ দিনের বেশি দেরিতে এসেছে ২৬ দশমিক ৩১ শতাংশ রোগী, যা ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা নির্দেশ করে।
বিজ্ঞাপন
বিভাগের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত পাবনা জেলায়। এখানে আক্রান্তের হার ২৫ দশমিক ৫২ শতাংশ। এরপর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় ২৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, রাজশাহী জেলায় ২০ দশমিক ৬৯ শতাংশ, নাটোরে ১৭ দশমিক ২৬ শতাংশ, নওগাঁয় ১১ দশমিক ৩৩ শতাংশ এবং বগুড়ায় শূন্য দশমিক ৮৬ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া বিভাগের বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছে ৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ রোগী।
তবে আক্রান্ত থেকে শনাক্তের চিত্র ভিন্ন। আক্রান্ত সবচেয়ে কমের জেলা বগুড়ায় সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে। এই জেলায় হয়েছে ৫৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। রাজশাহী জেলায় মৃত্যু হয়েছে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ। এছাড়া জয়পুরহাট ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৮ দশমিক ৯৩ শতাংশ। নওগাঁয় ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ এবং নাটোর ও সিরাজগঞ্জে প্রায় ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ করে মৃত্যু হয়েছে। বাইরে থেকে আসা রোগীদের মধ্যেও শনাক্তের হার ৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ।
শনিবার (১১ এপ্রিল) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ রামেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত নিয়ে হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস জানান, রামেক হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় সাসপেক্টেড হামে নতুন করে ২৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৯ জন। এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি, যা কিছুটা স্বস্তির খবর।
তিনি বলেন, বর্তমানে হাসপাতালে সাসপেক্টেড হামে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৪ জনে। চলমান প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত মোট ৫৩৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মোট মৃত্যু হয়েছে ৪৮ জনের। সময়মতো টিকাদান এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত নিতে হবে।
এ বিষয়ে রাজশাহী সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম বলেন, অনেকেই আছেন হামের টিকার দুইটা ডোজ নেয়নি। ছয় মাস থেকে পাঁচ বয়সী সংক্রমণের সংখ্যায় বেশি। এই কারণেই সরকার এ বয়সী শিশুদের হামের টিকা ক্যাম্পেইনের আওতায় নিয়ে এসেছে।
শাহিনুল আশিক/এমএএস
