বিজ্ঞাপন

খুলনায় মানহীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি, ঝুঁকিতে রোগী

অ+
অ-
খুলনায় মানহীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ছড়াছড়ি, ঝুঁকিতে রোগী

খুলনা বিভাগসহ দক্ষিণ জনপদের মানুষ প্রতিনিয়তই খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসেন। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে নির্ধারিত বেড সংখ্যার তিন গুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। শয্যা সংকটের কারণে ওয়ার্ডের অভ্যন্তরে ও বারান্দার ফ্লোর, চলাচলের পথ ও সিঁড়ির মেঝেতে অবস্থান নিতে হয় রোগীদের। বাড়তি রোগীর চাপ থাকে সবসময়ই। এমনকি বহির্বিভাগে চিকিৎসক দেখাতেও বেগ পেতে হয় রোগীদের। আর পরীক্ষা-নিরীক্ষার মেশিন থাকলেও সেখানেও সবসময় থাকে রোগীদের দীর্ঘ সারি। 

বিজ্ঞাপন

এই সুযোগটি কাজে লাগাতে মরিয়া থাকে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। সরকারি এই হাসপাতালের সামনে এবং আশপাশের এক কিলোমিটার দূরত্বে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও বেসরকারি হাসপাতাল।    

বৃহস্পতিবার, শনিবার এবং রোববার খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ ডাক্তার দেখাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসছেন। প্রচুর ভিড়। কেউ লাইনে দাঁড়িয়ে, কেউবা বসে। আবার কেউ কেউ একে অপরের সঙ্গে আলাপচারিতা করছেন। ডাক্তারের রুমের সামনে দেখা যায়- চিকিৎসক দেখিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথে কিছু নারী ও পুরুষ টিকিট নিয়ে দেখছে আর পরামর্শ দিচ্ছেন। 

শনিবার দুপুরে ডাক্তার দেখিয়ে বের হন ডুমুরিয়ার আয়েশা। ডাক্তার তাকে সিবিসি, সিআরপি, আরবিএস, ক্যালসিয়াম, টিএসএইচ, এফটি ফোর টেস্টগুলো করতে পরামর্শ দেন। তিনি রুম থেকে বের হতেই ডাক্তারের রুমের সামনে বসে থাকা রিসিপসনিস্ট টিকিট নিয়ে দ্রুত রিপোর্টগুলো করার পরামর্শ দেন। পরে এক নারীকে ডেকে তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কম খরচে করানোর বিষয়ে বলেন। এমন সময় ওই নারী রোগীকে নিয়ে যেতে চাইলে তিনি অপরাগতা জানান। তখন ওই নারী প্রাইম হসপিটালের একটি স্লিপের পেছনে রেফারেন্সে শিল্পী নাম লিখে রোগীর হাতে দেন এবং বলেন, এখানে ডিসকাউন্টে দ্রুত রিপোর্ট করে দেবে। পরে ওই রোগী বেরিয়ে আসেন। 

বিজ্ঞাপন

রোগী আয়েশা বলেন, এখানে আসার পর অনেকেই নিজের থেকে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। টিকিট দেখতে চেয়েছেন। একই সঙ্গে তারা বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কম খরচে রিপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন।

এটা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রতিদিনের চিত্র বলে অনেকেই জানিয়েছেন। খুলনায় ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অসংখ্য ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিয়োগ করা এসব নারী ও পুরুষেরা খুমেক হাসপাতালে আসা রোগীদের কৌশলে নিয়ে যায়। গণহারে গড়ে ওঠা এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনেকগুলোর মেয়াদ নেই, বেশির ভাগ ক্লিনিকে সার্বক্ষণিক ডাক্তার নেই এবং বেশির ভাগ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভালো মানের টেকনিশিয়ান নেই। এসব মানহীন প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে রোগীদের আগ্রহী করে তোলে। ফলে অনেকেই প্রতারণার শিকার হন। দেন ভুল রিপোর্টও। যা অনেক সময় রোগীদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বুকে ব্যথা নিয়ে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে যান আনিস। সেখানে ডাক্তার দেখানোর পর তাকে ইকো ইকো কার্ডিওগ্রাফি করার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে তিনি ইকো কার্ডিওগ্রাফি করিয়ে রিপোর্টে তার হার্টের সমস্যা রয়েছে বলে জানানো হয়। এটা জানার পরই তিনি চিন্তায় পড়ে যান। পরবর্তীতে ওই রিপোর্ট অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করতে থাকেন। তবে তার শারীরিক কোনো পরিবর্তন না আসায় তিনি পরবর্তীতে পুনরায় আরেকটি  ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ইকো কার্ডিওগ্রাফি রিপোর্ট করান। এবার সেই রিপোর্টে হার্ট নরমাল এসেছে বলে জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

ভুক্তভোগী আনিস অভিযোগ করে বলেন, হার্টে সমস্যার রিপোর্ট পাওয়ার পর আমি ভেঙে পড়ি। নিজের মনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আবারও ইকো কার্ডিওগ্রাফি করাই। সেখানে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক আসে। তাহলে এতদিন কেন ওষুধ খেলাম আর কেন আমাকে মানসিক চিন্তায় ভুগতে হয়েছে। কেনই বা দুই জায়গায় দুই রকম রিপোর্ট আসবে।

এমন ভুল রিপোর্টের শিকার শুধু আনিসই নয়, এটা নিয়ে অনেকেরই দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। আর এসব ভুলেভরা রিপোর্ট মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলছে।    

নগরীর ময়লাপোতা মোড়ে খানজাহান আলী হসপিটালের ম্যানেজার মো. আকতারুজ্জামান বলেন, ভুল রিপোর্টের বিষয়টি আমরা বলতে পারবো না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরাই ভালো বলতে পারবেন।

খুলনা জেনারেল ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, পাঁচ বছরের বেশি সময় এই প্রতিষ্ঠান চলছে। প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র সম্পূর্ণ আপডেট, সব ঠিক আছে। এছাড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার দিকে বায়োপসি একটা টেস্ট আছে- হিস্টোপ্যাথলজি, এটা আমরা নিজস্বভাবেই করি। এজন্য দুইজন প্যাথলজিস্ট আছে।

তিনি বলেন, অনেক টেস্ট চিকিৎসকরা রিপিট টেস্ট করার জন্য আমাদের এখানে পাঠায়। অন্য প্রতিষ্ঠানে রিপোর্ট করানোর পর দেখা যাচ্ছে অথেনটিক মনে হচ্ছে না, সেক্ষেত্রে আমাদের এখানে রিপোর্টের জন্য রেফার্ড করে। এখানে সব ধরনের রিপোর্ট করা হয়। আমাদের মেশিনগুলো কোয়ালিটি সম্পন্ন।  

হাফিজুর রহমান বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যাদের কাগজপত্র নেই। তাদের যে দোষ দেবেন তাও কিন্তু না। কারণ পরিবেশের ছাড়পত্র ছাড়া লাইসেন্স দেয় না। এটাতো আমাদের করার কিছু নেই। হসপিটালগুলোতে মূলত ডাক্তার সব সময় থাকতে হয়। কিন্তু ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সব সময় ডাক্তার থাকা লাগবে এটা কোনো কথা নয়। রোগী আছে ডাক্তার আছে, রোগী নেই ডাক্তার নেই।  

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. শামীম হাসান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ২৫০ বেডের স্ট্রাকচারেই ৫০০ বেডের হাসপাতাল চলছে। আর ৫০০ বেড থাকলেও রোগী রয়েছে তিনগুণ। রোববার (৫ এপ্রিল) খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৫৪১ জন রোগী। আর বহির্বিভাগে অসংখ্য রোগী দেখা হয়। জনবলের তুলনায় কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রদানে হিমশিম খেতে হয়। আর এই সুযোগটি কাজে লাগায় দালাল চক্র এবং লাইসেন্সহীন, মানহীন বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিরা। বিভিন্ন কৌশলে তারা রোগীদের প্রতারিত করে।

তিনি বলেন, পরিপূর্ণ জনশক্তি থাকলে আর প্যাথলজি ফুল টাইম চালু রাখতে পারলে এই সুযোগ নিতে পারতো না ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো। তখন সমস্যা হতো না। কিন্তু সেটা তো করা সম্ভব হচ্ছে না।

ডা. শামীম হাসান আরও বলেন, এসব দালাল চক্র এবং লাইসেন্সহীন, মানহীন বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। তাদের আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়। আমরা কড়াকড়ি পদক্ষেপ নিলে তখন একটু ভালো পরিবেশ থাকে। আবার যা তাই হয়ে যায়। আমাদের চেষ্টা থাকে রোগীরা যেন দুর্ভোগে না পড়ে আর প্রতারিত না হয়।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিভিল সার্জনের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলা ও মহানগরীতে ৫২২টি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টির নেই লাইসেন্স। আর যাদের  রয়েছে তাদের মধ্যে অনেকেরই লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। খুলনা মহানগরীতে ২৯৬টির মধ্যে লাইসেন্স নেই ২১টির আর জেলার উপজেলাগুলোতে গড়ে ওঠা ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ২২৬টি। এর মধ্যে ২৩টির লাইসেন্স নেই।

খুলনার সিভিল সার্জন  ডা. মোছা. মাহফুজা খাতুন বলেন, জেলায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে ১৬০টি এবং ক্লিনিক রয়েছে ৬৬ টি। এর মধ্যে লাইসেন্স নেই ২৩টির। এগুলো লাইসেন্স করার জন্য বিভিন্ন সময় আমরা ভিজিট করেছি এবং তাদেরকে চিঠিপত্র দিয়েছি। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভিজিট করার সময় আমরা লক্ষ্য করেছি, পরিবেশ ছাড়পত্র না পাওয়ার কারণে এগুলো লাইসেন্স নবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি, এ বিষয়ে কাজ চলছে। আশা করি শিগগিরই একটা সমাধান হবে।

তিনি আরও বলেন, নানা অভিযোগের ভিত্তিতে আমরা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলোতে যেয়ে ভিজিট করি। ভিজিটকালে হাসপাতালে ডাক্তার নেই এমনটা পাইনি। এমন কোনো অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য উপপরিচালক ডা. মুজিবর রহমান বলেন, আমাদের অভিযান প্রতিনিয়ত চলমান রয়েছে। বর্তমানে হামের প্রকোপ চলছে। হামের কার্যক্রম শুরু করেই দু-একদিনের মধ্যে আমরা ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিকের বিষয়ে অভিযানে নামবো, এটা নির্দেশনা আছে। সিভিল সার্জন এবং আমরা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে খুব দ্রুতই নামবো।

তিনি বলেন, রুটিন অভিযান চলমান আছে। এখন সাঁড়াশি অভিযান চালু করা হবে। অভিযান চালিয়ে যখন দেখি লাইসেন্স নেই তখন আমরা বন্ধ করে দেই। আর যারা লাইসেন্স নবায়ন করেনি তাদের সময় বেঁধে দিয়ে আসি। ভুল চিকিৎসা বা ভুয়া রিপোর্ট বিষয়ে কোনো রোগীর অভিযোগ থাকলে আমাদের লিখিত দিলে তদন্ত করা হবে।  

আরএআর