বিজ্ঞাপন

সিলেটে স্বাস্থ্যখাতে তদারকির অভাব, বিপদে রোগীরা

অ+
অ-
সিলেটে স্বাস্থ্যখাতে তদারকির অভাব, বিপদে রোগীরা

সিলেট নগরীতে স্বাস্থ্যসেবা এখন দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে সরকারি নীতিমালা, লাইসেন্স প্রক্রিয়া ও তদারকির কঠোর বিধান, অন্যদিকে বাস্তবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা আর নিয়ন্ত্রণহীন বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত। ফলে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি আর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সিলেট নগরীর চৌহাট্টা, আম্বরখানা, মধুশহীদ, সোবহানীঘাট, নাইওরপুল, মির্জাজাঙ্গাল ও ওসমানী মেডিকেল রোডের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি সবখানেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ছোট ছোট হাসপাতাল। অনেক ক্ষেত্রে এক কিলোমিটারের মধ্যেই রয়েছে ১২ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান। একই রাস্তার দুই পাশেই দেখা যায় একাধিক ক্লিনিকের সাইনবোর্ড। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে প্রয়োজনীয় অনুমোদন বা লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই।

অনুমোদনহীনতার আড়ালে চিকিৎসা বাণিজ্য

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, একটি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো, প্রশিক্ষিত জনবল এবং বৈধ লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এসব শর্তের অনেকটাই উপেক্ষিত। অনেক ক্লিনিকে নেই নিবন্ধিত চিকিৎসক, নেই অভিজ্ঞ নার্স বা টেকনোলজিস্ট। কিছু ক্ষেত্রে কম প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মচারী দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এতে ভুল রিপোর্টের ঝুঁকি বাড়ছে, যা সরাসরি রোগীর চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে।

বিজ্ঞাপন

অতিরিক্ত টেস্ট আর বাড়তি বিলের ফাঁদ

রোগীদের অভিযোগ, সামান্য অসুস্থতা নিয়ে গেলেও তাদের একের পর এক পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হয়। অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই প্যাকেজ আকারে টেস্ট দেওয়া হয়। এতে চিকিৎসার খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

ফাহিম আহমদ নামে এক ব্যক্তি ঢাকা পোস্টকে বলেন, ডাক্তার দেখাতে গিয়ে ৭০০ টাকার ফি দিয়েছি, তারপর শুরু হয়েছে টেস্ট (রোগ নির্ণয়) পর্ব। ৫-৬ হাজার টাকার টেস্ট ধরিয়ে দিলেও কোনটা জরুরি, সেটাও বুঝিয়ে বলা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

সরকারি হাসপাতালে চাপ, নির্ভরতা বাড়ছে বেসরকারিতে

সিলেটের সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অনেক বেশি। শয্যা সংখ্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় অনেকেই সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া জনবল সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং অব্যবস্থাপনার কারণে রোগীরা বাধ্য হয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। কিন্তু সেখানেও সেবা নিয়ে সন্তুষ্ট নন অনেকে। উচ্চ খরচ দিয়েও মানসম্মত চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগ বাড়ছে।

আরেকজন রোগীর স্বজন মামুন আহমদ অভিযোগ করে বলেন, আমার মায়ের কানের একটি পরীক্ষার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ক্লিনিকে গিয়েছি। একেক জায়গায় একেক দাম। রিপোর্ট  আসার পর সন্দেহ দূর করার জন্য  তিনজন ডাক্তার দেখিয়েছি। একেকজন একেক কথা বলেন। কেউ বলেন অপারেশন লাগবে,কেউ বলেন লাগবে না। যা নিয়ে চিকিৎসায় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

গত বছরের ২২ জুলাই নগরীর মির্জাজাঙ্গাল এলাকার সেফওয়ে হাসপাতাল সিলগালা করেন জেলা প্রসাশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সিলগালা করে দুদিনের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। অদ্যবধি সেই লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি বলে জানায় সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগ। তবুও নির্বিঘ্নে তাদের কার্যক্রম চলছে। যদিও এই বিষয়ে বারবার যোগাযোগ করেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এছাড়াও একই বছরের জানুয়ারি থেকে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাচ্ছে ভিশন এইড চক্ষু হাসপাতাল নামক আরেকটি প্রতিষ্ঠান। যদিও তাদের কোনো ধরনের অনুমোদন নেই। ওই হাসপাতালের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে নিজেকে ডেপুটি ডিরেক্টর পরিচয় দিয়ে ঝুটন দে নামে একজন জানান, ওই হাসপাতালে চোখের অপারেশনসহ সব ধরনের চিকিৎসা করা হয়।

ঠিক ১০০ গজের মধ্যেই আল কাউসার হসপিটাল নামক একটি প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড দেখা যায়।গত বছর এই প্রতিষ্ঠানকে জেলা প্রশাসন জরিমানা করলেও এখনো স্বাস্থ্য বিভাগে তাদের নিবন্ধন সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই।

স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত মনিটরিং ও কঠোর তদারকি না থাকায় এ ধরনের অনিয়ম দিন দিন বাড়ছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও বড় একটি কারণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, অভিযান পরিচালনা করা হয়, কিন্তু নিয়মিত নজরদারি না থাকলে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে যায়। আর আমাদের জনবলও সীমিত।

এদিকে অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে উৎপন্ন মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করা হচ্ছে না। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। খোলা জায়গায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ব্লাড ব্যাগসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য।

সিলেট নগরীর ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সর্বশেষ মনিটরিং কবে হয়েছে জানতে চাইলে সিলেট জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. মামুনুরর রশীদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা লাইসেন্স নবায়নের সময়ে বিভিন্ন ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মনিটর করি। ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, ব্লাড ব্যাগসহ ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য খোলা জায়গায় না ফেলার নির্দেশনা দেই। যেসব ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়ম ভঙ্গ করে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা জরিমানা আরোপ করি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে। লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান বন্ধ, নিয়মিত অডিট, সেবার মান যাচাই এবং রোগীদের অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।

সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, আইন বহির্ভূতভাবে যারা হাসপাতাল ও ক্লিনিক চালাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে অভযান পরিচালনা করার জন্য। জেলার স্বাস্থ্যখাতের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণে মূল দায়িত্ব পালন করে থাকেন সিভিল সার্জন মহোদয়। ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নিবন্ধন, অনুমোদন এবং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের বিষয়গুলো সিভিল সার্জনের আওতাধীন। এখানে আমাদের কিছুটা আইনি জটিলতা রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রয়োজনে সিভিল সার্জন কার্যালয় অন্যান্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতাও গ্রহণ করে থাকে। নিয়মিত পরিদর্শন, মনিটরিং এবং বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম যাচাই করা হয়। কোথাও অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে জনবল সংকট, আইনি জটিলতা এবং বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে সব জায়গায় একযোগে কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম ঢাকা পোস্টকে বলেন, কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালু করতে হলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাইসেন্স নিতে হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর পর তা নবায়ন করতে হয়। নতুন নিবন্ধন কিংবা নবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের কাছে আবেদন করে, তখন আমরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করি। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তিনি আরও বলেন, যদি কোনো প্রতিষ্ঠান অনুমোদন ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করে বা লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করে, তাহলে প্রথমে তাদেরকে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও তারা সংশোধন না করলে বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিতপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

আরএআর